মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

 আইএফসি’র মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ  ছাড়তে চায় নাইকো 

কামাল উদ্দিন সুমন: বাংলাদেশ ছাড়তে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) মধ্যস্থতা চায় কানাডীয়  তেল-গ্যাস  কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেড। সব সম্পত্তি পেট্রোবাংলার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চায় তারা। তবে পেট্রোবাংলা বলছে, নাইকোর সঙ্গে চলমান মামলা নিষ্পত্তির আগে এ নিয়ে কোনো পক্ষের মধ্যস্থতার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, এর আগেও বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিল নাইকো। তখন পেট্রোবাংলা বাঁধা দেয়ায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে এবার সব সম্পত্তি পেট্রোবাংলার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চায় তারা। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রাপ্য অর্থ বুঝে পাওয়া নিয়ে সংশয় থেকেই মধ্যস্থতার জন্য আইএফসির দ্বারস্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আর পুরো বিষয়টি সহজতর করার জন্য তদবির করছে ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশন। সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় আইএফসির যুক্ত হওয়া নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে কানাডীয় হাইকমিশন। বিষয়টি পরিষ্কার হতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে বৈঠক করতে চান ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশনার বেনওয়া পিয়ের লাঘামে।

সূত্র জানায়, আইএফসির মধ্যস্থতার বিষয়টি নিয়ে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশনার। এক্ষেত্রে হাইকমিশনারকে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন উপদেষ্টা। এর পর গত মাসের শেষ দিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রদুতদের সঙ্গে সরকারের এক বৈঠকের ফাঁকে নাইকোর প্রস্তাবটির বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে অবহিত করেন কানাডীয় হাইকমিশনার।

সম্পত্তি হস্তান্তর মধ্যস্থতার জন্য নাইকো আইএফসির ভূমিকা চায় বলে স্বীকার করেছেন আইএফসির কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল) উইন্ডি জো ওয়ারনার। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশে জ্বালানি সম্পদের টেকসই ও দায়িত্বপূর্ণ উন্নয়নে সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুত আইএফসি। নাইকো আইএফসির গ্রাহক হলেও চলমান আন্তর্জাতিক সালিশী মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো ধরনের সহায়তা করবে না আইএফসি। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও এতে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ বিষয়টির সমাধান ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় আইএফসিকে যুক্ত করতে নানা প্রচেষ্টা চালালেও এখনো এ বিষয়ে পেট্রোবাংলাকে লিখিতভাবে কিছু জানায়নি নাইকো। তবে বিভিন্ন বৈঠকে মৌখিকভাবে বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে নাইকোর এক কর্মকর্তা নাম  প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেহেতু পেট্রোবাংলা সম্পত্তি নিতে আগ্রহী, ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় তেমন জটিলতা নেই। তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পেট্রোবাংলা দীর্ঘ সময় তাদের অর্থ আটকে রাখবে কিনা, তা নিয়ে ভয় পাচ্ছে নাইকো। কারণ বেশকিছু হিসাব নিয়ে এখনো নাইকো ও পেট্রোবাংলার মধ্যে সমঝোতা হয়নি। সেসব হিসাব সংশ্লিষ্ট অর্থ পেট্রোবাংলা কেটে রেখে দেবে কিনা, তা নিয়েও ভয়ে আছে নাইকো। আর এমন ভয় বা সংশয় থেকেই মধ্যস্থতায় আইএফসিকে যুক্ত করতে চায় তারা।

তিনি বলেন, নাইকো চাইছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পুরো বিষয়টিতে মধ্যস্থতা করুক আইএফসি। কিন্তু এক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা চাইছে, দেশীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে। এখন যে বিষয়টি দেখতে হবে, তা হলো আইএফসির মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা রয়েছে কিনা। আর এ বিষয়ে আলোচনা করতে ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশনার আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে চাচ্ছেন।

এদিকে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, নাইকো নিয়ে মামলা চলছে। এখন শুধু রায়ের অপেক্ষা। এমন অবস্থায় অন্য কোনো পক্ষের মধ্যস্থতার বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ নয়। এ রকম কোনো মধ্যস্থতার আর কোনো আইনি সুযোগ বা ভিত্তি নেই। যদিওবা সুযোগ থাকে, তা বিদ্যমান ইস্যু নিয়ে আদালতের রায় কার্যকরের পরে। ক্ষতিপূরণ দাবির মীমাংসাও হতে হবে আদালতের মাধ্যমে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো বিষয়ে আইএফসির সঙ্গে সমঝোতার প্রসঙ্গ আসতে পারে।

সূত্র জানায়,২০০৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে সঙ্গে নিয়ে ফেনী ও ছাতকে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের দায়িত্ব পায় নাইকো। এ দুই গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর ৮০ শতাংশ এবং বাপেক্সের ২০ শতাংশ মালিকানা ছিল। দায়িত্ব নেয়ার পর ফেনীতে সফলভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু করে নাইকো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির অবহেলা ও অদক্ষতার কারণে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং পরিবেশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পদের ক্ষতি হয়। এ নিয়ে ২০০৮ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ সরকার। মামলায় গ্যাস এবং স্থানীয়দের সম্পদ ধ্বংস হওয়ায় ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৯৭৩ টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়।

 টেংরাটিলার দুর্ঘটনার পর ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে নাইকোর সরবরাহ করা গ্যাসের দাম পরিশোধ করা বন্ধ করে দেয় সরকার। পরবর্তীতে এ বিষয়ে নাইকো মামলা করলে মামলার রায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে যায়। রায় অনুযায়ী নাইকোকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাসের দাম বাবদ ১২ শতাংশ সুদসহ ১২৭ দশমিক ৩১৭ মিলিয়ন ডলার পাওনা দিয়ে দিতে হবে।

জানা গেছে, বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রের অংশ বিক্রি করে বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল নাইকো। তবে পেট্রোবাংলা নাইকোর ওই অংশ বিক্রি করতে দেয়নি। উতপাদন-বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো প্রতিষ্ঠান তাদের অংশ অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারে। শুধু পেট্রোবাংলার অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু নাইকোর সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয় থাকায় সে অনুমোদন দেয়া হয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ