শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

যানজটের খেসারত

রাজধানী ঢাকার প্রাত্যহিক যানজট সম্পর্কে নতুন করে নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। টিভি ও সংবাদপত্রসহ গণমাধ্যমেও সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে বহুদিন ধরে। এসব রিপোর্টে হাজার হাজার গাড়ির ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাসহ সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের বিবরণ তো থাকছেই, পাশাপাশি থাকছে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথাও। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনাও কম হয়নি। কিন্তু সরকার তো বটেই, অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এ পর্যন্ত তথ্য-পরিসংখ্যানসহ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে জানানো হয়নি। আসেনি সমাধানের সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনাও। ফলে মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগই সব সময় প্রাধান্যে থেকেছে। 

এ ব্যাপারে প্রথমবারের মতো গবেষণাভিত্তিক কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। গত বুধবার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা: এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শীর্ষক এক গবেষণা রিপোর্টে বিশ্বব্যাংকের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তীব্র যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষের ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর অর্থের দিক থেকে প্রতি বছর ক্ষতি হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকার। সে হিসেবে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৪ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়েছে, যানজটের ফলে রাজধানীতে গাড়ির গতি অনেক কমে গেছে। ১০ বছ আগেও  ঢাকায় একটি যানবাহন ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো। এখন সে একই যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ছয় দশমিক দুই কিলোমিটারে এসে নেমেছে। অথচ একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে পারে। সেদিক থেকে যানবাহনের গতি মানুষের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছেছে। এটাই অবশ্য শেষ কথা নয়। কারণ, বিশ্বব্যাংকের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অবস্থায় পরিবর্তন না ঘটানো গেলে ২০২৫ সালে যানবাহনের গতি আরো কমে ঘণ্টায় মাত্র চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। তখন মানুষ হেঁটেই যে কোনো যানবাহনের চাইতে কম সময়ে বেশি দূরে যাতায়াত করতে পারবে। 

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা রিপোর্টে এমন আরো কিছু তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে, যেগুলো সকল বিচারেই আশংকাজনক। যেমন ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ১৩৪ শতাংশ বাড়লেও রাস্তা বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ। যানবাহনের ক্ষেত্রেও বিস্ময়কর পরিসংখ্যান রয়েছে। যেমন বর্তমানে রাজধানীতে যে পরিমাণ বাস-মিনিবাসসহ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চলাচল করে প্রাইভেট বা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির সংখ্যা তার চাইতে অন্তত সাতগুণ বেশি। অর্থাৎ প্রাইভেট গাড়িই রাস্তার বেশিরভাগ জায়গা দখল করে রাখে। শংকিত হওয়ার মতো অন্য একটি তথ্য হলো, উল্লেখিত ১০ বছরে ৫০ শতাংশ বেড়ে রাজধানীতে জনসংখ্যা হয়েছে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ। এই হারে বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সালে দ্বিগুণ বেড়ে রাজধানীর জনসংখ্যা তিন কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাবে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা অবশ্য আশার কথাও শুনিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে। কিন্তু সেজন্য রাজধানীর যানজট সমস্যার অবশ্যই সমাধান করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে বেশ কিছু পরামর্শও এসেছে বিশ্বব্যাংকের ওই সংবাদ সম্মেলনে। ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং রাস্তায় দ্রুত গতিসম্পন্ন যানবাহন নামানোর পাশাপাশি বক্তারা ঢাকার পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিত নগরায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলেই বিশ্বব্যাংকের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে এবং পরামর্শ উপস্থাপন করতে হয়েছে। আমরাও বিষয়টিকে গুরুতর মনে না করে পারি না। কারণ, যানজটের জন্য প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার তথ্য শুধু নয়, বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হওয়ার তথ্যও নিঃসন্দেহে ভীতিকর। অন্য দু’একটি তথ্যেরও উল্লেখ করা দরকার। যেমন দেশের মোট জিডিপির ৩৭ শতাংশেরই যোগান দিচ্ছে রাজধানী ঢাকা। যানজটের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেলে এই পরিমাণ অনেক বাড়তো। বড় কথা, যাজটের কারণে মানুষের শুধু কর্মঘণ্টাই নষ্ট হচ্ছে না, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেকে দেশ থেকেই চলে গেছেন। এখনো যাচ্ছেন অনেকে। এভাবে সব মিলিয়েই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। 

সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই আমরা মনে করি, বিশ্বব্যাংক বলেছে বলে শুধু নয়, দেশের অস্তিত্ব এবং জাতীয় অর্থনীতির সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থেও রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকারের উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে ভারতের রাজধানী দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দিক্ষিত উপস্থিত থেকে এবং চীনের বাণিজ্যিক নগরী সাংহাইয়ের সাবেক  ভাইস মেয়র কিঝেং ঝাও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। অংশগ্রহণকারী অন্য বিশেষজ্ঞরাও নানামুখী পরামর্শ দিয়েছেন। এসব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের পাশাপাশি দেশীয় নগর পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময় করলে যানজট সমস্যার সমাধান করার পথ বেরিয়ে আসতে পারে বলেই আমরা বিশ্বাস করি। সরকারের উচিত এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেয়া। আমরা চাই, রাজধানী ঢাকা স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হয়ে উঠুক এবং কেবলই বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরিবর্তে লাখ লাখ মানুষ জনশক্তিতে রুপান্তরিত হোক। একই সাথে বাংলাদেশ পৌঁছে যাক উচ্চ-মধ্যম আয়ের একটি দেশের পর্যায়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ