মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জুমচাষ ন্যাড়া পাহাড় চাঁদাবাজি লুটপাটে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত

মনিরুজ্জামান মনির : বাংলাদেশের এক ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৫০৯৩ বর্গমাইল ভূমি দেশের এক-দশমাংশ ভূখ-কে বাংলাদেশের মানচিত্রে ধরে রেখেছে। এখানকার সহজ-সরল মানুষ উপজাতি ও বাঙালি সম্প্রদায়, একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বসবাস করলেও কিছু বাঙালিবিদ্বেষী সংগঠন তথা জেএসএস ও ইউপিডিএফ সশস্ত্র সঙ্ঘাতে লিপ্ত আছে। অস্ত্রই তাদের শক্তি। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের হোতা এরা, রাজনৈতিক হীনস্বার্থ তাদের কাছে বড়, মানবতা এখানে অসহায়-পদদলিত-ভূলুণ্ঠিত। গত ১২ জুন থেকে মাসব্যাপী রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ইতিহাসের বৃহত্তম পাহাড়ধস ট্র্যাজেডি, লাশের মিছিল, দুর্গত মানবতার কান্না ইত্যাদি সারা বিশ্বে ব্যাপক সহানুভূতির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বমানবতার কাছে ফলাওভাবে এই ভয়ংকর ট্র্যাজেডির বিবরণ প্রচারণা না করাতে বিশ্ববিবেক এগিয়ে আসে নাই। কিন্তু, জাতির বিবেক হিসেবে আমাদের দেশীয় পত্র-পত্রিকা, মিডিয়া-টিভি চ্যানেল যে দায়িত্ব পালন করছে তাতে আমরা আশান্বিত-আনন্দিত ও গর্বিত। প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা হলো-এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আলামতগুলো দীর্ঘকাল ধরে চাঁদাবাজি, রাষ্ট্রদ্রোহী সন্ত্রাস, অনাদর-অবহেলারই সম্মিলিত ফলমাত্র। তিন পার্বত্য জেলায় কয়েক যুগ ধরে অবাধে পাহাড় থেকে পাহাড়ে জুমচাষের নামে অগ্নিসংযোগ করে কোটি কোটি টাকার গাছপালা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে পাহাড়গুলোকে ন্যাড়ামাথা বানানো হয়েছে। অপরিকল্পিত-অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জুমচাষ একদিন পাহাড়ে পাহাড়ে বিরাট বিপর্যয় ঘটাবে- মুরুব্বীদের পূর্বাভাসই সম্ভবত জুন মাসের ট্র্যাজেডিতে বাস্তবায়িত হয়েছে। কোনো কোনো উপজাতি নেতা পাহাড়ে বাঙালিদের বসবাস ও ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য ভূমিধস ঘটেছে বলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, শান্তিচুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন না করাতেই নাকি এ ধরনের বিপর্যয় (হাস্যকর উক্তি)। একজন উপজাতি নেতা লংগদুতে সৃষ্ট দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রতিক্রিয়াতেই নাকি রাঙ্গামাটিতে পাহাড়িদের ঘাড়ে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কি তাই! পাহাড়ধস, ভূমিধস বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সেনাবাহিনীর মেজর, ক্যাপ্টেন, করপোরালসহ দুই শতাধিক মানুষ মাটিচাপায় মারা গেছেন। তারা কে উপজাতি? কে বাঙালি? সেটি দেখা হয়নি। রাঙ্গামাটির পাহাড়ধ্বসে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযানে নেমে সেনা অফিসার ও অনেক সৈনিক হতাহত হয়েছেন। এখানে বাঙালি বা উপজাতি বলে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। এরা জীবন দিয়েছেন জনগণের জন্য। যুদ্ধকালে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে- এটাই বড় কথা, এটাই আমাদের সান্ত¡না এবং সেনাবাহিনীর আত্মদান ও অবদান। সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের প্রধান, মেজর জেনারেল পদমর্যাদার একজন বড় কর্মকর্তা বলেছেন, “রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক পুরোপুরি চালু করতে মাসখানেক লাগবে”। এখনো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে মানবদেহ, ঘরবাড়ি ও মূল্যবান ব্যবহার্য্য সামগ্রী। লাশ বেরোচ্ছে দুর্গত এলাকার মাটিচাপার স্থান থেকে। অথচ উদ্ধার কাজ এত তাড়াতাড়ি সমাপ্ত ঘোষণা করা হ’ল কেন- সেটিও অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে। রাঙ্গামাটির ডিসি মাঞ্জারুল মান্নান সাহেবই এটা ভাল বলতে পারবেন।

সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির প্রধান শিকার রাঙ্গামাটি। ৭৪ কিলোমিটার রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৫০টি স্থানে গত ১৩ জুন পাহাড়ের মাটি ধসে পড়েছে। সাপছড়ি ও শালবাগান এলাকায় সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার অংশসহ দু’টি স্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীদের চেষ্টায় সাময়িকভাবে যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা গেছে। পরিবহনের অভাবে রাঙ্গামাটি শহরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আসতে পারছে না। ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে। দেখা দিচ্ছে খাদ্যসঙ্কট, জনদুর্ভোগ ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার পিটিআই ভবন, শিশু একাডেমি ভবন, গোধূলি আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উলুছড়া আলুটিলা পৌর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাদেশ বেতার আশ্রয়কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন দফতর, মনোঘর আবাসিক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র, ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের লেবাপাড়া, চম্পাতলি দেওয়ানপাড়া, জুনুমাছড়া, সন্দ্বীপ কলোনি এলাকা, বেতছড়ি, কচুখালি, ওমদা মিয়ার হিলসহ যেসব ত্রাণকেন্দ্র খোলা হয়ছে, তাতে করে ত্রাণসামগ্রী দুর্গত মানুষের হাতে এসেছে। এতে করে যে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার হাজার ভাগের এক ভাগই মাত্র পূরণ হওয়ার কথা। বাকি যে সমস্যা, তা হলো দুর্গত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই- ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ কে করে দেবে? কোথায় যাবে এসব অসহায় মানুষ? তাদের পুনর্বাসনের জন্য কি দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর সহযোগিতা কামনা করা যায় না? ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করতে আপত্তি কেন? তারা তো বাস্তবেই দুর্গত-অসহায়। নাকি সরকারের প্রেস্টিজ ইস্যুর কারণে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হচ্ছে না?

রাঙ্গামাটির পাহাড়ে ভূমিধস কেন?

আসলে খালি চোখে আমরা বলব- অতিবৃষ্টি, অবিরাম বর্ষণ, পাহাড়ের মাটি নরম হওয়া, জুমচাষের কুফল, গাছপালা কেটে ফেলা এবং বনায়নে বাধার সৃষ্টি করা, অব্যাহত লুটপাট, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির শিকার হয়ে উন্নয়ন কাজে দুর্নীতি ইত্যাদি এ ট্র্যাজেডির কারণ। পার্বত্য মন্ত্রণালয় বলছে- বজ্রপাতেই নাকি এ পাহাড়ধস (যদিও তাদের এ মন্তব্যের পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ও প্রামাণ্য তথ্য-উপাত্ত নেই)। এই মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরার বিরুদ্ধে পাহাড়ের উপজাতি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর হাজারো অভিযোগ। পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা হয়েও বিশেষ ব্যবস্থায় সন্তু বাবুর তদবিরে তিনি পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে ঢুকে ইচ্ছেমাফিক প্রশাসন চালাচ্ছেন। বাঙালিদের উন্নয়ন প্রকল্প তিনি সহ্য করতে পারেন না। তদুপরি, সাম্প্রতিক ভূমিধসের কারণ খুঁজতে গিয়ে এই সচিব দেশীয় কোনো বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাননি? এই জন্য পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের অদ্ভূত যুক্তি হিসেবে বজ্রপাতকে খাড়া করেছেন এবং বিদেশী দু’টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য চেয়েছেন। ইসিমড ও চীনের একটি সংস্থাকে দাওয়াত দিতে চান তারা। অথচ জুমচাষের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা এতে উল্লেখ নেই। বন বিভাগ পাহাড়ে ন্যাড়ামাথায় বনায়ন করতে চাইলেও পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের বাধার কারণে তা হয়নি। গত ১২ জুন ২০১৭ সন্ধ্যায় প্রচ- শব্দে বজ্রপাত শুরু হয়। দুই ঘণ্টার বজ্রপাত এবং প্রচ- বৃষ্টিপাতও চলতে থাকে। এতে রাঙ্গামাটির ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধস হয়। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৩৭টি স্থানে ধস হয়েছে। চীনা সংস্থা ও ইসিমডের কাজের তত্ত্বাবধান ও তদারকিতে দেশী বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে। নতুবা জাতি এ থেকে কোন সুফল পাবে না।  বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হবে মাত্র।

পাহাড়ধস মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। এ বিষয়টিকে স্বীকার করে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মূলত অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জুমচাষকে দায়ী করেছেন। যা উপজাতিরা বছরের পর বছর করে আসছেন। পাশাপাশি সন্তু লারমারা বন বিভাগের পাহাড়ে বনায়নের প্রকল্পে নানাভাবে বাধা দিয়ে আসছেন। এ জন্য পার্বত্যবাসী বাঙালিদের দায়ী করা কিংবা শান্তিচুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন না হওয়া খোঁড়া যুক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান-কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামে ১৯৯৯ থেকে ২০১৭ সাল-এ ১৮ বছরে পাহাড়ধসে ৬০৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে পাঁচটি পাহাড়ি জেলায় প্রায় ১১২৮ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি বন জুমচাষের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। ৪২১ বর্গকিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় উপজাতি আর বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনেই আবাসস্থল গড়ে তুলেছেন।

বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞরা বলছেন- রাঙ্গামাটি জেলার পাহাড়ধসের সমস্যাটি টেকনিক্যাল, কিন্তু এর সমাধান পলিটিক্যাল। রাজনৈতিকভাবে পাহাড়ধসের এ সমস্যায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সবাইকে একত্রে বসে সমাধান খুঁজতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ পাহাড়ধসের অভিশাপ থেকে মুক্তি চায়। এই ডিজিটাল যুগেও প্রকৃতির কাছে পাহাড়ি ভাইবোনেরা অসহায় অবস্থায় কেন থাকবেন? টেকনিক্যাল বিষয়ের সমাধানের জন্য দেশী-বিদেশী প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাহাড়ে বনায়নে বাধা দেয়া যাবে না। যেসব উপজাতি ভাইবোন জুমচাষ করছেন, তাদের বিকল্পপন্থায় পুনর্বাসন করতে হবে। ইসিমড ও চীনা বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোকে সমর্থন জানাই, তবে এটা যাতে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় এবং কিছু কর্মকর্তার ভ্রমণবিলাসে পরিণত না হয়, সে দিকেও নজর রাখার জন্য আবেদন জানাই।

পরিশেষে রাঙ্গামাটি জেলার পাহাড় ও ভূমিধসের শিকার সর্বহারা আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এবং তাদের ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ত্রাণসামগ্রী ইত্যাদি দিয়ে পুনর্বাসিত ও প্রতিষ্ঠিত করে নবজীবন প্রদানের জন্য সরকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ বিশ্ববাসীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি। 

(লেখক : রাঙ্গামাটি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার (এফএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব।)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ