সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বন উজাড় ও পাহাড় কাটা কি বন্ধ হবে না

প্রকৌশলী এসএম ফজলে আলী : এক যুগে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক চতুর্থাংশ বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। পাহাড়ের ভূতাত্বিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে নির্মাণ করা হয়েছে একের পর এক সড়ক। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি অবকাঠামো। এতে ভূতাত্বিক গঠন নষ্ট হয়ে পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে অতিবৃষ্টি হওয়ায় বড় ধরনের ধস ও বিপর্যয় ঘটেছে। বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলা হয়েছে।
সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান “সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস” এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডস বাংলাদেশের একটি যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, এক যুগে তিন পাবর্ত্য জেলায় বিভিন্ন ধরনের বনভূমি কমেছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৬ হেক্টর। গত মে মাসে তারা এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
২০১২ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এশিয়ার দেশগুলোতে ‘পাহাড় ধস ও বনভূমি, শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে ভারতের পূর্বাঞ্চল, নেপালের তারাই উপত্যকা এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে বনভূমি ধ্বংস হওয়া বা কমে যাওয়াকে দায়ী করেছে। গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া বিশ্ব আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনে এমন বৃষ্টিধারা হঠাৎ করে প্রবল আকার ধারণ করে। কোন কোন সময় ৫/৬ ঘণ্টায় ১৫ দিনেরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে যায়। ফলে পাহাড়গুলো আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এছাড়া পরিবেশবাদীদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, ১২ই জুন মধ্যরাতে তিন পার্বত্য জেলায় একের পর এক পাহাড় ধসের ঘটনায় দেখা যায় উত্তর-দক্ষিণের বিস্তৃত সড়কগুলোর দুই পাশের পাহাড়গুলো বেশি ধসেছে। এ সব পাহাড়ে বিভিন্ন স্তরে বালুও মটির স্তর রয়েছে। এ ধরনের বিশেষ ভূতাত্বিক গঠনকে আমলে না নিয়ে এবং ধস রোধের কোন রকম ব্যবস্থাপনা না রেখেই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক বন্ধন ও গঠন নষ্ট করে সড়ক নির্মাণের পর পাহাড়গুলোর উপর আরেক বিপদ তৈরি করে বসতি স্থাপনকারীরা। সড়ক নির্মাণের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা পাহাড়গুলোতে বসতি বেড়ে যাওয়ায় বড় বিপর্যকর পরিস্থিতির তৈরি করে। সড়কের পাশে বসতি স্থাপন সহজ হওয়ায় সীমাহীনভাবে পাহাড়ের ঢালে অবৈধ বসতি বেড়ে গেছে। ফলে পাহাড়গুলোতে মহাবিপর্যেেয়র সৃষ্টি করেছে। পাহাড় কেটে নানা পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও পাহাড়ের ভূতাত্বিক গঠন ও ঝুঁকিকে আমলে নেয়া হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির ধরণ, পানির প্রবাহও বর্তমানের বৈরি আবহাওয়াকে বিবেচনায় না নিয়ে নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প ও বসতি স্থাপিত হয়েছে। এর ফলে বনভূমি ও পানির ভিমগুলো ধ্বংস হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এমনটি আর না ঘটে তার জন্য তিন পাবর্ত্য জেলার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ভৌগোলিক গঠনের কোন পরিবর্তন হয়ে গেল কিনা সামনে আরো বড় বিপর্যয়ের আশংকা আছে কিনা তা দ্রুত সমীক্ষা চালিয়ে  দেখতে হবে। সেখানকার মানুষকে বাঁচাতে হলে এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলোর মাটির গঠন বিন্যাসের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সঙ্গে  যোগ হয়েছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা। এ সব কারণে পাহাড়গুলো শুকনো ও ঝরঝরে হয়ে উঠছে। ফলে মাটির বন্ধন নষ্ট হওয়ায় তার মধ্যদিয়ে পানি চুয়ায়ে ভিতরে চলে যায় এবং পাহাড়ের বন্ধন (Stability) নষ্ট করে। তাতে পাহাড়ের স্তর বিশেষ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মুষলধারে বৃষ্টি হলে পাহাড়ের ধস নামা দ্রুত হয়। তা ছাড়া প্রবল বৃষ্টির স্রোতে পাহাড়ের উপরের শক্তস্তরের মাটি ধুয়ে নিম্নাঞ্চলে চলে যায়। তার পরের দুর্বল প্রকৃতির স্তর সহজেই ভেঙ্গে পড়ে। কোন কোন স্থানে পাহাড়ে ফাটল হয়ে থাকে। তাতে বৃষ্টির পানি পাহাড়ের আরো গভীরে গিয়ে মাটির স্তরকে আরো দুর্বল করে দেয়। পরিণতিতে পাহাড় ধস।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, এবার পাহাড় ধসের যে বিপর্যয়  ঘটলো, তা স্মরণাতীতকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। কয়েক যুগ ধরে নানামুখী অত্যাচারের ফলে ওই তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের সামগ্রীক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। জনবসতি এলাকার বাইরে অনেক দুর্গম এলাকায় পাহাড়ের গায়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
১২ই জুন মধ্যরাতে ৩ পাহাড়ী জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় যে মহাবিপর্যয় দেখা গেছে তাতে পাহাড় ধসে যে প্রায় তিনশত লোক মারা গেছে তার মধ্যে শুধু রাঙামাটিতেই ১০৫ জন মারা গেছেন। দেশের ৩ পার্বত্য জেলা বান্দরবন, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির বনভূমি ও পানির ভিমের পরিবর্তনের ধরন নিয়ে সিজিআইএস ও ওয়াটার এইডের একটি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০০৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এখানে ২৭ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে। আর ৬১ শতাংশ পাহাড়ী ঝর্না শুকিয়ে গেছে। এর ফলে পাহাড়ী অঞ্চলের মাটির বুনন নষ্ট হয়ে তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময় ২৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কৃষি জমি বেড়েছে। ভূ-উপগ্রহ থেকে নেয়া ভূমির স্যাটেলাইট ইমেজ বা ছবির উপর ভিত্তি করে এ সব কৃষি জমির তথ্য পাওয়া যায়।
পাহাড় ধসের সঙ্গে পাহাড়ে বনভূমি কমে যাওয়ায় সরাসরি সম্পর্ক আছ্।ে গত কয়েক যুগে প্রাকৃতিক বন কেটে গজারী, সেগুন, রাবার, ও ফলজ বাগান তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর শিকড় ছোট ও লতাগুল্ম কম। এতে মাটি আলগা ও শুকনো হয়ে গেছে। অতিবৃষ্টির ফলে মাটি দ্রুত ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে পাহাড় ধসের মত বিপর্যয় ঘটেছে।
অপরিকল্পিত ভাবে পাহাড়ের যত্রতত্র ঘরবাড়ি বানিয়ে যেমন বন উজাড় করছে, তেমনি তারা পাহাড়ের পাদদেশে ও রাস্তার পাশে বাড়ি করে তাদেরকেও ঝুঁকিতে ফেলেছে। বন বিভাগ মন্ত্রণালয় থেকে পাহাড়ে বনায়নের তেমন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। তা ছাড়া স্থানীয় উপজাতিরাও বনায়ন পছন্দ করে না তাদের পুরাতন পদ্ধতির জুম চাষের স্বার্থে।  বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগ ফোরামের তথ্য বলছে, পাহাড়ে বনভূমি ধস, ঝরনা শুকিয়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিতভাবে সড়ক ও বসতি নির্মাণের সঙ্গে পাহাড় ধসের হার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে বহু পাহাড় ধসের কারণে ৪৯০ জন মানুষ মারা গেছে।
বনখেকো ও পাহাড় খেকোদের পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎখাত না করতে পারলে পাহাড়ী এলাকায় এ ধরনের ভূমি ধসের মহা বিপর্যয় পড়তে হবে। বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের জন্য এখন জলবায়ু মারাত্মক পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে এখন বৃষ্টিপাত অনেক বেড়ে গেছে। পাহাড়ের ঢাল থেকে মাটি কেটে নিলে ও বন উজার করলে এই প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধসের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে। দেশে আইন অনেক আছে কিন্তু তার কোন প্রয়োগ দেখা যায় না। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে বন খেকো ও পাহাড় খেকোরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাতে কারো কোন প্রতিক্রিয়া নেই। যখন কোন একটি পাহাড় ধস হয় তখন কানে কুম্ভকর্ণে পানি যায়। তাই কয়েকদিন হৈ চৈ, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি চলে। তারপর সব চুপচাপ। যেসব লোক অবৈধভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন করে তাদেরকে কেন উৎখাত করা হয় না? আর বিশেষ বিশেষ উপযুক্ত জায়গায় তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে বসতির ব্যবস্থা করা হয় না? তা হলে তো এত লোকের অকাল মৃত্যু হতো না। যারা অবৈধভাবে পাহাড়ের মাটি কেটে নেয় ও বন উজার করে তাদেরকে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পার্বত্য এলাকায় বহু সেনা ক্যাম্প আছে। পুলিশ, বিজিবি ছাড়াও তাদেরকে পাহাড় রক্ষার দায়িত্বে অংশিদার করলে মনে হয় সমস্যার তীব্রতা কমে যাবে।
-লেখক : পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ