শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

শাসক দলে এত খুনোখুনি কেন?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : ঘরের আগুনে পুড়ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এটা বুঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালেই দেখা যাবে খুনোখুনির নির্মমতার চিত্র। ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খুনের মতো জঘন্যতম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে দলটির নেতা-কর্মীরা। আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও অন্তর্দলীয় কোন্দলে আওয়ামী লীগের রক্ত আওয়ামী লীগই ভক্ষণ করছে। ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ যে মোস্ট আনফিট এটা প্রমাণিত। আওয়ামী লীগ এর অবস্থা হলো সেই স্ত্রীলোকটির মত যে তার সতীনের ছেলেটিকে অত্যাধিক আদর করতো। অর্থাৎ সেই স্ত্রী লোকটির দুইটি ছেলে ছিল। একটি নিজের ছেলে অপরটি সতীনের ছেলে। সে সতীনের ছেলেটিকে সব সময় কোলে রাখতো। উঠতে-বসতে, চলতে ফিরতে ছেলেটিকে সব সময় কোল থেকে নামাতো না। এমনকি কোলেকাঁধে নিয়েই সংসারের কাজ-কাম করতো। পাড়ায় বেড়াতে গেলে সতীনের ছেলেটিকে কোলে এবং নিজের ছেলেটিকে হাত ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতো। পাড়ার মেয়েরা সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। সবাই বলতে লাগলো, ‘মেয়েটির মনে একটুও হিংসা নাই। সতীনের ছেলেকে কোলে আর নিজের ছেলেকে হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়ায়। সতীনের ছেলেকে এত আদর করতে আর কোথাও দেখা যায় না। এরূপ সতী-সাধ্বী নারী আর হয় না। কিন্তু একদিন পাড়ার একটি মেয়েলোক এসে গোপনে সহানুভূতি স্বরূপ বললো, ‘আপা! নিজের ছেলেকে অবহেলা করে সতীনের ছেলেকে এত আদর করা ঠিক হবে না। তাতে নিজেরই ক্ষতি হবে। মেয়েলোকটি বলল, না বুবু’ এটা আমার ছেলের প্রতি অবহেলা নয়। নিজের ছেলেকে হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়াই যেন তার পা শক্ত হয় এবং স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে মজবুত হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সতীনের ছেলেকে কোলে নিয়ে বেড়াই যেন সে কোন দিন হাঁটতে না শেখে। কোলে থাকতে থাকতে অচল এবং পঙ্গু হয়ে কোনদিন সে সমাজে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এটা সতীনের ছেলের প্রতি আদর নয়। কিন্তু মানুষ বুঝতে না পেরে আমার প্রশংসা করছে তা আমি কি করবো? ঠিক সেইরূপ আওয়ামী লীগের উন্নয়ন আর আইনের শাসন। যে কারণে  আওয়ামী লীগের হাতে আওয়ামী লীগ খুন হচ্ছে। এই বিষয়টি ক্ষমতাসীনদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছাড়াও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অন্তর্দলীয় কোন্দলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের  শক্র এখন আওয়ামী লীগই। তাদের আন্তঃকোন্দলের কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সাংবাদিকও নিরাপদ নন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে শাসক দলের নেতা-নেত্রীরা তাদের সহযোগী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। কিছুতেই থামছে না মাঠ পর্যায়ের মারামারি, খুনোখুনি, সংঘাত সহিংসতা ও সংঘর্ষ। যে খুন করে কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করে, সে যদি শত্রু বলে বিবেচিত হয়, তাহলে বলা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শত্রু এখন আওয়ামী লীগ নিজেই।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও বেসরকারি সংস্থার সূত্র মতে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে গত ৮ বছরে তিন শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের উপর নির্যাতের স্টীম রোলার প্রয়োগ করার পরও হিংস্রতার খায়েশ থামেনি, যে কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মাঠে না থাকায় নিজেরা খুন হচ্ছে নিজেদের গুলিতে। অন্যদিকে যারা অপরাধ করছে তাদের বদ্ধমূল ধারণা এসব অপরাধ করলেও কিছু হবে না। কারণ  অবৈধভাবে যারা ক্ষমতা দখল করেন আর যারা পাতানো নির্বাচনে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল গ্রহণ করেন তারা কখনও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্রসহ সাধারণ মানুষের হেনস্থা হবার বিষয়টি নতুন নয়। অনেক দিন থেকেই ঘটছে। এত কিছু ঘটার পর এবং ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দেয়ার পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন তো হয়নি উল্টো সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়েই চলছে। শাসক লীগের একজন মেয়র কতটা আস্কারা পেলে গুলি করে সাংবাদিক মেরে ফেলতে পারেন সেটা বোধকরি কাউকে ব্যাখ্যা করে বুঝানোর দরকার নেই। তবে এটাও ঠিক আজ আমার কাল তোমার। সাপের খেলা যারা দেখান তাঁরা নাকি ঐ সাপের কামড়ে নিহত হন। দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার কোনো পরিবেশ না থাকার কারণে সর্বত্র অশান্তির আগুন বিরাজ করছে। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে ক্ষমতাসীন দলে শৃঙ্খলা বিধান করা না গেলে হয়তো সামনের অবস্থা আরো ভয়াবহরূপ ধারণ করতে পারে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে গত ৮ বছরে সারা দেশে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে হানাহানিতে শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়েছে, আহত হয়েছে হাজারো নেতাকর্মী সমর্থকসহ নিরীহ মানুষ। প্রাণ দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকেও। যার সর্বশেষ নজির সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সমকালের সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনা। এখানে উদ্বেগের বিষয় হলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর গুলিতে মারা যান সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল। দলীয় খুনোখুনির বীজ আওয়ামী লীগই এদেশে প্রথম বপন করেছে। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হল থেকে ৭ জন ছাত্রকে ধরে এনে মহসিন হলের মাঠে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতরা ছাত্রলীগেরই সদস্য ছিল। ’৭৪ পরবর্তী থেকে অদ্যাবধি খুনোখুনির ইতিহাস লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। তারপরেও নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তুলে ধরা প্রয়োজন। ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহালের দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুপক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ২২ জন আহত হন। ১৬ জানুয়ারি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইউম হোসনকে কুপিয়ে জখম করেন দলীয় সদস্যরা। চলতি বছরের প্রথম দিনই সংবাদের শিরোনাম হয় খুলনা আওয়ামী লীগ। খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশা সম্পাদক জেড এ মাহমুদকে লক্ষ্য করে গুলি করে তাঁর প্রতিপক্ষ। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন পথচারী এক নারী। গত ২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে পাবনার ঈশ্বরদীতে যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। এতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুজন কর্মী গুলীবিদ্ধ এবং আরো দুজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি রাতে খুন হন নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়। ১১ ফেব্রুয়ারি চট্রগ্রাম নগরীর রেয়াজউদ্দিন বাজারে একটি হোটেলে ভাত খাওয়ার সময় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী ইয়াছিন আরাফাত। গত ১৩ মাসে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫ বার সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় খুন হয় তিনজন। আহত হয় অন্তত ৬৫ জন। তার আগে ২৯ মার্চ চট্রগ্রামে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয় আরেক ছাত্রলীগ নেতা নাসিম আহমেদ। গত বছরের জুলাইয়ে খুলনা ও কুমিল্লায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে পৃথক তিনটি ঘটনায় ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী খুন হন। ২ এপ্রিল ২০১৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতা সায়াদ ইবনে মোমতাজকে পিটিয়ে খুন করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে দেশে ১৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ৮৩ জন। আর ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে প্রাণহানি হয়েছে ১৫৩ জনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের মধ্যে সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। আগের বছর ২০১৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন। আওয়ামী লীগের ওইসব নেতাকর্মী বেশির ভাগই নিহত হয়েছেন নিজেদের দ্বন্দ্বে। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে দিনদুপুরে অপহরণের পর খুন হন সাতজন। বর্বরোচিত ওই হত্যাকান্ডের শিকার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সবাই আওয়ামী লীগ ঘরনার। টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এ খুনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন স্থানীয় এমপি আমানুর রহমান রানাসহ তার তিন ভাই। ২০১৫ সালের এপ্রিলে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সংগঠনের দুই নেতা খুন হন। ফেনীতে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে খুন হন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামূল হক একরাম। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান প্রতিপক্ষ দল বিএনপির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৩টি, নিহত হয়েছেন ১জন আহত ১৯০ জন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি নিহত হয়েছেন ১৭ জন, আহত ১ হাজার ৫২ জন। ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ,আওয়ামী লীগ বনাম ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি, খুন হয়েছেন ৪ জন, আহত হয়েছেন ২০৬ জন। ক্ষমতাসীন দল ও তার অনুগামী সংগঠনগুলোর নেতা কর্মীদের মধ্যে যাঁরা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন,তাঁরা দৃশ্যত আইনের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। নইলে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধারালো অস্ত্রপাতি নিয়ে তাঁরা পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী কেন পদক্ষেপ নেয় না? পুলিশের সামনেই তাঁদের আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ছবি অনেকবার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের ২৭ অক্টোবর গুলিস্তান পাতাল মার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের সময় হকারদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনার সময় দুই ছাত্রলীগ নেতাকে রিভলবার উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। আইনের শাসনের প্রতি ক্ষমতাসীন লীগ সরকারের এমন অবজ্ঞা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়! খুনোখুনির রাজনীতি এখনই বন্ধ করা দরকার। লীগ সরকার নিজের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে কেন তার মাশুল গুণতে হবে? আশা করি ক্ষমতাসীন মহল বিষয়টি উপলব্ধি করে দলীয় খুনাখোনির পথ বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ