বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সিইসির রোডম্যাপ প্রসঙ্গে

খুব বেশি আশা করার যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকলেও পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি জনগণের সচেতন অংশের ধারণা ছিল, কয়েক বছর ধরে দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন নির্বাচন কমিশন সম্ভবত এমন কোনো কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দেবে, যার ফলে শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনাই সৃষ্টি হবে না, সকল দলও ওই নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য উৎসাহিত হয়ে উঠবে। শুরু হয়ে যাবে নির্বাচনমুখী তৎপরতা। অন্যদিকে গত রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা রোডম্যাপের নামে যে কর্মপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন, তা রাজনৈতিক দলগুলোকে তো বটেই, সাধারণ মানুষকেও আশান্বিত করার পরিবর্তে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ও শংকিত করে তুলেছে। একমাত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো দলই এই রোডম্যাপকে স্বাগত জানায়নি। দেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বরং ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেছে, সিইসি এমনভাবেই তার রোডম্যাপ তৈরি ও ঘোষণা করেছেন, যাতে আওয়ামী লীগই আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এই রোডম্যাপ অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আরো একটি ৫ জানুয়ারির উদাহরণ সৃষ্টি হবে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন অনেকে। সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ পর্যবেক্ষকরা প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে আয়োজিত দশম সংসদ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলই অংশ নেয়নি। যার ফলে আওয়ামী লীগের ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। এর বাইরে যে আসনগুলোতে নামকা ওয়াস্তে নির্বাচন হয়েছিল সেসব আসনেও পাঁচ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী বর্ণিত ‘নিয়ম রক্ষার’ সে নির্বাচনকেই তখনকার নির্বাচন কমিশন বৈধতা দিয়েছিল। বিশ্বের দেশে দেশে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হলেও এবং একমাত্র ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশ স্বীকৃতি না দিলেও ওই নির্বাচনের ভিত্তিতেই আবারও ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ আর প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন শেখ হাসিনা।
সিইসির ঘোষিত রোডম্যাপ কেন নিন্দিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন তথা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কেন আওয়ামী লীগের সেবাদাসের ভূমিকা পালন করার অভিযোগ উঠেছে তার কারণ জানতে হলে এই রোডম্যাপের মূল কথাগুলোর দিকে লক্ষ্য করা দরকার। যেমন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রধান পূর্বশর্তই হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, যাতে সকল দল সে নির্বাচনে বাধাহীনভাবে অংশ নিতে পারে। অন্যদিকে সিইসি কিন্তু এসব বিষয়ে কিছুই বলেননি। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো যে মিছিল-সমাবেশ দূরে থাকুক, ঘরোয়া বৈঠক পর্যন্ত করতে পারছে না এবং সরকারের পুলিশ যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পর মামলা দেয়ার পাশাপাশি গ্রেফতারের জন্য তাদের ধাওয়া করে বেড়াচ্ছে- এসব বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন সিইসি। শত শত রাজনৈতিক মামলার শিকার এবং গ্রেফতারের আতংকে পালিয়ে থাকা নেতা-কর্মী এবং তাদের দলের পক্ষে নির্বিঘ্নে নির্বাচনী কর্মকান্ডে অংশ নেয়া সম্ভব কি না, আর সেটা সম্ভব না হলে পরিকল্পিত কোনো নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারবে কি না সে ব্যাপারেও কিছু বলেননি সিইসি নূরুল হুদা। অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে সহায়ক সরকারের বিষয়টি। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের পক্ষে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনের আগে একটি সহায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। তিনি সেই সাথে জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারবে না। একই কারণে একমাত্র সহায়ক সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকারের অধীনে হলে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের কোনো দল সে নির্বাচনে অংশ নেবে না। তেমন অবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে- এই সহজ কথাটা না বোঝার কারণ ছিল না সিইসি নূরুল হুদার। অন্যদিকে তিনি শুধু সহায়ক সরকারের প্রসঙ্গই পাশ কাটিয়ে যাননি, একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের সুরে ও ভাষায় সিদ্ধান্তের আকারে জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব এবং তার নেতৃত্বাধীন কমিশন সেটাই করে দেখাবে! 
উদ্বেগ ও সংশয়ের কারণও সৃষ্টি হয়েছে সিইসির এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে। নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জরুরি বিষয়গুলো সম্পর্কেও কোনো কথা বলেননি সিইসি নূরুল হুদা। প্রচন্ড দমন-নির্যাতনের মধ্যেও কিভাবে সকল দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হবে এবং সিইসি চাইলেও সেটা করা আদৌ সম্ভব কি না- সে প্রশ্নেরও উত্তর নেই তার ঘোষিত রোডম্যাপে। এভাবে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায়ও পরিষ্কার হয়ে যাবে, নামে রোডম্যাপ হলেও সিইসি আসলে এমন কিছুই বলেননি, যার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে সামান্য আশাবাদেরও সৃষ্টি হতে পারে। বাস্তবে বরং এমন আশংকাই শক্তিশালী হয়েছে যে, কে এম নূরুল হুদার কমিশনও আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু করেছে। এই আশংকা সত্য হলে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাবে এবং একযোগে আরো জটিল ও মারাত্মক হয়ে পড়বে রাজনৈতিক সংকট। আমরা তাই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞসহ জনগণের সচেতন অংশের সঙ্গে মতবিনিময় করার এবং সকলের পরামর্শের ভিত্তিতে এমন একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সিইসির প্রতি আহ্বান জানাই, যাতে পরিকল্পিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে সকল দলের পক্ষে নির্ভয়ে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়া সম্ভব হয়। যাতে সকল দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়। আমরা চাই না, যুগ যুগ ধরে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আসা বাংলাদেশে আরো একটি ৫ জানুয়ারির নজীর তৈরি হোক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ