শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

সুশাসন অশিক্ষা ও জঙ্গিবাদ

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : সুশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Good governance’. যার অর্থ- নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকরী শাসন। সুশাসনের অন্যতম শর্ত- শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা। যে শাসন ব্যবস্থায় নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে এবং তার বিনিময়ে নাগরিকগণ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য পোষণ করবেন। সুশাসন বলতে এমনটাই বুঝানো হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক করনী’র মতে, ‘সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে শাসিত জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়’। রাষ্ট্রের ৩টি অঙ্গের মাধ্যমে দেশের সুশাসন নিশ্চিত করে। আর রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো হচ্ছে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। মূলত রাষ্ট্রের এই তিনটি অঙ্গ একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু কারো ওপর কারো প্রাধান্য বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। এর ব্যত্যয় ঘটলেই সুশাসনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আর এমনটিই হয়েছে আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি কখন কীভাবে হয়েছিল সে সম্পর্কে ইতিহাসে অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিককালে নৃতত্ত্ব, প্রত্মতত্ত্ব ও সমাজ বিজ্ঞানের গবেষণার ফলে রাষ্ট্রের উৎপত্তির ঐতিহাসিক ধারা মোটামোটি অনুমান করা সম্ভব হয়। ঐতিহাসিক মতবাদ বা বিবর্তনবাদের আলোচনার পূর্বে কতকগুলো মতবাদ রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোকপাত করেছে। তাই এ বিষয়ে একটি নাতিদীর্ঘ ধারণা দেয়া যেতে পারে। যা বিষয়টি উপলব্ধিতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে বলে মনে হয়।
রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্টি এ মতবাদটা প্রাচীন। এই মতবাদের মূল কথা হলো, সৃষ্টিকর্তা রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছেন। জীবজন্তু, পশুপাখি, তৃণগুল্ম সবকিছুই বিশ্বপিতা তার সীমাহীন অনুকম্পায় সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাষ্ট্রকে সৃষ্টি করে তার প্রতিনিধির হাতে রাষ্ট্রের শাসনভার ন্যস্ত করেন। সুতরাং শাসনকর্তা বা রাষ্ট্রপ্রধান সৃষ্টিকর্তার নিকট তার কাজকর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দায়ী থাকেন। প্রজা-পরিষদবর্গ রাষ্ট্রপ্রধানকে বিধাতার প্রতিনিধি হিসাবে মান্য করতেন। রাষ্ট্র প্রধানকে অম্যান্য করা জঘন্য অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। কেননা, তাকে অমান্য করার অর্থ সৃষ্টিকর্তার বিধান লঙ্ঘন করা। এ মতবাদ থেকে অবশ্য শাসকবর্গ বা রাজাদের ‘বিধাতা প্রদত্ত ক্ষমতা’ মতবাদের (Theory of Divine Rights) জন্ম হয়েছিল।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে ‘সামাজিক চুক্তিবাদ’ (Social Contract Theory) আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অধিক সমাদৃত। এটির মূল কথা হলো, রাষ্ট্র বিধাতা সৃষ্টি করেননি বরং এটি দেশের জনসাধারণের সুশৃঙ্খল ও সুসংহত রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার পর এক ধরনের চুক্তির ফলেই রাষ্ট্রের ব্যুৎপত্তি ঘটেছে। রাজনৈতিক সংগঠনের পূর্বে যখন রাষ্ট্রে প্রাকৃতিক নিয়মকানুন প্রচলিত ছিল এবং মানবিক কোনো আইনশৃঙ্খলায় সামাজিক জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েনি, তখন জনসাধারণ বিভিন্ন সমস্যায় পতিত হয়ে রাষ্ট্রীয় সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে রাষ্ট্রের জন্মদান করে।
যাহোক রাষ্ট্র সৃষ্টির ধারণা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও সুুশাসনের তাগিদ থেকেই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার ব্যুৎপত্তি একথা জোর দিয়েই বলা যায়। প্রাগৈতিহাসিককালে মানুষের কোনো সংঘবদ্ধ জীবনযাত্রা ছিল না। ফলে মানুষ সংঘ স্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করে। ফলে কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে ক্রমরূপান্তরিত হতে হতে রাষ্ট্র নামক সংঘের সৃষ্টি হয়েছে। আর দীর্ঘ ঘাত-সংঘাত ও পথপরিক্রমার মাধ্যমে তা আধুনিক রাষ্ট্রে রূপ নিয়েছে। এর সুফলও মানুষ পেয়েছে কিন্তু তা মোটেই নির্বিঘ্ন হয়নি।
নির্বিঘ্ন হয়নি এজন্যই বলছি যে, নাগরিকরা আধুনিক রাষ্ট্রের কাছে আনুগত্যের বিপরীতে যে ধরনের সেবা আশা করে বা যে ধরনের সেবা পাওয়া কাঙ্খিত তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। রাষ্ট্র যাতে সুচারুরূপে পরিচালিত হয়ে সুশাসন নিশ্চত করা যায় সে জন্য রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। আর রাজনীতি কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নয় বরং তা একটি সেবামূলক কাজ। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তির পৌণপৌণিক ব্যর্থতার কারণেই সুশাসনের বিষয়টি আজও অনেকটাই অধরা। যা আমাদের জাতিস্বত্ত্বাকে হীনবল করে দিয়েছে।
উপর্যুপরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও সুশাসনের অভাবেই সমাজ-রাষ্ট্রে সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সমস্যা। সুশাসনের কথা বলে ও প্রত্যাশায় বারবার ক্ষমতার পালাবদল হলেও তা এখনও গণমানুষের করায়ত্বে আসেনি। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচারবিভাগ যথাযথাভাবে কার্য সম্পাদনও করেনি বা করতে পারছে না। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবটাও বেশ তীব্র। আর মূল সমস্যাটা তো এখানেই।
এ কথার প্রমাণ মেলে মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বক্তব্য থেকে। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, দেশে আইনের শাসন নেই। তিনি আরও বলেছেন, রাষ্ট্রের দু’টি অঙ্গ ব্যর্থ হলে বিচার বিভাগ বসে থাকতে পারে না। তিনি তার বক্তব্যে যে দেশের আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। মাননীয় প্রধান বিচারপতির এমন বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত হয় যে, দেশে তো আইনের শাসন নেই বরং রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে সার্বিকভাবে বা পরিকল্পিতভাবে ব্যর্থ করা হচ্ছে। ফলে সুশাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার একটা সম্যক প্রেক্ষাপটও তৈরি হচ্ছে। সুশাসনের অনুপস্থিতিরই কারণেই নাগরিকরা যেমন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, ঠিক তেমনিভাবে নাগরিকের হতাশা ও অপ্রাপ্তি থেকে জন্ম নিচ্ছে নানাবিধ অপরাধ প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা। আর আপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে বা দমনে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণেই ক্রমবর্ধমান হারে তা বেড়েই চলেছে। তা কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের শাসন বিভাগে একটা অচলাবস্থা ও সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শাসন বিভাগের কার্যাবলীও ঠিকমত পরিচালিত হচ্ছে না। আর শাসন বিভাগ ক্রিয়াশীল না থাকায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সুশাসনের ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গার্নারের মতে, শাসন বিভাগের কার্যাবলী মোটামোটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত : (এক) অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা বিষয়ক (Administrative), (দুই) পররাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈদেশিক সম্বন্ধ (Diplomatic), (তিন) সামরিক ব্যবস্থা (Military) (চার) বিচার বিষয়ক ক্ষমতা (Judicial) ও (পাঁচ) আইন বিষয়ক ক্ষমতা (Lagislative).
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শাসন বিভাগের উপবিভাগগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে না বা করতে দেয়া হচ্ছে না। মূলত শাসন বিভাগকে ক্রিয়াশীল ও গতিশীল রাখার দায়িত্ব শাসকগোষ্ঠীর। আর ব্যর্থতার দায়ভারও বর্তায় তাদের ওপরেই। এ ক্ষেত্রে বোধ হয় তারা খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছে না। এর কারণই হচ্ছে রাজনীতিকে আত্মকেন্দ্রীকীকরণ। কারণ, আমাদের দেশের রাজনীতি এখনও গণমুখী হয়ে ওঠেনি। আমাদের দেশের রাজনীতি দেশ ও জাতির কল্যাণের ঘুর্ণাবর্তে আবর্তিত হচ্ছে না বরং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই সবকিছুর হিসাব-নিকাশ চলছে এবং আগামী দিনে তা অব্যাহত থাকবে এমনটাই মনে হচ্ছে। দেশে সুশাসনের অভাবেই জনগণের জানমাল এখন নিরাপত্তাহীন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে অবক্ষয় ও অনৈতিকতা। মূল্যবোধের অভাবটাও আমাদের মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বস্তুত, রাজনীতি যখন স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হয়ে যায় তখন মূল্যবোধের চর্চাটা হয়ে পড়ে খুবই ভঙ্গুর। আর অশিক্ষাও-কুশিক্ষা দানাবেঁধে ওঠে সেই সমাজে।
আসলে শাসন বিভাগের উপ-বিভাগগুলো যেভাবে কার্য সম্পাদন করার কথা সেভাবে করছে না বা করতে দেয়া হচ্ছে না। দেশের প্রশাসনযন্ত্র এখন জনগণের কল্যাণে কাজ না করে শ্রেণি বিশেষের আজ্ঞাবাহী হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগটা বেশ জোড়ালো। ফলে জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই বরং মহল বিশেষকে আনুকুল্য দেয়াকে তাদের দায়িত্ব ও ধ্যান-জ্ঞান মনে করছে। তাই ব্যাহত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা। ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও নেবিবাচক ও ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণেই তা উপেক্ষিত হচ্ছে। আর সে কারণেই দেশের পররাষ্ট্রনীতিও একদেশদর্শী হয়ে পড়েছে। একবিংশ শতাব্দী বিশ্বায়নের শতাব্দী হলেও পররাষ্ট্রনীতি ও কুটনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই পশ্চাদপদ। ফলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শুধু পিছিয়েই নয় বরং আমরা প্রতিযোগিতায় আছি বলে মনে হয় না।
কোনো রাষ্ট্র যখন অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয় এবং পররাষ্ট্রীয় বিষয়েও পশ্চাদপদ হয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রের অন্যান্য উপ-বিভাগগুলোও ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পরে। এক সময় তা মৃতপ্রায় হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকে। ফলে সকল ক্ষেত্রেই একটা হতাশার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। দেশের সামরিক বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগেও অচলাস্থার সৃষ্টি হয়। আমাদের ক্ষেত্রেও তেমনটিই হয়েছে বলে মনে হয়। সঙ্গত কারণেই দেশের শাসন বিভাগের উপবিভাগগুলোও ক্রিয়াশীল থাকছে না। দেশের সামরিক তথা প্রতিরক্ষা বিভাগ যেমন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ পাচ্ছে না, ঠিক তেমনিভাবে বিচারবিভাগ ও আইনবিভাগে চলছে সীমাহীন অস্থিরতা। এক বিভাগ আরেক বিভাগকে আজ্ঞাবাহী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এক অশুভ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেছে। ফলে যা হবার তা-ই হচ্ছে। আর এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা আমাদের জন্য মোটেই সুখকর হবে বলে মনে হয় না।
মূলত উপর্যুপরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে এবং সুশাসনের অভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নানাবিধ উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকায় নাগরিকরা বিভিন্ন ক্ষেত্রেই অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতিও আমাদের জাতীয় জীবনের মহাসর্বনাশ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। রাষ্ট্র যখন মানুষের অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না তখনই মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ে কদর্য ও অনৈতিক পন্থা অবলম্বনে কুন্ঠাবোধ করছে না। জনজীবনে হতাশা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সামাজিক অপরাধ ও নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। আর এসব যে সুশাসনের অভাবেই হচ্ছে তা অস্বীকার করা যায় কী করে?
সুশাসন ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতিই এবং অশিক্ষার করালগ্রাসেই দেশে জঙ্গিবাদ উত্থানের একটা মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছে বলেই মনে করছে অভিজ্ঞ মহল। অধিকার বঞ্চিত ও নানাভাবে প্রতারিত মানুষ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের বিকল্প পথ খুঁজছে। আর গণমানুষের হতাশা ও অপ্রাপ্তিকে কাজে লাগাচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কুচক্রী মহল। এই অশুভ শক্তি মানুষের ধর্মানুভূতিকে উস্কে দিয়ে একশ্রেণির তরুণদের সহজেই বিপথগামী করতে সক্ষম হচ্ছে। আর ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব ও সরল বিশ্বাসের কারণেই এসব উঠতি বসয়ী তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে জানা যায়, যারা জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত হচ্ছেন তারা ধর্ম বা ইসলাম সম্পর্কে কোনো যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না বরং ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক ধারাণাটাও তাদের অস্বচ্ছ। শুধুমাত্র খ-িত ধারণার ভিত্তিতে আবেগতাড়িত হয়েই তারা জঙ্গিবাদের প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। অথচ মূলধারার কোনো ইসলামী ব্যক্তিত্ব বা শক্তি এসবকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না। মূলত ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাবেই ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী উম্মাদনা চলছে। আর সরকার দমনের নামে যা করছে তা জঙ্গিবাদ দমনে মোটেই সহায়ক হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ, জঙ্গিবাদ দমনের চেয়ে ক্ষমতাসীনদের কাছে ক্ষমতা, রাজনৈতিক অভিপ্রায় এবং ফায়দা হাসিলই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই থেকে যাচ্ছে।
দেশে জঙ্গিবাদী সমস্যা আগের তুলনায় বেড়েছে একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এজন্য আমরা অশিক্ষা ও ধর্ম সম্পর্কে অস্বচ্ছ ধারণাকে প্রধানত দায়ী করলেও এর অন্তর্নিহীত অন্য কারণও বিদ্যমান। জঙ্গিবাদের ইস্যুতে অশিক্ষাকে এজন্য দায়ী করা হচ্ছে যে, মূলত জঙ্গিবাদ ইস্যুটা ধর্মাশ্রয়ী। যা করা হয় তা ধর্মের নামেই। যাকে সমালোচকরা ইসলামী জঙ্গিবাদ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার এজন্য ধর্মকে দায়ী করেই পুলকবোধ করেন। কিন্তু একথা মনে রাখা দরকার যে, হাতুড়ে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার দায়ভার কখনো চিকিৎসাশাস্ত্র বহন করে না বা কেউ এজন্য চিকিৎসাশাস্ত্রকে দায়ীও করে না।
 মূলত আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিশ্বে একটি উদার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। ধর্মপ্রীতি এদেশের মানুষের চিরায়ত ঐতিহ্য। তাই আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধবংস ও বিতর্কিত করার জন্যই দেশী-বিদেশী চক্র জঙ্গিবাদকে উস্কে দিচ্ছে বলেই মনে হয়। ফলে বিপথগামী হচ্ছে দেশের একশ্রেণির তরুণ-তরুণি। আর জঙ্গিবাদ ইস্যুকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনরাও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।
মূলত আমাদের দেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা শুরু ১৯৯৯ সালে। আর সরকার ও প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই এর ডালপালাও গজিয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত জঙ্গি সংক্রান্ত ঘটনায় মামলার সংখ্যা ৮৫১টি। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ জন। এসব মামলার মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে ১১৯টি। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬১৯টি।
জঙ্গি সংক্রান্ত ঘটনায় সর্বাধিক মামলা হয়েছে ডিএমপিতে ৩৪১টি, আসামীর সংখ্যা ৮০৬ জন। ঢাকা রেঞ্জ মামলার সংখ্যা ১০টি, আসামী ৩১১ জন। রাজশাহী রেঞ্জে মামলা ১০১টি, আসামী ৩৬৭ জন। সিআইডির মামলার সংখ্যা ১৬টি, আসামী ১৪২ জন। সিএমপি মামলার সংখ্যা ৪৪টি, আসামী ২৩৬ জন। কেএমপি মামলার সংখ্যা ৩টি, আসামী ২৮ জন। আরএমপি মামলার সংখ্যা ৭টি, আসামী ৪৫ জন। বিএমপি মামলা ১৪, গ্রেফতার ১৭৬ জন। চট্টগ্রাম রেঞ্জ মামলা ৪৭, আসামী ২৩৪ জন। খুলনা রেঞ্জ মামলা ৪২, আসামী ১৮৬ জন। বরিশাল রেঞ্জ মামলা ১২, আসামী ৭২ জন। সিলেট রেঞ্জ মামলা ১৮, আসামী ৭১ জন। রংপুর রেঞ্জ মামলা ৩১, আসামী ২১৫ জন। রেলওয়ে রেঞ্জ মামলা ৭, আসামী ১৭ জন। ময়মনসিংহ মামলা ৪৪, আসামী ১৬৫ জন।
উপরের পরিসংখ্যান থেকে আমাদের দেশে জঙ্গি তৎপরতার ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়। তাই এসব অপতৎপরতাকে কোনো আত্মসচেতন মানুষই সমর্থন করতে পারে না বরং যেকোনো মূল্যে এসব দেশ ও জাতিস্বত্বা বিরোধী অপতৎপরতা নির্মূলের পক্ষে দেশের সকল শ্রেণির মানুষ। তাই সরকারের জঙ্গিবিরোধী সকল তৎপরতায় জনগণ সরকারের সাথেই রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের জঙ্গিদমন নিয়ে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহল থেকেই। প্রশ্ন উঠেছে জঙ্গি দমনের পদ্ধতি নিয়েও। কিন্তু সরকার নাগরিকদের এমন প্রতিক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না বরং প্রশ্নকারীদের জঙ্গিবাদের প্রতিভূ হিসেবে আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে। যা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়। সরকারের যেকোনো কাজে প্রশ্ন সৃষ্টি হলেও বা কোনো বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় দেখা দিলে তা অপনোদনের দায়িত্বও সরকারের। তাই সঙ্গত কারণেই সরকারের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে যেসব প্রশ্ন উঠছে সে বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে এবং জঙ্গিদমন ইস্যুতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। জঙ্গিদমন ইস্যুতে যেনো নিরাপরাধ মানুষ ভিকটিম না হন সেদিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি।
জঙ্গিবাদের উত্থানের কারণ নানাবিধ। তবে সুশাসনের অনুপস্থিতি ও অশিক্ষা এজন্য কম দায়ী নয়। রাষ্ট্র যেমন সকল প্রকার অপরাধ প্রবণতার প্রতিবিধান করবে ঠিক তেমনিভাবে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, মত ও পথ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র কোনোভাবেই দায়সারা বা দায়িত্বহীন কাজ করতে পারে না। তাই জঙ্গি দমনসহ যেকোনো ইস্যুতে রাষ্ট্রকে অতি সন্তর্পণে অগ্রসর হতে হবে। এসব বিষয়ে যেসব প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছে সেসবের অপনোদন করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। জঙ্গিবাদীদের চিহ্নিত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব ঠিক তেমনিভাবে এর পৃষ্ঠপোষক ও প্রতিভূদের সনাক্ত করা জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা মহল বিশেষকে জড়ানো মোটেই সঙ্গত নয়।
এমনকি এজন্য কোনো প্রকার তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে ঢালাওভাবে দায়ী করাও যুক্তিযুক্ত মনে হয় না। তাই জঙ্গিবাদসহ যেকোনো জাতীয় ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টি করতে হবে। এ বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টিরও কোনো বিকল্প নেই। মূলত সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারলেই জঙ্গিবাদসহ সকল প্রকার চরমপন্থা সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল। জনগণ সরকারের কাছে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
smmjoy@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ