রবিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চায় এনবিআর

স্টাফ রিপোর্টার : কর মামলায় আটকে থাকা রাজস্বের অংক ছাড়িয়েছে ১৭০৭২ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। এক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এনবিআর। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি কমাতে মামলা নিষ্পতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর।
এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন যত দ্রত এসব মামলা নিষ্পতি করা যায় দেশের জন্য তা ইতিবাচক। তবে, এক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। বলছেন, করদাতা এবং কর কর্মকর্তা উভয়েরই থাকতে হবে মীমাংসার মানসিকতা।
ব্যক্তির আয় বা কোম্পানির মুনাফার ওপর আয়কর দিতে হয়। একে বলে প্রত্যক্ষ কর। আর পন্য আমদানি করতে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দিতে হয় শুল্ক। ভ্যাট দিতে হয় পন্য ও সেবার ক্ষেত্রে। একে বলে পরোক্ষ কর। আর এসব মিলিয়ে যে রাজস্ব পায় সরকার তা দিয়েই চলে দেশ ও অর্থনীতি।
তবে আয়কর, শুল্ক বা ভ্যাট-এ তিন খাতে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা স্বাভাবিক নিয়মে যেমন রাজস্ব দেন, তেমনি ফাঁকিও কম নয়। আর ফাঁকি ধরলেই কোনো কোনো করদাতা মামলা করে আটকে দেন রাজস্ব।
টাকার অংকে বিরোধপূর্ণ রাজস্বের পরিমাণও কম নয়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয় বিভিন্ন মামলায় আটকে আছে ১৭ হাজার ৭২ কোটি টাকার রাজস্ব। এর মধ্যে শুল্ক সংক্রান্ত মামলায় আটকে আছে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা, ভ্যাট সংক্রান্ত মামলায় ৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা এবং আয়কর মামলায় আটকে আছে ৮ হাজার ১৬৭ কোটি টাকার রাজস্ব।
এসব মামলা দ্রত নিষ্পত্তি করতে ২০১২ সাল থেকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। অর্থাৎ করদাতা ও করকর্মকর্তার উপস্থিতিতে সমঝোতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পতি। তবে, এখনও এডিআর পদ্ধতিতে মীমাংসার এ বিষয়টি খুব বেশি পরিচিতি পায়নি। এনবিআরের সাবেক এই কর্মকর্তা বলছেন, আয়করের ক্ষেত্রে এডিআরে মামলা নিষ্পত্তির হার কিছুটা বেশি। গেল পাঁচ বছরে আয়কর বিষয়ক ৮৯৯ টি মামলার মধ্যে পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে ৫১৯ টি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রবণতা ও মামলা জট হ্রাস এবং বিচারাধীন মামলা দ্রত নিষ্পত্তি করতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এনবিআর। এজন্য এনবিআরের অধীন সব কমিশনারের দপ্তরে কেবল মামলা তত্ত্বাবধানের জন্য বিশেষ ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ করেছে সংস্থাটি। এছাড়া ইনহাউজ সংলাপ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংলাপ, এটর্নি জেনারেল ও হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছে এনবিআর। এর পরও মামলা জট কাটছে না।
দেশের মোট রাজস্ব আয়ের বড় অংশই আহরণ করে এনবিআর। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর না হওয়ায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতির মুখে পড়বে এনবিআর। এ অবস্থায় রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। এজন্য রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, পদ্ধতিগত ত্রুটিজনিত শুল্ক-সংক্রান্ত মামলা ভবিষ্যতে যাতে হ্রাস পায়, সেজন্য সব কাস্টম হাউজ ও ভ্যাট কমিশনারেটকে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, নানা প্রচেষ্টার ফলে শুল্ক-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৯১০, যার সঙ্গে জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। পরবর্তীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার ফলে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা শুল্ক-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ৩৩-এ নেমে আসে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, মামলার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে, সেই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের পরিমাণও বাড়বে।
এনবিআরে বর্তমানে আয়কর-সংক্রান্ত রিট মামলা রয়েছে ১ হাজার ১১৮টি, যাতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। আর রেফারেন্স মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৯৩৩, জড়িত অর্থের পরিমাণ যেখানে ৮ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, জাতীয় আয় বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এনবিআরকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে তদারকি জোরদারের জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া অনিষ্পন্ন মামলা দ্রত নিষ্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিটির বৈঠক থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ