বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

উৎপাদন খরচ বেড়েছে ॥ কমেছে পণ্যের দাম ॥ পুঁজি হারাচ্ছে খামারিরা

জয়পুরহাট সংবাদদাতা: চলতি অর্থবছর থেকে পোল্ট্রি শিল্পের ওপর কর ও শুল্ক আরোপ করার ফলে ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদনে খরচ বেড়েছে অথচ কমেছে পণ্যের দাম। এদিকে নীলফামারি, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলা বন্যায় আক্রান্ত হওয়ায় ডিম ও মুরগির মাংসের বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় খামারিরা। অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এগিয়ে না এলে জয়পুরহাটসহ অত্র অঞ্চলের অগ্রসরমান পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।গতকাল জয়পুরহাটে ‘পোল্ট্রি রিপোর্টিং বিষয়ক মিডিয়া কর্মশালা’র সমাপনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এমন আশংকা ব্যক্ত করেন। ‘বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল’ (বিপিআইসিসি) এর সহযোগিতায় এ কর্মশালার আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা ওয়াচডগ বাংলাদেশ। জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, টিভি চ্যানেল, বার্তা-সংস্থা এবং অন-লাইন নিউজপেপারের মোট ৩০ জন সাংবাদিক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। বিপিআইসিসি’র প্রতিনিধি এবং ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ডা. এস.এম.এফ.বি আব্দুস সবুর বলেন- কর অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করায় বিগত দু’বছরে পোল্ট্রি উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এক পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে পরিপাকযোগ্য আমিষের চাহিদা প্রায় ৩.৩৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এর মধ্যে পূরণ হয় মাত্র ২.২৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ঘাটতি প্রায় ১.১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ডা. সবুর বলেন- বর্তমান সময়ে প্রাণিজ আমিষের একটি বড় উৎস পোল্ট্রি। আগামীতে পোল্ট্রি’র প্রয়োজন আরও বাড়বে। তাই এ শিল্পটি সরকারের বিশেষ নজর দাবি রাখে। “আমরা এখন ফুড সেফটির বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছি। দেশে এখন মানসম্পন্ন নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন হচ্ছে বলেই আমরা আশা করছি অচিরেই রফতানি শুরু করতে পারব”। সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জয়পুরহাটের ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার কারণে জয়পুরহাটে পোল্ট্রি শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। জনাব আমিনুল বলেন- ভিশন-২০২১, ক্ষুধামুক্ত দেশ এবং স্বাস্থ্যবান ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়তে সরকারের প্রচেষ্টায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে পোল্ট্রি শিল্প। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রুস্তম আলী বলেন- জয়পুরহাটে প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় খামার, ৬৫ লাখ পোল্ট্রি বার্ড, ৩৩৩টি লেয়ার খামার, ৩৯টি হ্যাচারি, এবং ১১টি ফিড মিল রয়েছে। এ জেলায় বছরে প্রায় ৩৮ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন- জয়পুরহাটে উৎপাদিত ডিম ও মাংসের সিংহভাগই পার্শ¦বর্তী জেলা ছাড়াও ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে। পদ্মা ফিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিআইপি আনোয়ারুল হক আনু বলেন- বিগত কয়েক মাস থেকেই খামারিরা ডিমের দাম না পাওয়ায় দিশেহারা। অন্যদিকে বন্যার কারণে আশপাশের জেলাগুলোতে ডিম ও মুরগি বিক্রি অর্ধেক কমে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে চরম সংকটে পড়েছে স্থানীয় পোল্ট্রি শিল্প। জয়পুরহাটের পোল্ট্রি ও ফিড শিল্পের উন্নয়নকল্পে সরকারের সহযোগিতা চান জনাব আনু এবং সুদের হার ৫-৭ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান। পাশাপাশি পোল্ট্রি ফিডের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ভূট্টা আমদানির ওপর থেকে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং সয়া মিলের ওপর থেকে ১০ শতাংশ কাষ্টমস শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। কিষাণ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারির উপদেষ্টা আক্তার হোসেন বলেন, সরকার সহযোগিতা না করলে খামারিরা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন। সেফালি পোল্ট্রি’র সত্ত্বাধিকারি সাইফুল ইসলাম বলেন- প্রায় দেড় যুগের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই জয়পুরহাট আজ পোল্ট্রি ভিলেজে পরিণত হয়েছে। তাই এ শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। এ শিল্পের কারণে স্থানীয়ভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পূরবী এগ্রো’র পরিচালক এমদাদ হোসেন বলেন, বন্যার ক্ষতির কারণে কৃষকদের মতই খামারিদের ব্যাংকের সুদ মওকুফের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেয়া উচিত। দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, আগের তুলনায় জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে পোল্ট্রি রিপোর্টের সংখ্যা বেড়েছে। তবে গুণগত মান বাড়াতে হলে তথ্যের আদান-প্রদান আরও বাড়াতে হবে। আর সেজন্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি নিয়ে রিপোর্ট করার মত অসংখ্য বিষয় আছে। ইন-ডেপথ প্রতিবেদন সাধারণ পাঠক, দর্শক কিংবা নীতি-নির্ধারকদেরই শুধু নয় উদ্যোক্তাদেরও নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহী করতে পারে। জয়পুরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মোস্তাকিম ফাররোখ বলেন- পোল্ট্রি দ্রুত বিকাশমান এবং বিজ্ঞান-ভিত্তিক একটি শিল্প। ঢাকার বাইরের এবং বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাছে এ বিষয়ক তথ্যের অপ্রতুলতা রয়েছে। তথ্যের সম্ভাব্য উৎসগুলোও অজানা। সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার খাঁ বলেন ইন্টারনেটের কল্যাণে বিদেশের অনেক খবরা-খবর পাওয়া গেলেও দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প সম্পর্কিত তথ্য যৎসামান্যই। তাই বাংলা ভাষায়, সহজবোধ্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরী। জনাব রতন বলেন, বিপিআইসিসি আয়োজিত আজকের কর্মশালাটি সে অর্থে স্বার্থক হয়েছে তবে এ ধরনের কার্যক্রমের ফলোআপ থাকা প্রয়োজন।
ওয়াচডগ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ডিম ও মুরগি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর রিপোর্টিং হচ্ছে। সঠিক তথ্যের অভাবেই এমনটি হচ্ছে। সেজন্যই তথ্যের নিয়মিত আদান-প্রদান জরুরি। নকল ডিম, ভেজাল ফিড, এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কিংবা ডিম ও মুরগির মাংসের মান নিয়ে সংবাদকর্মীদের মাঝে যে বিভ্রান্তি আছে তা বিপিআইসিসি আয়োজিত কর্মশালার কারণে দূর হচ্ছে। কর্মশালায় রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারি অধ্যাপক শশি আহমেদ এবং যমুনা টেলিভিশনের বিজনেস এডিটর সাজ্জাদ আলম খান তপু। কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারি সাংবাদিকদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন ইউএনও আমিনুল ইসলাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ