মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভুল ভাবনায় বাড়ছে দুর্গতি

বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এ পর্যায়ে এসেও মানুষ কি আবার পিছিয়ে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের কারণ আছে। উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে এখন বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার যে উগ্র ও বিকৃত মানসিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতো পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই বহন করে। তবে এমন বাতাবরণের মধ্যেও যখন কোন কোন ব্যক্তিত্ব এবং কখনও কখনও আদালত সঙ্গত ও মানবিক বক্তব্য রাখেন তখন হতাশার ভূগোলে কিছুটা জায়গা দখল করে নেয় আশাবাদ। আমরা যে অঞ্চলে বসবাস করছি সেখানেও এখন মাঝে মাঝে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের উগ্র ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। এটা বেশ অস্বস্তিকর বৈকি। তবে এর মধ্যেও ১১ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি খবরে বলা হয়, গবাদি পশুর মাংস কেনাবেচায় ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়কে বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা চালু করা হচ্ছে না বলে জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে হলফনামা দিতে হবে। সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ে অস্বস্তিতে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে কিছুটা স্বস্তি পেলেন সংখ্যালঘু মুসলিম ও মাংস ব্যবসায়ীরা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের আমলে গো-রক্ষা আন্দোলনের নামে ভারতে যে উগ্র সাম্প্রদায়িক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে তা সাম্প্রতিককালের এক মন্দ উদাহরণ। গো-মাংস রাখা, বহন কিংবা খাওয়ার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর শুধু হামলাই করা হয়নি হত্যাও করা হয়েছে। এমন কর্মকা-ে ভারতের সাধারণ মানুষ এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বরা অস্বস্তির মধ্যে আছেন। বিষয়টি মোদি সরকার এবং তার সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক মহল উপলব্ধি করলে দেশ ও জনগণের মঙ্গল হয়।
এদিকে ভারতের উত্তর-চব্বিশ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া ও বশিরহাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি বলেছেন, বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উদ্বেগের বিষয়। কারোর প্ররোচনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলো কিনা তা খুঁজে দেখতে হবে। তিনি আরো বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যই হলো এখানে হিন্দু ও মুসলিমরা মিলেমিশে বসবাস করেন। আমাদের ভেবে দেখতে হবে অশান্তির ঘটনা কেন ঘটলো? এসব ঘটনা কিভাবে আটকানো যায় তাও আমাদের ভাবতে হবে বলে জানিয়েছেন অমর্ত্য সেন।
বর্ণবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা সভ্য সমাজে চলতে পারে না। মানুষ তো বর্ণবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চর্চার জন্য সমাজবদ্ধ হয়নি। তাই মানব সমাজে যখন অনাকাক্সিক্ষত এমন চেতনার উগ্রতা লক্ষ্য করা যায় তখন যারা নিজেদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তাদের অবশ্যই এমন সংকট নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এমন ভাবনার কথাই উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য সেন। শুধু ভারতে নয়, উন্নত সভ্যতার দাবিদার যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনেও এখন বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার উগ্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পথে-ঘাটে, যান-বাহনে এমনকি প্লেনেও মুসলিম এবং এশীয়দের হেনস্তা করা হচ্ছে। আক্রমণ করা হচ্ছে, হত্যাও করা হচ্ছে। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় তো মুসলিম ও এশীয়দের লক্ষ্য করে এসিডও ছোঁড়া হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, আমরা কি তাহলে আলো-ঝলমলে এই সভ্যতায় এক নতুন জাহেলিয়াতে প্রবেশ করছি? এমন মূর্খতাকে মেনে নেয়া যায় না। তাই তো চিন্তাশীল মানুষরা এখন বলছেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি চর্চায় আমরা এগিয়ে গেলেও মানুষ হিসেবে পিছিয়ে পড়েছি। সঠিক জীবনদর্শনের লালন ও চর্চার অভাবেই মানবজাতি এক গভীর সংকটে পতিত হয়েছে। এই সংকট নিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিবেকবান সব মানুষেরই এখন ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে, প্রয়োজন রয়েছে সঠিক দিকনির্দেশনারও।
বর্তমান বিশ্বে সংকটের কোনো অভাব নেই। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নিত্যনতুন সংকট। আর এই সব সংকটের আছে নানা রূপ। অনেক সংকটেরই যৌক্তিক কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো সংকট আবার ইচ্ছে করেই সৃষ্টি করা হয়। এর পেছনে সক্রিয় থাকে সংকীর্ণ স্বার্থ এবং বিকৃত মনোভাব। সংকট নিয়ে ১১ জুলাই ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এ একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে যার শিরোনাম ছিল ‘কাতার সংকটের মূল হোতা ট্রাম্প-জামাতা’। খবরটিতে বলা হয়, সর্ষের ভেতরেও ভূত থাকতে পারে। ফাঁস হওয়া তথ্যে জানা গেছে, নিরীহ দর্শন এবং সুদর্শন জেরার্ড কুশনারই কাতার সংকটের আসল হোতা। কাতার সংকটের আগে কাতারের কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাতা কুশনার। কিন্তু ওই অর্থ লাভে তিনি ব্যর্থ হন। যার জন্য চড়া মাশুল গুণতে হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্র কাতারকে।
বৃটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, কুশনার চেষ্টা করেছিলেন কাতারের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তার প্রত্যাশিত ঋণের অংক আদায় করতে। কিন্তু নিরীহ চেহারার কুশনারকে ততটা বিশ্বাস করতে পারেননি কাতারের জাঁদরেল ব্যবসায়ীরা। তারা কুশনারের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। আর এর প্রতিশোধ নিতেই শ্বশুর ট্রাম্পকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কুশনার। তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে শ্বশুরের আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলোর একটি বড় যোগসূত্র থাকতে পারে। ব্যবসার শুরুর দিকে কুশনার নিউইয়র্কের ৬৬৬ ফিফথ এভিন্যুতে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিল্ডিং কিনেছিলেন। সেই সময় এটি ছিল একটি রেকর্ড ভাঙা চুক্তি। নিউইয়র্ক টাইমস-এর সূত্র মতে বর্তমানে বিল্ডিংটির এক-চতুর্থাংশ স্থান খালি পড়ে আছে। বিল্ডিংয়ের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে কুশনারকে। তাই আরও ঋণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে কুশনারের। সেই প্রয়োজনে কাতারের দিকে চোখ পড়েছিল তার।
আমরা তো এ কথা জানি যে, যারা ব্যবসা করতে চান তাদের তো নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে এবং নিয়ম-নীতি মেনেই তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। আমরা এ কথাও জানি যে, ব্যবসায় জেনেশুনে কেউ লোকসানের নৌকায় পা রাখতে চাইবে না। তাই কাতারের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা যদি কুশনারকে ঋণ না দিতে চান কিংবা লোকসানের ভয়ে তার সাথে ব্যবসায় যুক্ত হতে না চান তাহলে এ জন্য তো তাদের দোষারোপ করা যায় না, শত্রুজ্ঞানও করা যায় না। সারা পৃথিবীতে এটাই ব্যবসার শিষ্টতা। কিন্তু কুশনার তা মানবেন কেন, তিনি যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা! এ ব্যাপারে ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর রিপোর্টে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা খুবই ভয়ংকর। অবস্থা যদি এমনই হয় তাহলে আমরা কী করে ভাববো যে এক সভ্য পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কি এ ব্যাপারে কিছুই বলার নেই?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ