শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভয়াবহ পানিবদ্ধতা ও ভূমিকম্পের আশংকা

স্টাফ রিপোর্টার : এখনই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা না নিলে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে রাজধানী ঢাকা বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করে বিশ্ব ব্যাংক। একইসাথে এখানে বসবাসকারীদের ভয়াবহ পানিবদ্ধতা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলেও আশংকা প্রকাশ করে তারা। এছাড়া ঢাকার যানজটে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক আয়োজিত ‘টুওয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা : এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শীর্ষক খসড়া প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়।  

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের দুই মেয়র, উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ঢাকায় বিগত ১০ বছরে যান চলাচলের গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে সাত কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে, যা পায়ে হেঁটে চলার গড় গতি থেকে একটু বেশি। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ঢাকার রাস্তা পাঁচ শতাংশ, জনসংখ্যা ৫০ শতাংশ এবং যান চলাচল ১৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন যানজট ও বাসযোগ্যতার পরিবেশের আরও অবনতি ঘটাবে এবং বাসিন্দাদের বন্যা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ঢাকার নগরায়ন কেন্দ্র থেকে উত্তর দিকে এবং এরপর পশ্চিমাভিমুখে সম্প্রসারিত হয়েছে। মহানগরীর পূর্ব দিকে বেশিরভাগ এলাকা এখনও গ্রামীণ তবে দ্রুত বিকাশের সুযোগ রয়েছে।

মহানগরীর প্রায় ৪০ শতাংশের সমান পূর্ব ঢাকা এবং গুলশানের মতো সমৃদ্ধ এলাকার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ব ঢাকা-কে নানা সুবিধাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের একটি প্রাণচঞ্চল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব যা মূল শহরের অন্যান্য অংশের ভিড় ও যানজট কমাতে সহায়ক হবে।  প্রতিবেদনে সতর্ক করে দেয়া হয়, এখনই সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিতে হবে অন্যথায় দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পূর্ব ঢাকাও যানজট ও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। যা স্থানীয়দের বন্যা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে তিন কোটি ৫০ লাখে। বিপুল এ জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে উৎপাদনশীল ও বাসযোগ্য মহানগরী হিসেবে ঢাকা-কে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

‘উন্নত মহানগরীর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ঢাকা-কে নিয়ে অবশ্যই সঠিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, সকল সংস্থার কাজের সমন্বয় সাধন এবং বিনিয়োগের সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিশ্বব্যাংক ঢাকা-কে সমৃদ্ধ মহানগরী হিসেবে রূপান্তরে সহায়তা করতে সর্বদা প্রস্তুত’- উল্লেখ করেন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্থনি ভেনাবল্স ২০৩৫ সালের দিকে ঢাকার উন্নয়নের জন্য চারটি বিকল্প কর্মপন্থাও উপস্থাপন করেন।

সারা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত মহানগরীর উদাহরণ টেনে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মার্টিন রামা বলেন, পূর্ব সাংহাইয়ের পুডং এলাকা ও অন্যান্য স্থান প্রমাণ করে যে, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে যানজট নিরসন সম্ভব। এর মাধ্যমে সেখানকার অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধির পাশাপাশি বসবাসের উন্নত পরিবেশও নিশ্চিত করা সম্ভব।  ‘ঢাকার বিশাল ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিবেচনায় যথাযথভাবে পূর্ব ঢাকার টেকসই উন্নয়ন, অত্যধিক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রেট্রোফিট টেকনোলজি (এমন একটি প্রযুক্তি যেটা দিয়ে পুরোনো ভবন না ভেঙে যথাযথ শক্তিশালী করা) ব্যবহার করা। এ প্রযুক্তি অনেক বেশি কার্যকর এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভজনক। এখনই এ কাজ করার সঠিক সময়’- বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ভারতের দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত এবং চীনের সাংহাইয়ের সাবেক ভাইস মেয়র কিঝেং ঝাও সম্মেলনকালে দিল্লি ও পূর্ব সাংহাইয়ের পুদং এলাকার উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন। ওই দুই মহানগরীর একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমন্বয়ের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বমূলক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নত ঢাকা গঠনে তাগিদ দেন বক্তারা।  

মেয়র আনিসুল হক বলেন, বিশ্বব্যাংক ভাল পার্টনার, কিন্তু লেইট ডিসিশন মেইকার। এখানে সমস্যা হলো জনসংখ্যা ও ট্রাফিক। আমাদের অনেক প্রস্তুতি দরকার। প্রয়োজন সরকারের অংশগ্রহণ।

মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এখানে এখনও পরিকল্পিত ড্রেনেজ, সুয়ারেজ, অবকাঠামো নেই। দরকার সেবা খাতের মধ্যে সমন্বয় সাধন। ৫৬ সেবা খাত ঢাকায় কাজ করছে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনকে সিটি গভর্মেন্টে পরিনত করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ