বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

পুরানো ভুলে নতুন বার্তা

মানুষতো সমাজবদ্ধ হয়েছিল মহান লক্ষ্যে। ভালোবাসা ও সহযোগিতার চেতনায় জীবনযাপনকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মানুষ সমাজ গড়েছিল। কিন্তু সেই সমাজের আজ এ কী হাল হয়েছে! ঘৃণা ও বিদ্বেষের কারণে অনেক সমাজে এখন মানুষের বসবাস অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বর্ণবাদী ও ধর্মীয় ঘৃণা সমাজে ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করে রেখেছে। পূর্ব লন্ডনের মুসলিম বাসিন্দারা এসিড হামলার শিকার হওয়ার পর নিজেদের বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। আর এই ভয়টা বেড়েছে গত ২১ জুন পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যাম শহরের রাস্তায় গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে ভয়ঙ্কর এসিড হামলার পর থেকে। এই হামলায় ২১ বছর বয়সী প্রথম সারির মডেল রেহমা খান ও তার চাচাতো ভাই জামিল মুক্তার গুরুতর আহত হন। প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলেছিল, আক্রমণটি বর্ণবাদী বা ধর্মীয় ঘৃণা থেকে করা হয়েছে এমন কোনো  প্রমাণ নেই। তবে আহত মুক্তার জোর দিয়ে বলেছেন, ইসলাম ভীতি থেকেই এই হামলা করা হয়েছে। তাছাড়া ফেসবুক পেজে জন টমলি (২৪) নামে এক ব্যক্তির উগ্র ডানপন্থীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের বিষয়টি দেখতে পেয়ে পুলিশ ঘটনাটিকে ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। পুলিশ এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে খুঁজছে।

এসিড হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মুসলিম ও এশিয়ান চেহারা লক্ষ্য করে এই ধরনের হামলা বেশি হচ্ছে বলে জানান অনেকে। ২২ জুন বৃহস্পতিবার টাওয়ার হ্যামলেটসের সামনে বাণিজ্যিক রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসার সময় এক এশীয়র ওপর হামলা হয়। হামলাকারীরা তার গাড়িটিও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া ইস্টহামে এক মহিলা তার বাসার সামনে এক ব্যক্তি দ্বারা আক্রান্ত হন। ওই ব্যক্তি জিনিসপত্র সরবরাহকারীর বেশ ধারণ করেছিল। আর প্লাসেথ গ্রোভ এলাকায় গাড়ি চালানোর সময় এসিড হামলার শিকার হয়েছেন এক মহিলা। এইসব ঘটনায় উপলব্ধি করা যায়, লন্ডনে সন্ত্রাসবাদের ঘটনা বেড়েই চলেছে। আর এই সব ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে বর্ণ ও ধর্ম বিদ্বেষীয় সাদা চামড়ার লোকেরাই। ফলে উপলব্ধি করা যায়, সন্ত্রাস কোনো বিশেষ ধর্ম বা বর্ণের মানুষের একচ্ছত্র বিষয় নয়, ভ্রান্ত চিন্তার ধারক হলে যে কোনো মানুষই জড়িয়ে পড়তে পারে সন্ত্রাসের ঘটনায়। এইসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত ২৫ জুন রোববার সন্ধ্যায় এক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছিল পূর্ব লন্ডনে। এতে টাওয়ার হ্যামলেটের মেয়র জন বিগসও উপস্থিত ছিলেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিবেশিত খবরে বলা হয়, বৈঠকে স্থানীয়রা বলেন, এইসব আক্রমণ আমাদের দোরগোড়ায় ঘটছে। ফলে আমাদের নারী-পুরুষ ও শিশুরা অনিরাপদ অনুভব করছেন। তারা এখন বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় একজন ইমাম শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, রাস্তায় ডাকাতির মত হঠাৎ এসিড হামলা হচ্ছে। এসব ঘটনার পর আমার স্ত্রীও এসিড হামলার ভয়ে বাইরে যাচ্ছেন না। প্রশ্ন জাগে, এমন পরিস্থিতির জন্য কি মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছে? মানুষতো সমাজবদ্ধ হয়েছে সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পরিবেশে বসবাস করার জন্য। পূর্ব লন্ডনে তেমন পরিবেশ সৃষ্টির দায় বর্তেছে কর্তৃপক্ষের ওপর, ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে নাগরিকদেরও। দায়িত্ব কতটা পালিত হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

পূর্ব-লন্ডনের ঘটনাতো সাম্প্রতিক, কিন্তু বহু পুরানো ফিলিস্তিন সংকটের তো কোনো সমাধান হলো না। বরং সংকট বাড়ছেই। ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের কথা শুনেছি সেই কৈশোরে। পরে জেনেছি সংকটের কারণ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ ও ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কারণে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান আজও হলো না। ভূমিপুত্র ফিলিস্তিনীদের রাষ্ট্র হলো না, অথচ উড়ে এসে জুড়ে বসে ইহুদীরা শুধু রাষ্ট্রই পেল না, ইসরাইল গঠন করে ওই অঞ্চলে তারা জুলুম-নির্যাতনের পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছে নির্মম আগ্রাসন। ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান এবং ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জাতিসংঘসহ বড় বড় শক্তির অনেক আশ্বাস বাণী শুনেছি। শুনতে শুনতে কৈশোর পেরিয়ে আমরা প্রবীণ হয়েছি কিন্তু সংকটের আর সমাধান হলো না। দীর্ঘমেয়াদী এখন নির্মম ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসনের দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ এই পৃথিবীতে নেই। তারপরও কি বলতে হবে, সভ্য পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি?

দীর্ঘকালের ইসরাইলী আগ্রাসনে আর দমন-পীড়নে পিষ্ট ফিলিস্তিনী জনতার প্রতি সংহতি জানাতে একাত্ম হয়েছে বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত ৩০টিরও বেশি দেশের তরুণ-প্রজন্ম। ৮ জুলাই তুরস্কের বাণিজ্যিক রাজধানী ইস্তাম্বুলে জড়ো হয়েছেন ওইসব দেশের তরুণ প্রজন্ম। নিজেদের ভূমির সুরক্ষায় ফিলিস্তিনী জনগণ যে প্রতিরোধ সংগ্রাম জারি রেখেছে, তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই দুইদিনের এক সম্মেলনে জমায়েত হয়েছেন তারা। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মুক্তিকামী ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতার দাবিকে বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম নাগরিকের মনে জিইয়ে রাখতেই এই সমাবেশ। সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশী তরুণরাও। ৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সম্মেলনটির আয়োজক তুরস্কভিত্তিক আনাদোলু ইয়ুথ এসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব ইয়ুথ এন্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন টু সাপোর্ট প্যালেস্টাইন। উদ্বোধনী ভাষণে আনাদোলু ইয়ুথ এসোসিয়েশনের প্রধান সালিহ তুরান বলেন, ‘ফিলিস্তিন, আল-কুদ্স (জেরুজালেম) এবং আল-আক্সা মসজিদকে আলোচ্যসূচির শীর্ষে রেখে আমরা দ্বিতীয়বারের মত এ সম্মেলনের আয়োজন করেছি। গোটা মুসলিম বিশ্বের তরুণ, যাদের ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি একই রকমের অনুভূতি রয়েছে তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করছি আমরা। ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব ইয়ুথ এন্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়নস টু সাপোর্ট প্যালেস্টাইন-এর প্রধান ইহাব নাফি বলেন, মুসলিম বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে ফিলিস্তিনী দাবিগুলোকে জিইয়ে রাখতে আমরা সম্মিলিত হয়েছি। বিশ্বের কাছে একটি বার্তা আমরা পৌঁছে দিতে চাই। বার্তাটি হলো- আমাদের দৈনন্দিন এজেন্ডা থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে সরিয়ে দেয়া যাবে না। আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণ ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার খর্ব হতে দেবে না।

ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকারের প্রতি সংহতি জানাতে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর তরুণ-প্রজন্মের নেতারা যে উপলব্ধি ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, আমরা তার প্রতি সমর্থন জানাই। কারণ এতটুকুন না করলে মুসলিম থাকা যায় না, মানুষও থাকা যায় না। তরুণ প্রজন্মের ওই সম্মেলন আসলে এ কথারই জানান দিল যে, প্রহসন ও চাতুর্যপূর্ণ বর্তমান সভ্যতায় এখনো ন্যায়ের চেতনায় উদ্দীপ্ত মানুষ জীবিত রয়েছে। তারা মজলুম মানুষের পক্ষে অবশ্যই দাঁড়াবে। আমরা তাদের চেতনাকে স্বাগত জানাই এবং কামনা করি সাফল্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ