শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত ॥ ত্রাণের অভাব

ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে

সংগ্রাম ডেস্ক : উজানের পাহাড়ি ঢল ও অভিরাম বর্ষণের ফলে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন বন্যা কবলিতরা। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে ভাঙন। বন্যার পানি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ায় তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাওয়ায় মানুষ বাঁধে ও বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয় নিলেও খাবার বিশুদ্ধ পানি ও ত্রাণের চরম সঙ্কট বিরাজ করছে। বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
বগুড়া অফিস : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি সকালে এক সেন্টিমিটার কমলেও দুপুরের পর থেকে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। সন্ধ্যা ৬টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়াটার রিডার আবু জাফর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইতোমধ্যেই ভারত থেকে আসা পাহাড়ী ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাড়ীঘর ছেড়ে লোকজন বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। একসাথে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাঁধে আশ্রয় নেওয়ায় দূর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সারিয়াকান্দি ছাড়া অন্য দুটি উপজেলায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু না হওয়ায় খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটছে দূর্গত মানুষের। বন্যার পানি প্রবেশ করায় কমপক্ষে ৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
বগুড়া জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহারুল ইসলাম মোহাম্মদ আবু হেনা জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সারিয়াকান্দি উপজেলায় ত্রান হিসেবে নগদ এক লাখ টাকা রোববার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে আবদুস সামাদ : গতকাল সোমবার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বর্ষনে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাঁধ অভ্যন্তরে এবং চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় ৩০ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যেই নদী তীরবর্তীসহ চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় উঠতি ফসল ডুবে গেছে। কোন কোন চরের নীচু এলাকার বাড়ি-ঘরে পানি উঠেছে বলে জানা গেছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বন্যার পানি প্রবেশ করায় যমুনার তীরবর্তী কাজিপুর, শাহজাদপুর, চৌহালী, বেলকুচি ও সদর উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ি এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ২০০৭ সালে ভেঙে যাওয়ার পর তা আর সংস্কার না করায় ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢুকে রাণীগ্রাম, গুনেরগাঁতী, ও খোকশাবাড়ী এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। এসব এলাকার বন্যা কবলিত মানুষ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। বিপাকে পড়েছেন গবাদি পশু নিয়ে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, গত কয়েকাদন যাবৎ যমুনা নদীর পানি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বিপদসীমার ৩০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বক্ষ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের শুভগাছা ইউনিয়নের টুটুলের মোড় পয়েন্ট কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে বালির বস্তা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এছাড়া, বাধের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য টাংগাইলের ঘাটাইল সেনানীবাসের একটি প্রকৌশলী দল শনিবার বাধ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। যেকোন ধরনের জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি উল্লে¬খ করেন।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা : ফুলছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ চরাঞ্চল বেষ্টিত ৪৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বন্যার পানি উঠায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
এছাডাও নতুন করে এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের ১৩০টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙনের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বিকেল ৫টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় ফুলছড়ি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি না পেলেও এখনও বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এরেন্ডাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান জানান, কয়েকদিনের ভাঙনে এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের জিগাবাড়ী, পশ্চিম জিগাবাড়ী, হরিচন্ডি, পাগলারচর এলাকায় নদী ভাঙনের কারণে ১৩০টি পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। হুমকির মূখে রয়েছে জিগাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জিগাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়, এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ও জিগাবাড়ী কমিউনিটি ক্লিনিক। তিনি বলেন, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এখনও সরকারি কোন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয় নাই।
ফুলছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসার হেমায়েত আলী শাহ্ জানান, ব্রহ্মপুত্র নদী বেষ্টিত ৪৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বন্যার পানি প্রবেশ করায় এসব বিদ্যালয় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও বিদ্যালয়ের কক্ষে পানি উঠায় ঝানঝাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গলনা কমিউনিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কটকগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য শুক্রবার থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ত্রাণ মন্ত্রনালয় থেকে ২লাখ টাকা ও ১শ’টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
কাউখালী পিরোজপুর সংবাদাতা : কাউখালী উপজেলার সন্ধ্যা নদীর ত্রিমুখী ভাঙনের মুখে পড়েছে আমরাজুড়ী ইউনিয়নের স্বরূপকাঠী-কাউখালী সড়ক সংযোগকারী ফেরিঘাট। বাজারের কমপক্ষে ৩০/৩৫টি বিভিন্ন প্রকারের দোকান গ্রাস করছে রাক্ষুসে নদী সন্ধ্যা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আরো অনেক দোকান, বাড়িঘর, মসজিদসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাবার পথে। এ পর্যন্ত নদী ভাঙনের কারণে বহু বার ফেরিঘাট স্থানান্তর করতে হয়েছে। এই ফেরিঘাট থেকে পিরোজপুর থেকে গড়িয়ার পাড় হয়ে বরিশাল-ঢাকা-বানারিপাড়া-নেছারাবাদ-কাউখালী-পিরোজপুর-বাগেরহাটসহ খুলনা যাতায়াত করে। এলাকার ব্যবসায়ী শাহ জামাল সহ ক্ষতিগ্রস্তরা জানান তিন নদীর মোহনায় আমরাজুড়ী ফেরিঘাট হওয়ায় এ ভাঙনের মুখে পড়ছে এলকাবাসী। অবিলম্বে যদি বেরিবাঁধ না করা হয় তাহলে আমরাজুড়ী ইউনিয়নের বিরাট একটি অংশসহ কাউখালী-শেখেরহাট সংযোগ সড়কটি বিলীন হয়ে যাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), সূত্রে জানা গেছে গত ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সন্ধ্যা নদীর ভাঙ্গন রোধে কাউখালী বন্দর রক্ষা প্রকল্প নামে ২২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এ ব্যাপারে আমরাজুড়ী ইউপি চেয়ারম্যান সামসুদ্দোহা চান জানান, ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়া হলে বাজার ও ফেরিঘাট রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
মো. লাভলু শেখ, লালমনিরহাট থেকে : ভারতের গজল ডোবা ব্যারেজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। নদী গুলোর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকা গুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে আবারও নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করে। হাতীবান্ধা উপজেলার উওর ধুবনী গ্রামে গতকাল সোমবার সকালে ১টি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে সোমবার সকালে বিপদ সীমার ৩৮ সে.মি. উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ড দোয়ানী’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে পানি আসায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে তিস্তার তীরবর্তী এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। আমরা প্রতি মুহুর্তে¡ বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করছি। তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আরও কি পরিমাণ পানি আসবে তা ধারনা করা যাচ্ছে না। তিস্তা পাড়ের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগের বন্যায় চর এলাকা গুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে গেছে। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। ওই উপজেলার উওর ধুবনী গ্রামে বাধঁ ভেঙ্গে গেছে। যে কারণে ওই এলাকায় বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী লোকজনের মাঝে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। প্রচ- গতিতে ময়লা ও ঘোলা পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। পানির গতি নিয়ন্ত্রন করতে তিস্তা ব্যারাজের সব গুলো গেট খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে তিস্তার পানিতে পাটগ্রামে অবস্থিত বহুল আলোচিত সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহল আঙ্গোরপোতা-দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিঙ্গিমারী, সির্ন্দুনা, পাটিকাপাড়া ও ডাউয়াবাড়ী ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, শোলমারী, জমিরবাড়ী, বইরাতী, আদিতমারী উপজেলার কুঠিপাড়া, গোবর্দ্ধধন ও মহিশখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছা, রাজপুর, গোকুন্ডা এলাকার চরের ১৮ পরিবারসহ মোট ৫০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার একর আমন ধানের বীজ তলাসহ অনেক ফসলী ক্ষেত তিস্তার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিন ধুবনী গ্রামের শামসুল হক, শরীফ মোল্লা, আব্দুস ছালাম, আবুল কাশেম, নুরল হকসহ অনেক পানিবন্দী পরিবার অভিযোগ করেন, আমরা ২ দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় আছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোন ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। কেউ আমাদের খোঁজ পর্যন্ত করেনি। হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু জানান, তার ইউনিয়নের উওর ধুবনী গ্রামে ১টি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে ফলে বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলোর তালিকা তৈরী করছেন। ইতোমধ্যে ত্রাণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছেন। হাতীবান্ধা উপজেলার সির্ন্দুনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরল আমিন জানান, তার ইউনিয়নে ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলোর তালিকা তৈরীর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা স্বপন জানান, প্রচণ্ড গতিতে ময়লা ও ঘোলা পানি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের দিকে ধেয়ে আসছে। লোকালয়ে পানি প্রচণ্ড গতিতে প্রবেশ করছে। ইতিমধ্যে ওই ইউনিয়নের ৬/৭ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিনি পানিবন্দী পারিবারগুলোর সহযোগিতার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দাবী জানান। হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফেরদৌস আহম্মেদ জানান, ইতোমধ্যে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দী পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরি করে উচ্চ পর্যায়ে প্রেরণ করা হবে। ত্রাণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খাঁন জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দী পরিবারগুলো খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ত্রাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করা হয়েছে।
নীলফামারী সংবাদদাতা : উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ী ঢল আর ভারি বর্ষণে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টের তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধির ফলে নদী বেষ্ঠিত নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছয়টি ও জলঢাকা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ১০ সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি স্লুইচ গেট খুলে রাখা হয়েছে। প্লাবিত এলাকা গুলো হচ্ছে ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছচাপানী, টেপাখড়িবাড়ী. খালিশাচাপানী, পুর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি এবং জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি, গোলমুন্ডা শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামের ১০ শহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ সব গ্রামের মানুষজন হাঁটুপানির নিচে বসবাস করছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। এসব গ্রামের অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে উচুঁ ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানান তারা।
পুর্বছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পুর্বছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়শিংহেরস্বর চর ও পুর্বছাতনাই গ্রামের সাড়ে পাঁচ শতাধিক পরিবারের দেড় সহস্রাধীক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের বাড়িতে হাটু পানির নিচে বসবাস করছে । ওইসব গ্রামের আমন বীজতলা গুলো তলিয়ে গেছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন জানান, রবিবার রাত থেকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এতে করে পূর্ব খড়িবাড়ী, চড় খড়িবাড়ী ও ভাসানীর চর গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিখন জানান তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে তার ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। তার গ্রামের অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে বলে তিনি জানান।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান উজানে ঢলে তিস্তা পানি ররিবার মধ্য রাত থেকে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
উলিপুরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত ও
নদী ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা : গত কয়েকদিনে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের উলিপুরে বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। ধরলা, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ২ সেঃমিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদ-নদীর তীরবর্তী স্থানগুলোতে ব্যপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে চর-দ্বীপচর ও নি¤œাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার পরিবার।
উপজেলার নদ-নদী কবলিত বেগমগঞ্জ, বুড়াবুড়ি, হাতিয়, সাহেবের আলগা, দলদলিয়া, থেতরাই, বজরা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া, কবিরাজ পাড়া, মসালের চর, শেক পালানু, পূর্ব দূর্গাপুর, চিতুলিয়া, নামাজের চর, চর বাগুয়া, গেন্দার আলগা, কাজিয়ারচর, ঘুঘু মারি, কলাকাটা, সাতভিটা, ফকির মোহাম্মদসহ বিচ্ছিন্ন চর-দ্বীপচর ও নি¤œাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম পনি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেঝে, গত ২৪ ঘন্টায় ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ২৬.০৪ সেন্টিমিটার, তিস্তা নদীর পানি কাউনিয় পয়েন্টে ২৮.৮২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদ সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৪.০২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অঞ্চলের প্রায় ৪শ’ হেক্টার জমির গ্রীস্মকালীন ফসল পটল, ঢেঁড়শ, করলা, ঝিঙা, মরিচ, চেচিংগাসহ সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এ সকল উঠতি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছে দরিদ্র কৃষকেরা। আরপদিকে বিভিন্ন স্থানে নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক দিনের ভাঙ্গনে হাতিয়া নয়াডাড়া গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভিটেমাটি হাড়িয়েছে। বর্তমান ভাঙনের মুখে পড়েছে উপজেলার পুরাতন অনন্তপুর বাজার, গুজিমাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। ভাঙ্গন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি শীঘ্রই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলসহ চরাঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে জীবন যাপন করছে। এসব এলাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে পড়েছেন বন্যাকবলিতরা। বানভাসীদের হাতে কাজ না থাকায় খাদ্য সংকটে পড়লেও এখনো কোন সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। বন্যা কবলিত এলাকাগুলো কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় একমাত্র নৌকা দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন মানুষজন। হাতিয়া ইউনিয়নের চর অনন্তপুর গ্রামের আব্দুর রহমান, নজর আলী, ইসলাম মিয়া, আজাহার আলীসহ অনেকেই জানান, ঘরের ভিতর থেকে পানি নেমে না যাওয়ায় কেউ চৌকি আবার কেউ বাঁশের মাচানের উপর পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছি। এ অবস্থায় ঘরে খাবার ও হাতে কাজ না থাকায় দুঃচিন্তায় পড়েছেন। সরকারিভাবে কোন সাহায্য করছে না। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাঁচার উপায় থাকবে না তাদের। উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের রাবেয়া বেগম জানান, গরু, ছাগল, হাস, মুরগী নিয়ে বিপদে রয়েছি। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। ঠিক মতো রান্নাও করতে পারছি না। ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন জানান, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আমার ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার পরিবার পানিবন্দী মানুষ জীবন যাপন করছে। উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে গেলেও এখনও কোন ত্রান সহায়তা পাওয়া যায়নি। এদিকে বন্যার্তদের জন্য ত্রান সহায়তা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি প্রবেশ করলেও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। আশা করছি দ্রুত পানি নেমে যাবে। আর বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মেডিকেল টিমসহ আমাদের সব রকমের প্রস্তুতি নেয়া আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ