সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কিছু মানুষকে যায় না ভোলা কিছু কথা থাকে হৃদয়ে মিশে

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী :  [গত কালের পর]
নিম্নে ১৭ জুন ২০১৩ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় জনাব ফজলুর রহমান এর বক্তব্য যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার হুবহ তুলে ধরা হল “১৯৪৭ সালে আপনারা সিলেটবাসী কুড়াল মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলায় এসেছিলেন। তারপর স্থানীয় জাতীয় রাজনীতিতে সিলেটের অনেক মহান নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাসে উন্নয়নের রূপকার হিসেবে একজনই ঠাঁই পেয়েছেন তিনি মরহুম সাইফুর রহমান, বিএনপির সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের স্নেহছায়ায় থেকে যিনি সিলেটের উন্নয়নে ভূমিকা রখেছিলেন তিনিই আরিফুল হক চৌধুরী। ভোটারদের উদ্দেশ্যে ফজলুর রহমান বলেন আজ থেকে ১৭ বছর আগে এই সিলেট নগরীতে আমি ফজলুর রহমান রাতের পর রাত বদরউদ্দিন কামরানের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা করে আপনাদের কাছে ভোট চেয়েছি। সেই কামরানও আজ নেই, সেই ফজলুর রহমানও আজ নেই। মাঝখানে সুরমা, মেঘনা, কুশিয়ারায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আপনারা বলতে পারেন আমি ফজলুর রহমান নীতিভ্রষ্ট আদর্শচ্যুত, তাই আজ বিএনপিতে এসে আরিফের জন্য ভোট চাইছি। আপনাদের অবগতির জন্য বলতে চাই, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে আওয়ামী লীগ রোজগার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। দুঃখজনক হলেও সত্য, মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি।
ছয় দফা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুসহ নেতারা যখন জেলে তখন নেত্রী দলের হাল ধরেছিলেন ছয় দফার প্রচার চালিয়েছিলেন, সেই আমেনা বেগমও আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি। আওয়ামী লীগের যে সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দলের দুঃসময়ে কাজ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদও আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি। আপনাদের সিলেটের কৃতী সন্তান জেনারেল এমএজি ওসমানী সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। ’৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিও আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি। ষাটের ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণসম্পাদকের মধ্যে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ অনাদর অবহেলায় কোনো রকম আওয়ামী লীগে বেঁচে আছেন। ষাটের আরেক ছাত্রলীগ নেতা আওয়ামী লীগের এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুও একই অবস্থায় আছেন।
সিলেটের বন্দর বাজারের পঁচা আলু-পটলের মূল্য থাকলেও আওয়ামী লীগ আজ এতটাই অভিশপ্ত দল যে সেখানে আমু-তোফায়েলের কোনো মূল্য নেই। ষাটের ছাত্রলীগ নেতা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কা-ারী আবদুর রাজ্জাক কাঁদতে কাঁদতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, বুকভরা বেদনা নিয়ে এই দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলও ইন্তেকাল করেছেন। তাদের কাউকেই আওয়ামী লীগ সম্মান নিয়ে মরতে দেয়নি।
ষাটের ছাত্রলীগের পুনঃজন্মকালে ছাত্রলীগের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এই দল করতে পারেননি। কে এম ওবায়দুর রহমান আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি।  মাজহারুল হক বাকী, আবদুর রউফ, আওয়ামী লীগ করে মরতে পারেননি। ফেরদৌস আহম্মেদ কোরেশীও আওয়ামী লীগ করতে পারেননি। পারেননি খালেদ মোহাম্মদ আলী। ষাটের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক যিনি স্বাধীন বাংলার রূপকার, ইকবাল হলের পুকুরঘাটে যাকে আমার হাতের অনামিকা আঙ্গুল কেটে রক্ত দিয়ে মাতৃভূমি স্বাধীন করার শপথ নিয়েছিলাম সেই সিরাজুল আলম খান আওয়ামী লীগ করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ করতে পারেননি আ.স.ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ। স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতা '৭০-এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর নাম নিতে নিতে মারা যাচ্ছেন, তবুও আওয়ামী লীগ করতে পারেন না। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বঙ্গবন্ধুর ভাগনে শেখ শহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের উত্থানে সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে অমর অক্ষয়। কিন্তু তার ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন তো আওয়ামী লীগ করতে পারেনইনি, তার আরেক ছেলে ষাটের ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও নন। ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ রশিদ কোথায় কেউ জানে না। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী এখন বিএনপি করেন। তার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান করেন জাগপা। আপনাদের সিলেটের অলিতে-গলিতে যে ছাত্রনেতা তরুণদের আদর্শের রাজনীতির পাঠ দিয়েছিলেন সেই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ডাকসু ভিপি হয়ে সিলেটবাসীকে গৌরবান্বিত করেছিলেন। আজ সিলেটের ভোটের ময়দানে তিনি কেন প্রচারণায় নেই? তিনি কেন আওয়ামী লীগ করতে পারেন না? ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহলুল মজনুন চুন্নুর আওয়ামী লীগে ঠাঁই নেই। কোথায় আছেন কেউ জানেনা। সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান ও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন কোনো রকমে  বেঁচে আছেন। খ ম জাহাঙ্গীরের ঠাঁই নাই। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম তাকেও আওয়ামী লীগ করতে দেওয়া হয়নি।”
প্রিয় পাঠক, এই ছিল জনাব ফজলুর রহমানের ঐতিহাসিক বক্তৃতা। আমরা সেই আওয়ামী লীগের একটি নতুন পরিচয় পেলাম যে আওয়ামী লীগ জাতির ঘাড়ে এমনভাবে বসেছে মনে হয় আর কোনো দিন ঘাড় থেকে নামবে না বা নামতে হবে না। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাসে যত দাম্ভিক শাসক তাদের পরিণতি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জুলুম নির্যাতন আর চর দখল করার ঘটনা কখনই স্থায়ী হয়নি। কিন্তু মানুষের একটি দুর্বল মানসিকতা হলো যে, যেখানে অবস্থান করে সেটাকেই স্থায়ী মনে করে। নিজ কৃতকর্মের জন্য খেসারত দিতে হবে বা জবাব দিতে হবে ক্ষমতায় থাকলে এমনটি মনেই হয় না। আবার চতুরতার মাধ্যমে কাউকে পরাজিত করতে পারলে আনন্দে আত্মহত্যা হয়ে যায়। মনে হয় সে অনেক ভালো কাজ করে ফেলেছে। আর যাকে ঠকানো হলো তাকে বোকা ভাবে। বিষয়টি বড়ই বেদনার। প্রকৃতপক্ষে যিনি অন্যায়ভাবে কাউকে ঠকালেন নিঃসন্দেহে সে নিজেই যে ঠকলো সে কথা একেবারেই ভুলে যায়।
আজ আমরা এমন একটা লজ্জাজনক অবস্থার মধ্যে বিরাজ করছি। কতটা লজ্জার বিষয় যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অযথা মিথ্যা মামলা দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে চেয়ার দখল করে অনির্বাচিত লোকে ক্ষমতার বাহাদুরী করবে। ভোট কাটার ব্যাপারে বিশ্ববিখ্যাত জনাব এরশাদ সাহেবের সময়ও এমনটি হয়নি। এমনকি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৪টি আসনে যখন আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল তখনও প্রতিপক্ষের উপরে এমন আচরণ করা হয়নি। এবার আওয়ামী লীগ কেন এতটা বেপরোয়া হল এটাই জিজ্ঞাসা। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ