শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রতিবেশে জীবন যেমন

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী : দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় আকারের প্রাণী হলো নীল তিমি। একটি পূর্ণ বয়স্ক নীল তিমির ওজন একটি হাতির চেয়েও প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এরা লম্বায় হয়ে থাকে প্রায় ত্রিশ মিটার। পানিতে ভেসে থাকা অবস্থায় একে একটি ছোট দ্বীপ বলেই মনে হয়। ভাবতে অবাক লাগে এ বিশাল আকারের প্রাণীটির খাবার হচ্ছে ক্রিল নামের কুঁচে চিংড়ি জাতের খুব ছোট এক রকমের প্রাণী। দক্ষিণ মেরুতে যে সাগর সেখানেই ঘুরপাক খেতে থাকে লাখ কোটি ক্রিল। আর নীল তিমি লাখ লাখ ক্রিলকে গোগ্রাসে গিলে বেঁচে থাকে। শুধু বিশালাকায় নীল তিমিই নয়, দুনিয়ার সর্ব দক্ষিণ মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকার বেশির ভাগ প্রাণীই ক্রিল নামের ক্ষুদ্র প্রাণীটি খেয়ে বেঁচে থাকে। অপরদিকে, ক্রিল বেঁচে থাকে প্ল্যাংকটন ও মাছের ডিম খেয়ে। 

অ্যান্টার্কটিকায় বসবাস করে যেসব প্রাণী, তারা জীবনের প্রয়োজনে একে অপরের ওপর নির্ভরতা গড়ে তুলেছে। একটি প্রতিবেশে এভাবেই জীবসম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা গড়ে ওঠে। অ্যান্টার্কটিকায় প্ল্যাংকটন, ব্যাকটেরিয়া, স্কুইড, মাছ, পাখি, সীল ও তিমি- সবাইকে নিয়েই গড়ে উঠেছে একটি প্রতিবেশ। পরিসরের দিক থেকে একটি প্রতিবেশ অনেক বড় বা অনেক ছোটও হতে পারে। পৃথিবী ও তার চার পাশের বায়ুম-ল নিয়ে যে জীবম-ল তাকে যেমন একটি প্রতিবেশ বলা চলে, আবার একটি খুব ছোট পচনশীল গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে গড়ে তুলতে পারে এক একটি প্রতিবেশ। একটি গাছে বসবাস করতে পারে শালিক, বাজপাখি, কাঠবিড়ালি, পেঁচা, কাঠঠোকরা, ব্যাঙের ছাতা, প্রজাপতি, মথ, লতাগুল্ম, গুবরে পোকা ইত্যাদি।

একটি পচনশীল গাছের গুঁড়ির কথাই বলি। দেখা যাবে, সে গুঁড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে একটি প্রতিবেশ যেখানে খুদে উইপোকা, পিঁপড়ে, নানা প্রজাতির পোকা-মাকড়, ইঁদুর, সাপের আনাগোনা শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে গুঁড়িটিতে গজিয়ে উঠছে ছত্রাক, ব্যাঙের ছাতা, লতাগুল্ম ও আরো হরেকরকম উদ্ভিদ। সেখানে পাখিরা ছুটেছে পোকামাকড়ের লোভে। সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর এসেছে একে অন্যের ওপর নির্ভর করছে বলে।

একটি প্রতিবেশ গড়ে ওঠে জীব ও জড় দু’টি উপাদানকে নিয়েই। প্রত্যেকটি মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটি জলে ও স্থলে দুই জায়গাতেই গড়ে উঠতে পারে। সূর্য অথবা পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপশক্তি প্রতিবেশের মূল শক্তি জুগিয়ে থাকে।

প্রতিবেশের ইংরেজি ঊপযড়ংুংঃবস শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে। এ শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে আবাস এবং এ আবাস বিচিত্র সব জীবের- যারা একে অপরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। অন্যকথায় এরা এসে একে অন্যের সঙ্গে একটা নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে তুলে। এ নির্ভরতা কেবল জীবের সাথে নয়, জীবের সাথে প্রকৃতিরও। এ জন্য তারা পরস্পরের চাহিদার মধ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য তৈরি করে। একটি পুকুরের গভীরে থাকে মৃগেল, তার কিছুটা উপরে থাকে কাতলা এবং আরো উপরে রুই মাছ। শোল, বোয়াল এসব রাক্ষুসে মাছ পানির খুব গভীরে না থাকলেও সারা পুকুর চষে বেড়ায়। আর কুঁচো চিংড়ি, পুঁটি, পাবদা, টেংরা পুকুরের আনাচে-কানাচে জলজ উদ্ভিদের আশপাশে ঘুর ঘুর করে। সেখানে ঠিক জায়গাটি বেছে নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকে বক, পানকৌড়ি। এরা ডুবুরি হয়ে শিকার করে আর মাছরাঙা ঘাপটি মেরে বসে থাকে পুকুরপাড়ে নুইয়ে থাকা গাছের ডালে। মানুষ সকাল-সন্ধ্যা নানা প্রয়োজনে ব্যবহার করে পুকুর- গোছল করা থেকে বাসন-কোসন মাজা ও কাপড়-চোপড় ধোয়া পর্যন্ত বিবিধ কাজে।

দুনিয়া জুড়ে যে বিচিত্র বসতি স্থানভেদে তাদের সংখ্যা ও রকমে খুব একটা সমতা নেই। মেরু অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যই বেশি। এর কারণ হচ্ছে, সেখানে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে খুবই ধীরগতিতে।

প্রতিবেশ সব সময় একরকম থাকে না। এটি বদলে যেতে পারে এবং যায়ও। আবার বিভিন্ন প্রতিবেশ একে অপরের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। স্থলজ প্রতিবেশ ও জলজ প্রতিবেশের মধ্যে তৈরি হয় পারস্পরিক সম্পর্ক। অনেক সময় একটি জলধারা স্থল ও জলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। একটি উপসাগরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে বিভিন্ন দ্বীপাবলি। এমনকি, অনেক দূরে থাকলেও পানি ও বাতাস দু’টি প্রতিবেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে পারে। আবার প্রাণিকুল ও বীজ এসব বয়ে নিয়ে বেড়ায় বাতাস। প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেশের একে অন্যের সাথে সম্পর্ক এতই গভীর যে, গোটা পৃথিবীকে পরস্পর নির্ভরশীল একটা বিশাল প্রতিবেশ বলা চলে। আর এই প্রতিবেশের অপর নাম হচ্ছে জীবম-ল। কোটি কোটি বছর ধরে জীবম-লে বিবর্তন ঘটছে এবং এ বিবর্তন সম্ভবত চলতে থাকবে আরো কোটি কোটি বছর। প্রতিবেশ খুব সহজেই নানারকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু তা হলেও আবারও তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কারণ প্রতিবেশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণীদের মধ্যে অপরিবর্তিত অবস্থার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে টিকে থাকা এবং এর মাধ্যমে প্রতিবেশ ভারসাম্য বজায় রাখে। কোনো প্রজাতির সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেলে তাকে সীমিত করার ব্যবস্থাও প্রকৃতিতে আছে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় স্থিতাবস্থা রক্ষার প্রয়োজনে খাদ্য সরবরাহকে একটি নেতিবাচক ব্যবস্থা বলা হয়। পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগান না থাকলে জনসংখ্যার অব্যাহত বৃদ্ধি বাধার সম্মুখীন হয়। স্থান সঙ্কুলান, রোগব্যাধি ইত্যাদি প্রতিবেশের স্থিতাবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এগুলো প্রতিবেশের একটি অভ্যন্তরীণ রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে।

বাহ্যিক কিছু উপাদানও প্রতিবেশে কাজ করে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবেশের স্থিতাবস্থা ক্ষুণœ করে। তবে বাহ্যিক উপাদানের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উপাদানই প্রতিবেশের প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বেশি। সমতলের প্লাবন ভূমিতে প্রতি বছর বন্যা হলে সেখানকার প্রতিবেশের প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর এর প্রভাব পড়ে। বন্যার পানি সরে গেলে সেখানে গজিয়ে ওঠে আগের মতোই গাছগাছালি এবং ফিরে আসে পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গরাও। শীতপ্রধান দেশগুলোতে প্রচ- শীতে এমনটি ঘটতে পারে। তবে তা সাময়িক। বসন্তে আবারও সে পূর্বাবস্থা ফিরে আসে। দাবানল হঠাৎ করে বৃক্ষরাজির যে ক্ষতি করে কিছুকাল পরেই তা পুষিয়ে যায়। 

 নেতিবাচক ফিডব্যাকের বিপরীত ইতিবাচক কিছু ফিডব্যাক প্রতিবেশের স্থিতি অবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কৃষি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে প্রতিবেশ ব্যবস্থার ধারণক্ষমতাও বেড়েছে। তবে এ ধারণক্ষমতা কতদিন টিকে থাকবে তা বলা মুশকিল। বিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করেন, কৃষি থেকে ফলনের যে সম্ভাবনা রয়েছে তা বর্তমান জনসংখ্যার দ্বিগুণ হলেও তাকে ধারণ করতে পারবে। কিন্তু আফ্রিকার কিছু দেশে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা এ প্রত্যাশাকে অবাস্তব প্রমাণিত করেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন সম্ভব হয়ে ওঠে না বলেই এমনটি হচ্ছে।

প্রতিবেশের বৈচিত্র্য নির্ভর করে বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যার ওপর। ‘প্রজাতি’ বলতে যারা নিজেদের বংশবিস্তার করতে পারে তাদের বোঝানো হয়। এরা বংশানুক্রমে নিজেদের বংশ বাড়িয়ে চলে। একটি প্রতিবেশের বিভিন্ন জাতির সংখ্যা গণনা করা কঠিন কাজ। তবে এদের একেকটি শ্রেণিকরণ করা যায়।

একটি জীব যেখানে বংশানুক্রমে টিকে থাকে সেটি তার যথাযোগ্য স্থান। এ স্থানে অনেক উপাদান রয়েছে। একটি প্রজাতির লালন ও বিকাশে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো সহায়তা জুগিয়ে থাকে। দু’টি প্রজাতির জন্য একই স্থান যথাযোগ্য হতে পারে এমন নেই। দেহের গঠন ও শারীরিক ভিন্নতার কারণে তাদের প্রতিবেশগত অবস্থান ভিন্নতর হতে পারে। জেব্রা ও জিরাফ একই উন্মুক্ত তৃণভূমিতে বাস করলেও তাদের অবস্থান বা যথাযোগ্য স্থানটি এক নয়। একই প্রতিবেশে এক একটি প্রজাতি তার যথাযোগ্য অবস্থানটি বেছে নেয়- এটি তার শারীরিক গঠন ও অবস্থাকে তার সাথে মানিয়ে নেয়। শালিক ও ফিঙে পাখি একই প্রতিবেশে বাস করে এবং বেঁচে থাকে পোকামাকড় খেয়ে। কিন্তু তা হলেও ফিঙে ধরে খায় উড়ন্ত পোকা এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে এ কাজে তৎপর হয়ে ওঠে। অপরদিকে, শালিক ঘাস অথবা মাটি খুঁড়ে পোকামাকড় খায়। সকাল ও দুপুরেই ওদের খাবার সংগ্রহের ব্যস্ততা বেশি।

প্রত্যেকটি প্রতিবেশেই রয়েছে একটি খাদ্যচক্র। এ চক্র ঘিরে থাকে সবুজ উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদ নিজেদের খাদ্য তৈরির কাজে সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তিকে ধারণ  করে। উদ্ভিদই হচ্ছে খাদ্য শৃঙ্খলের প্রাথমিক উৎপাদক। তৃণভোজী প্রাণী উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এ কারণে তৃণভোজী প্রাণীকে বলা হয় প্রাথমিক ভোক্তা। মাংসাশী প্রজাতি হচ্ছে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোক্তা। কারণ তারা তৃণভোজী প্রাণীদের খেয়ে থাকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে উপরিস্তরের মাংসাশীরা অন্য মাংসাশীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে খাদ্য শৃঙ্খল বা ঋড়ড়ফ পযধরহ গড়ে ওঠে।

মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ, মলমূত্র, ঝরাপাতা ও ফুল, খোসা ইত্যাদি বিশ্লিষ্ট হয় অথবা তাতে পচন ধরে। পচনকারীদের মধ্যে রয়েছে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, পোকামাকড়, শামুক, শুঁককীট ইত্যাদি। উদ্ভিদ সেই পচা পদার্থগুলোকে আবার পুষ্টি উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে।

যেকোনো প্রতিবেশে ভোক্তার চেয়ে উৎপাদকের সংখ্যা বেশি হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোক্তার চেয়ে বেশি থাকে প্রাথমিক পর্যায়ের এবং তৃতীয় পর্যায়ের ভোক্তার চেয়ে বেশি থাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোক্তা।  প্রতিটি পর্যায়ে খাদ্য শক্তি কমে যাওয়া এর অন্যতম কারণ।

প্রতিটি স্তরে এ শক্তি কমে যাওয়ার পরিমাণ শতকরা হার বিভিন্ন হতে পারে। আবার মাংসাশীদের তুলনায় তৃণভোজীদের সংখ্যা কমে গেলে তৈরি হয় খাদ্যসঙ্কট এবং তাতে খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারায় মাংসাশী প্রাণীরা। সংখ্যার দিক থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের বিপরীতে ভোক্তাদের সাজালে তা তৈরি করে একটি পিরামিড। 

প্রতিবেশে জীবজগতের আশ্চর্য গ্রন্থিবন্ধন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় পরস্পর নির্ভরশীল জীবনব্যবস্থাকে। এ ব্যবস্থায় কেবল মানুষই পারে জীব ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্ক বদলে দিতে। মানুষের লাগামহীন জীবনব্যবস্থার দরুণ পরিবেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জগতের চরম ক্ষতি করে চলেছে। ফলে প্রতিবেশে মারাত্মক বিঘœ দেখা দিয়েছে। এতে মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্য বিরাট হুমকির মুখে। এখন মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, পরিমিত ভোগব্যবস্থার দ্বারা জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক জীবনচক্র রাখবে কী রাখবে না। অতি ভোগের ফলে জীবচক্রের ধ্বংস নেমে আসবে এবং সাথে সাথে এ সুন্দর গ্রহটি (পৃথিবী) ধ্বংস হবে এবং মানুষ নামের অতি বুদ্ধিমান প্রাণীটি দুনিয়া থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমাদের এটি অনুধাবন করতে হবে।

-লেখক : পানিবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ