শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

বন্যা পরিস্থিতি এবং ফটো সেশন  

‘উজান’ তথা ভারত থেকে নেমে আসা পানির ঢলে বিগত কয়েকদিনে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ভারত গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জসহ বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে নদ-নদীর পানি শুধু বিপদসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে না, তীরের বিরামহীন ভাঙনে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার লাখ লাখ মানুষও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। রান্নাবান্না করে খাওয়া দূরে থাকুক তারা এমনকি বাড়িতেও থাকতে পারছে না। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পাশাপাশি ধলেশ্বরী, করতোয়া, ধরলা ও তিস্তাসহ সব নদ-নদীতে পানি শুধু বাড়ছেই। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারিয়াকান্দি ও ধুনট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদ সীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে  প্রবাহিত হচ্ছিল। একই অবস্থা চলছে তিস্তা তীরবর্তী ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে। সেখানে তিস্তার পানি বিপদ সীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার বেড়ে ৬৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রামের চিলমারিসহ অন্য সকল এলাকাতেও পানি কেবল বেড়েই চলেছে। তিস্তা ও ধরলা থেকে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রসহ প্রতিটি নদ-নদী এরই মধ্যে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ফলে বহু কিলোমিটার জুড়ে তীর তো ভেঙে পড়ছেই, আশপাশের সকল গ্রামও তলিয়ে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় ভেঙে গেছে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে দেয়া বালুর বাঁধ। বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা কৃত্রিম সব বাঁধও প্রবল ¯্রােতে ভেসে গেছে। 

পাল্লা দিয়ে বিপদ বেড়ে চলেছে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া লাখ লাখ মানুষের। সরকারের দিক থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিতে পারছে না তার। বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে যথেষ্ট সংখ্যক উঁচু স্থান বা স্থাপনাও নেই, যেখানে গিয়ে বিপন্ন মানুষেরা আশ্রয় নিতে পারে। ফলে সাপসহ হিং¯্র প্রাণীর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পানির মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা চলছে খাদ্য ও সুপেয় পানির। কারণ বন্যায় চুলো জ্বালিয়ে রান্নাবানা করা একেবারেই সম্ভব নয়। তার ওপর রয়েছে চাল-ডালসহ খাদ্য সামগ্রীর তীব্র সংকট। মুড়ি আর চিড়ার মতো শুকনো খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও কেনার মতো সাধ্য নেই প্রায় কোনো মানুষেরই। তা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য না পাওয়ায় চিড়া-মুড়ি ও ঝোলা গুড়ের মতো সামান্য কিছু খাবার খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছে বন্যাকবলিতরা। ওদিকে রয়েছে নিরাপদ পানীয় পানির তীব্র অভাব। কুয়া, নলকূপ ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানি পাওয়া ও পান করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বন্যার পানিই পান করতে হচ্ছে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী বিভিন্ন্ রোগ। এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। তাদের অনেকে মারাও যাচ্ছে। কারণ, হাজার বিপদেও কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না তারা। হাসপাতাল দূরের কথা, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। বহু লাশের দাফনও করা যাচ্ছে না। 

এ ধরনের অনেক মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে দেশের পত্রপত্রিকায়, দেখানো হচ্ছে বেসরকারি টেলিভিশনে। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও সরকারকে এখনো কোনো ব্যবস্থা নিতে বা তৎপর হতে দেখা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দলের এমপিসহ বড় বড় নেতারা ব্যস্ত রয়েছেন তাদের ফটো সেশন নিয়ে। আগামী সংসদ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বিশেষ কিছু কিছু এলাকায় তারা নামকাওয়াস্তে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছেন। কিন্তু বিপন্ন মানুষের হাতে তুলে দেয়ার পরিবর্তে তারা ক্যামেরায় ছবি ওঠানোর ব্যাপারেই বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছেন। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, এসব ছবি তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করছেন, যাতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে পড়তে পারেন। ওদিকে ফটো সেশনের জন্য এমপি এবং বড় নেতাদের দেখা মিললেও ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপজেলা পরিষদের ‘নির্বাচিত’ জনপ্রতিনিধিদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ দেশের অন্তত ২৫/৩০টি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে রয়েছে। সেই সাথে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন অনেক এলাকাও। লাখ লাখ বিপন্ন মানুষ অপেক্ষায় আছে সামান্য কিছু ত্রাণ পাওয়ার আশায়। তাদের জীবন লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। কোনোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বন্যাদুর্গতদের ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে এ পর্যন্ত কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা ব্যস্ত রয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিত্যনতুন মামলায় ফাঁসিয়ে হেনস্থা করতে। চলমান ভয়ংকর বন্যার মধ্যেও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করার এবং মামলা দিয়ে ধাওয়ার মুখে রাখার ব্যাপারে তারা সমান তালে এগিয়ে চলেছেন। ত্রাণ বিতরণের নামে ফটো সেশনের ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে থাকছেন না। বিষয়টিকে বন্যা দুর্গত মানুষের সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। 

আমরা মনে করি, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর এবং ফটো সেশন করে বেড়ানোর পরিবর্তে এখন জরুরিভাবে দরকার বন্যায় বিপন্ন হয়ে পড়াদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী ও সুপেয় পানি পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি দরকার নিরাপদ আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, যাতে আর কোনো মানুষের অসহায় মৃত্যু না ঘটে। যাতে একজন মানুষকেও অনাহারে কাটাতে না হয়। তাছাড়া, এই সময়ের বিপর্যয় কেবলই প্রকৃতির কারণে ঘটেছে নাকি এর পেছনে ‘উজানে’ অবস্থিত বন্ধুরাষ্ট্রের‘অবদান’ রয়েছে সে বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা এবং জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক পন্থায় পদক্ষেপ নেয়াও দরকার। কারণ, ‘ভাটির দেশ’ বলে বন্যার পানিতে বাংলাদেশকেই শুধু তলিয়ে যেতে হবে এবং ফারাক্কা ও গজলডোবাসহ বিভিন্ন বাঁধের কারণে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশ পানিবঞ্চিত থাকবে, ন্যায্য হিস্যা পাবে নাÑ এমন অবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে না। এজন্য সরকারের উচিত অবিলম্বে ভারতের সঙ্গে বাঁধ ও পানির ব্যাপারে মীমাংসা করা, ভারত কূটনৈতিক পন্থায় সম্মত না হলে আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ উত্থাপন করা। কেবলই বন্ধুরাষ্ট্রের স্বার্থে ভূমিকা পালন করার পরিবর্তে দেশপ্রেমিকদের দাবির ভিত্তিতে সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ