মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যা কেন?

মো তোফাজ্জল বিন আমীন : পৃথিবীর কোন ধর্ম মানুষকে অন্যায় অবিচার জুলুম হত্যা খুন করতে উৎসাহিত তো করে না-ই বরং নিৎরুসাহিত করেছে। তারপরেও ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে একশ্রেণীর মানুষ সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাতকে হত্যা করতে কুন্ঠাবোধ করছে না। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান সব ধর্মের মানুষ মহান আল্লাহতায়ালার নিয়ম বিধি-বিধান মেনে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। জন্মের আগে কোন মানুষ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। মানুষের তৈরি মতবাদ আজকের দুনিয়াতে সকল বিশৃঙ্খলার জন্য মূলত দায়ী। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক দেশে যখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা নিরীহ মুসলিমকে গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে হত্যা করে তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। অথচ সেখানে মুসলিম নাগরিকদের বিনা অপরাধে হত্যা করা হচ্ছে। একটি দেশের সরকার গণতান্ত্রিক নাকি স্বৈরতান্ত্রিক তা বুঝার জন্যে প্লেটো বা এরিস্টল হওয়ার প্রয়োজন নেই। ওই দেশের সব ধর্মের বিশ্বাসী মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি পর্যালোচনা করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। ভারতে গণতন্ত্রের যে নমুনা বিশ্ববাসী দেখছে তা সত্যিই বেদনাদায়ক। গরু নিয়ে তারা যে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোন সভ্য দেশে কল্পনা করা মেলা ভার। ভারতের নিরীহ মুসলমানের উপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যে নির্মম নির্যাতন করছে তা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। নিবন্ধনের শুরুতে একজন মুসলিম হিসেবে তীব্র নিন্দাজ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি মহান আরশের মালিকের কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন দয়া করে উগ্র হিন্দুত্ববাদীর নিষ্ঠুরতার হাত থেকে মুসলিম নাগরিকদেরকে রক্ষা করেন। গত ২৯ জুন ভারতে আলিমুদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে উগ্র হিন্দুবাদীরা হত্যা করেছে। তার বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগ আনা হচ্ছে, তিনি একটি গাড়িতে করে গরুর গোশত নিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আগে ২০ জুন একই রাজ্যের উসমান আনসারি নামে এক মুসলিমকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়। গত ২২ জুন দিল্লী থেকে ঈদের কেনাকাটা করে ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল ১৬ বছরের মুসলিম কিশোর হাফিজ জুনাইদ। তার সাথে ছিল তার ভাই ও আরো দুই বন্ধু। ট্রেনে উগ্রহিন্দুরা জুনাইদকে পিটিয়ে হত্যা করে। মুসলমানদের উপর অত্যাচারকারী হিন্দুদের কোন শাস্তি হয় না, কারণ তারা হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী। ভারতে গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে নিরপরাধ মুসলিমদের হত্যা ও অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাই প্রমাণ করে মানবতার প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই। মানবতার দুশমন ভারতীয় উগ্র হিন্দুরা তান্ডবলীলায় মেতে ওঠলে ও মুসলিম শাসকদের টনক নড়েনি। এ সন্ত্রাসী হায়েনাদের বর্বর আক্রমণে শত শত মুসলিম প্রাণ দিলেও মানবতার ফেরিওয়ালাদের বিবেক জাগ্রত হয়নি। নিকট অতীতে বাংলাদেশে একজন হিন্দু ধর্মালম্বী খুন হওয়ার পর ভারতের রাষ্ট্রদূত কঠোরভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য ভারতে গরু রক্ষার নামে একের পর এক মুসলমান হত্যার পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা টুঁশব্দ পর্যন্ত করার সাহস করেনি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গো-রক্ষার নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার উৎসবে মেতেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও নীরব ছিলেন মোদি। অবশেষে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদের মুখে গো-রক্ষকদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মোদি। তবে তার এ হুঁশিয়ারি যেন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। থামেনি গো-রক্ষকদের নিষ্ঠুর তান্ডব। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপেস’র সম্পাদকীয়তে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কিন্তু বক্তব্যে মোদি  গো-রক্ষকদের তান্ডবে নিহত মুসলিমদের নাম উল্লেখ না করার সমালোচনাও করেছে পত্রিকাটি। গরুকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে ভারতে যে অপরাধমূলক কান্ডকারখানা এখন সরকারের নাকের ডগায় ঘটে চলছে তার নজির সভ্য সমাজে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সম্প্রতি ভারতীয় কিছু নারী মুখোশ পরে ছবি তুলেছে নানা জায়গায়। তাদের দেখা যাচ্ছে কলেজের ক্লাসরুমে। ট্রেনের কামরায়। এমনকি রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে। গরুর মুখোশে নানা জায়গায় ভারতীয় নারীদের এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জুগিয়েছে। এটি মূলত ভারতীয় সমাজে নারী কতটা অবহেলা আর নিরাপত্তাহীনতার শিকার তা তুলে ধরতে এক অভিনব প্রতিবাদ। ২৩ বছরের ভারতীয় ফটোগ্রাফার সুজাত্র ঘোষ। তিনি মূলত ফটোগ্রাফি প্রজেক্ট শুরু করেন ভারতে এখন গো-রক্ষার নামে যা ঘটেছে তা দেখে। ভারতের শাসকগোষ্ঠীর দিকে তিনি যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিতে চেয়েছেন তা হলো, ভারতে কি মেয়েরা গরুর চাইতেও অধম! সুজাত্র ঘোষ আরও বলেন, আমার দেশে মেয়েদের তুলনায় গরুকে যে এতো বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, সেটা দেখে আমি বিচলিত। এখানে একজন মেয়ে ধর্ষিতা বা লাঞ্ছিত হওয়ার পর বিচার পেতে যে সময় লাগে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত বিচার পায় একটি গরু। কারণ উগ্র হিন্দুরা এই গরুকে পবিত্র মনে করে। ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হলেও ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে দেশটি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে।

সম্প্রতি ভারতজুড়ে মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব প্রকট আকার ধারণ করছে। সব দোষ শুধু মসুলমানদের উপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে একটু ইতিহাসের পেছনের অধ্যায়গুলো আলোচনা করতে হবে। কিসের জন্য মুসলমান-হিন্দুতে এত কলহ? তবে কি মুসলমান জাতি গরুকে খাদ্যকরণ হিসেবে গ্রহণ করে বলে এত খুনাখুনি? মুসলমান শুধুমাত্র গোশতটুকু নিজে খায় কিন্তু গরুর চামড়া, হাড়, শিং আর লেজের চুল ইত্যাদির প্রত্যেকটি জিনিসের ব্যবসাগুলো করে কারা তার তথ্যও প্রকাশ করা জরুরী। যারা গরুকে ভক্তি করেন সকলেই গোশত ভক্ষক। যেমন- এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপের প্রত্যেকটি রাষ্ট্র চীন, জাপান, জার্মানি, ফান্স, বুলগেরিয়াসহ অনেক দেশেই গোশত প্রিয় খাদ্য। অথচ তারা যদি কেউ ঘৃণার পাত্র না হয় তাহলে মুসলমানেরা কেন ঘৃণার পাত্র হবে? এই গোমাংস নিয়ে বিবাদ নতুন নয়! বরং বলা চলে বহু পুরাতন। মুসলমান তার নিজস্ব প্রয়োজনে গোমাংস খাবে তাতে কারও উত্তপ্ত হবার কোন যুক্তিক কারণ থাকতে পারে না। গরু নিয়ে বিবাদটা যদি ধর্মের তাহলে তাও বিচার করা কর্তব্য। প্রথম কথা, আমরা গাভীর দুধ খাই অতএব গাভী আমাদের মা। মাতৃহত্যা মহাপাপ সত্যি কথা। দুধ খেলে যদি তাকে মা বলতে হয় সেখানেও কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আজও বহু দেবতার পূজোয় মোষ বলী চলেছে। তাছাড়া ছাগলের দুধও আমরা বিশেষ আগ্রহের সাথে খাই। তবে কি ছাগল, মোষ, গরু, সবই খাওয়া ছাড়তে হয় না? সুজিত কুমার মুখোপাধ্যায় মহাভারত মনু ও বিষ্ণু পুরাণ হতে প্রবাসীর আশ্বিন সংখ্যার (১৩৭৩) ৬০১ পাতায় প্রমাণ করেছেন যে গোমাংস অবৈধ নয়। স্বামী বিবেকানন্দও বলেছেন, ‘এই ভারতেই এমন সময় ছিল যখন গোমাংস না খেলে কোন ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্ব থাকত না। বেদ পড়লে দেখা যায় কোন বড় সন্ন্যাসী বা রাজা বা অন্য কোন বড়লোক এলে ছাগল ও গরু হত্যা করে তাদেরকে খাওয়ানোর নিয়ম চালু ছিল।’ (তথ্য ঃ বিবেকানন্দ রচনা সমগ্র পৃষ্ঠা ৭১৪)

 

গণতন্ত্রের দেশ, ধর্মনিরপেক্ষতার দেশ, অহিংসবাদী দেশে একের পর এক মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার মহাউৎসব চলছে যা সভ্যতার ইতিহাসে নজিরবিহীন। মুসলমানদের মসজিদ ধ্বংস করলে কি তাদের আইনে ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয় না? মুসলিম মহিলাদের ধর্ষণ করলে কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না? মুসলমানদের পাইকারিভাবে হত্যা করলে কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ মানবাধিকার ভূলন্ঠিত হয় না? একশ্রেণীর উগ্র সাম্প্রদায়িক লোক গো-রক্ষার নামে নিরীহ মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের স্টীম রোলার প্রয়োগ করে খুন করছে। ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়সহ ধর্মীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা ভারত সরকারের মৌলিক দায়িত্ব হলেও বিজেপি সরকার তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভারতের মুসলমানরা কী করুণ অবস্থায় দিন পার করছে তা বুঝার জন্য পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলেই উত্তর পাওয়া যাবে। মাইনরিটি রাইট গ্রুপ ইন্টারন্যাশানাল (এমআরজি) ও সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি এন্ড সেক্যুলারিজম (সিএসএসএস) প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, শুধু ২০১৬ সালেই দেশটিতে ৭ শতাধিক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। এতে ৮৬ জন নিহত ও ২৩২১ জন আহত হয়। ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মাত্রা বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে ৫৮০, ২০১২ সালে ৬৪০,২০১৩ সালে ৮২৩, ২০১৪ সালে ৩৪৪, ২০১৫ সালে ৭৫১ ও ২০১৬ সালে ৭০৩ জন। ইন্ডিয়া স্পেন্ডস নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গো-রক্ষার ইস্যুতে সহিংসতায় প্রাণ হারায় ৮৬ শতাংশ মুসলমান। ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর যেসব হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার ৯৭% হয়েছে নিরীহ মুসলমানদের উপর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর তথ্যমতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে উগ্রবাদী হিন্দুদের নারকীয় হামলায় ১০ জন মুসলমান নিহত হয়। ২০০২ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা মনে হলে আজোও গায়ের পশম শিউরে ওঠে। সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যার এক ট্রেনে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দিলে ৫৮ জন হিন্দু সন্ন্যাসী মৃত্যুবরণ করে। আর এই ঘটনার পুরো দোষটা মুসলমানের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। মুহূর্তে গুজরাটজুড়ে ভয়াভহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লেগে যায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলমানদের উপর নারকীয় হামলা চালায়। যেখানেই মুসলমান পেয়েছে সেখানেই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তাদের নিষ্ঠুরতার হাত থেকে গর্ভবতী মহিলার পেটের সন্তানও রেহাই পায়নি। মুসলমানদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়া হয়। ঐ সময় প্রায় দুইহাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। গরু ভক্তির নামে নিরীহ মুসলিম মানুষকে হত্যা করা কারো কাম্য হওয়া উচিত নয়। আমরা আশা করব ভারত সরকার গো-রক্ষার নামে নিরীহ মুসলিম হত্যা বন্ধ করার প্রয়াসে কার্যকরী উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ