মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

একজন হামিদ সরকারের কথা

ভদ্রলোক কোটিপতি। নাম হামিদ সরকার। বাড়ি জামালপুর জেলায়। সরকারি চাকরি করেছেন। তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বড় ছেলে ডাক্তার। মেজোজন ব্যবসায়ী। অন্যজনও প্রতিষ্ঠিত। ঢাকার উত্তরায় তিন নম্বর সেক্টরে বিরাট বাড়ি, যেটি ছেলেদের নামে করে দিয়েছেন। কিন্তু হামিদ সরকারের জায়গা হয়নি সে বাড়িতে। রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান জনাব মুহাম্মদ শাহেদ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে হামিদ সরকারের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন সম্প্রতি। তিনি হয়তো হামিদ সরকারের এমন অবস্থার কথা জানতে পারতেন না। উত্তরা থানার ওসি ও সেখানকার মসজিদের ইমাম সাহেব একসঙ্গে এসে মুহাম্মদ শাহেদ সাহেবের শরণাপন্ন হন এবং বলেন যে, মসজিদের বারান্দায় একটি লোক মানে হামিদ সরকার দীর্ঘদিন যাবৎ পড়ে আছেন অভিভাবকহীন। ইমাম সাহেব তাঁর জন্য আসা খাবারের অর্ধেক লোকটিকে দিয়ে এতোদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি লোকটি মারাত্মক অসুস্থ। চিকিৎসা প্রয়োজন। আপনার সাহায্য জরুরি হয়ে পড়েছে। ওসি সাহেবের কথা শুনে লোকটিকে নিয়ে আসতে বললেন তিনি। শাহেদ সাহেব তখন উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালের শাখা খুলেছেন মাত্র। তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হামিদ সরকারকে হাসপাতালে ভর্তি করে নিয়ে ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্টদের ডেকে বললেন, এ লোকের যাবতীয় চিকিৎসাখরচ তিনি বহন করবেন। কোনও সমস্যা যাতে না হয়।
হামিদ সরকারের সবরকম চিকিৎসা চলছিল রিজেন্টে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে সেরেও উঠতেন তিনি এমন আশাই করছিলেন মুহাম্মদ শাহেদ সাহেবসহ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু না, কাউকে আর সুযোগ না দিয়ে হামিদ সরকার হঠাৎ সেকেন্ড টাইম কার্ডিয়াক এটাকে মারা যান। রিজেন্টের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহেদ মরহুমের বড়ছেলের ঠিকানা, ফোন নং আগেই জোগাড় করে রেখেছিলেন। তিনি যথারীতি ফোনে লাশ নিয়ে কাফন-দাফনের অনুরোধ জানান মরহুমের বড়ছেলেকে। বিস্ময়কর হলেও তার ডাক্তার ছেলে উত্তরে জানান, তিনি নাকি জরুরি মিটিংয়ে। এখন সময় নেই। হামিদ সরকারের ডাক্তার ছেলে ফোনে জানিয়ে দেন লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে দিয়ে দেবার জন্য। উল্লেখ্য, উত্তরা থানার ওসি এবং ইমাম সাহেব হামিদ সরকারকে রিজেন্টে এনে ভর্তির পর পনের দিন বেঁচে ছিলেন। এর মধ্যে তার ছেলেদের কয়েকবার খবর দেয়া হয়। কিন্তু কেউ খবর নিতে আসেননি। অথচ মরহুমের বাড়িতে তার ছেলেরা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনসহ অন্যদের নিয়ে দিব্যি বসবাস করছেন। রিজেন্ট থেকে তাদের অবস্থান মাত্র কয়েক মিনিটের। রিজেন্টের চেয়ারম্যান জনাব শাহেদ জানান, মরহুমের ছোটছেলে পিতাকে বাসায় নেবার ব্যাপারে নমনীয় থাকলেও স্ত্রীর প্রতাপে নাকি তিনি তা সক্ষম হননি। তাই রিজেন্টের চেয়ারম্যান নিজদায়িত্বে সম্মানের সঙ্গে হামিদ সরকারের কাফন-দাফন সম্পন্ন করেছেন বলে তিনি তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন। এজন্য তাঁকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানাই আমরা।
এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার কেবল হামিদ সরকারই নন। অসংখ্য হামিদ সরকার রয়েছেন আমাদের সমাজে। আর এরই অনিবার্য পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম। কোনও কোনও গুণধর সন্তান পিতামাতাকে চালাকির আশ্রয় নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। এবং ওই যে একবার রেখে আসেন, আর ভুলেও ওমুখো হন না প্রিয়সন্তান। বৃদ্ধ মা-বাবা পড়ে থাকেন যতোদিন দেহে প্রাণ থাকে। চেয়ে থাকেন সন্তানের আসবার পথপানে। জনৈক খলিফা প্রবীণদের জন্য একটি বিরাট প্রজেক্ট গড়ে তুলেছেন। উদ্যোগের প্রশংসা করতে হবে। যেসব প্রবীণের সন্তানাদি নেই। থাকবার কোনও ব্যবস্থা নেই। তারা যাবেন কোথায়? থাকবেন কই? খলিফা সাহেবের বৃদ্ধাশ্রমেই তাদের উপযুক্ত স্থান। সরকারি ব্যবস্থাপনাতেও এরকম একটা ব্যবস্থা আছে ঢাকার আগরগাঁওয়ে। তবে সেটা কতটা আশাব্যঞ্জক তা আমাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে খলিফা সাহেবের প্রবীণ আশ্রম বা সরকারি উদ্যোগের বৃদ্ধাশ্রম মা-বাবাদের নির্বাসনে পাঠাতে যেন উৎসাহিত না করে সেদিকটি খেয়াল রাখতে হবে। ‘বয়স্ক পিতামাতা সন্তানের বোঝা’ এমন অমানবিক মানসিকতা যেন আমাদের কারুর মনে সৃষ্টি কখনও না হয়। ইসলামের নির্দেশ হলো: তোমাদের বয়স্ক মা-বাবা যেন ‘উহ্’ শব্দ পর্যন্ত না করে। অথচ আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত হামিদ সরকাররা সৃষ্টি হচ্ছেন। এই হামিদ সরকাররা সবাই নিঃস্ব কিংবা পথের ফকির এমনও নন। অনেকের অঢেল সম্পদ ও বিত্তবান সন্তানাদিও রয়েছে। তাহলে হামিদ সরকারদের এমন পরিণতি হয় কেন? উত্তর সহজ। সন্তানরা মানুষ হয়নি বা তাদের মানুষ করা যায়নি। হয়তো আলোচ্য হামিদ সরকারেরও কোনও গাফিলতি ছিল। এটাই বড় ট্র্যাজেডি!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ