শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পাচার হওয়া টাকা প্রসঙ্গে

দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে জোর আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে প্রথমে চমকের সৃষ্টি করেছিল ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। প্রতিষ্ঠানটি গত মে মাসে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ছয় লক্ষ ছয় হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০১৪ সালেই পাচারের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আলোচ্য ১০ বছরে পাচার করা অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের দুটি অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা সম্ভব হতো বলেও জানানো হয়েছিল। 

অর্থ পাচারের খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পরই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা একে অন্যের ওপর দোষারোপের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলেন। কিন্তু সে প্রতিযোগিতা জমে ওঠার আগেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল আরো একটি চাঞ্চল্যকর খবর। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএনবি’র বার্ষিক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত এই খবরে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকগুলোতে ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা বা ৬৬ কোটি ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জমা পড়েছে। খবরে আরো বলা হয়েছিল, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নাকি বৈধভাবে জমা পড়েনি। কারা এইসব অ্যাকাউন্টের মালিক সে সম্পর্কেও জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, দেশের সংবিধানে এবং ব্যাংকিং আইনে নিষেধ থাকায় সুইজারল্যান্ডের কোনো ব্যাংকই গ্রাহকদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করে না বরং গোপন রাখে। আর সে কারণেই বিশ্বের চোরাচালানি ও সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকরা পর্যন্ত সকলে তাদের অবৈধ অর্থ বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে জমিয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। খবরটি ফাঁস হওয়ার পরপর আবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে পরস্পরকে আক্রমণের পালা শুরু হয়েছিল। বিএনপিসহ কয়েকটি বিরোধী দল বলেছে, আওয়ামী লীগের নেতারাই গোপনে টাকা জমা করেছেন, যাতে ক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটলে তারা বিদেশে পালিয়ে যেতে এবং ওই টাকা দিয়ে আয়েশে জীবন কাটাতে পারেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা বলেছেন, টাকা পাচারের রেকর্ড নাকি একমাত্র বিএনপির রয়েছে! অর্থাৎ বিএনপির নেতারাই টাকা জমিয়েছেন সুইস ব্যাংকে! 

এভাবে আক্রমণ এবং পাল্টা-আক্রমণ চালিয়ে দোষারোপের রাজনীতি করা হলেও ঘটনাপ্রবাহে পরিষ্কার হয়েছিল, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের ভেতরে যেমন কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে তেমনি  কোটিপতিরা ছড়িয়ে পড়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। শুধু সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকেই নয় তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা ও জার্মানিসহ আরো কিছু দেশেও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন! এই অর্থের বেশিরভাগই যে অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে সে কথাটাও আলোচিত হয়েছে বিশেষ গুরত্বের সঙ্গে। এমন এক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই সকলের নজর পড়েছিল সরকারের দিকে। সরকার পাচারকারীদের চিহ্নিত করে কি না এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না তা দেখার জন্য সাধারণ মানুষও উন্মুখ হয়ে পড়েছিল। অর্থমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সিলেটের এক অনুষ্ঠানে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, টাকা পাচারের সঙ্গে ‘আমরাও’ অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরাও জড়িত! 

অর্থমন্ত্রীর স্বীকারেক্তিমূলক বক্তব্য শুনে স্তম্ভিত হয়েছিল জনগণ। কিন্তু মাত্র দিন কয়েকের মধ্যেই সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেয়া বক্তব্যে কথিত ‘অতিশয়োক্তির’ অভিযোগে গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। বলেছেন, সাংবাদিকরা যাকে অর্থ পাচার হিসেবে প্রচার করেছেন সেটা নাকি মোটেও পাচার নয়। আসলে বাংলাদেশ এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একে কোনোভাবেই ‘পাচার’ বলা যায় না। অর্থমন্ত্রী অবশ্য ‘তবে’ যুক্ত করে স্বীকার করেছেন, অর্থ যে একেবারে পাচার হয়নি বা হয় না- তা নয়। তবে এই পাচারের পরিমাণ ‘অতি যৎসামান্য’। অন্যদিকে সেটাকেই সাংবাদিকরা ‘অত্যন্ত অন্যায়ভাবে’ বাড়িয়ে বলেছেন! 

লক্ষণীয় যে, ঘটনাপ্রবাহে একাধিকবার চমকের সৃষ্টির পাশাপাশি সংশয় ও জিজ্ঞাসারও কারণ সৃষ্টি করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সিলেটের এক অনুষ্ঠানে ‘আমরাও’ অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত বলার পর এমন কি ঘটেছে যার কারণে ‘রাবিশ’ ধরনের বক্তব্য রাখার মধ্য দিয়ে ‘বিখ্যাত’ হয়ে ওঠা অর্থমন্ত্রী রাতারাতি তার বক্তব্য পাল্টে ফেলেছেন এবং ‘যৎসামান্য’র সঙ্গে আবার ‘অতি’ যোগ না করে পারেননি- তা নিয়ে শুরু হয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনা। কারণ, অর্থমন্ত্রী যা বোঝাতে চেয়েছেন তার জন্য ‘যৎসামান্য’ই যথেষ্ট, ‘অতি’র দরকার পড়ে না। কথাটা বরং ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অন্দরমহলে অর্থমন্ত্রীকে সম্ভবত এতটাই নাজেহাল হতে হয়েছে যে, তিনি ভুল বা অশুদ্ধ বাক্য দিয়েই নিজের সত্য বলার অপরাধ সংশোধন না করে পারেননি! এমন ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশ্ন উঠেছে, অর্থমন্ত্রীর কোন কথাটিকে মানুষ সত্য বলে গ্রহণ করবে- তিনি সিলেটে যা বলেছিলেন সেটাকে, নাকি জাতীয় সংসদে যা বলেছেন সেটাকে? বলা হচ্ছে, সত্য যেটাই হোক না কেন, মিস্টার মুহিত কিন্তু নিজেই এবার ‘রাবিশ’ শোনার মতো উপলক্ষ সৃষ্টি করেছেন! কারণ তার দুটি কথার মধ্যে একটি সত্য হলে অন্যটিকে কেউ ‘রাবিশ’ বললে তাকে দোষ দেয়া যাবে না! 

আমরা মনে করি, যেহেতু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিসহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সেহেতু অর্থপাচারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে হাল্কাভাবে নেয়া কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কোনো দেশ থেকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে ভীতিকর। এমন অবস্থায় কর্তব্য যেখানে ছিল পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পাচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সরকার সেখানে উল্টো বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকাশিত গণমাধ্যমের খবরগুলোকে ‘অতিশয়োক্তি’ বা মিথ্যাচার বলে চালানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে যে পাচারকারীরা উৎসাহিত হবে এবং অর্থের পাচারই আরো বেড়ে যাবে সেকথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা তাই অসত্য বলার এবং শস্তা রাজনীতি করার পরিবর্তে অর্থ পাচার বন্ধের জন্য সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার জন্যও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ