বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ : ভারতীয় শিবিরে হতাশা

আজহার মাহমুদ : হাড়কাঁপুনী শীতে যখন আফগানবাসী হবুজবু ঠিক তখন শীতের পরেই নতুন বছরের নতুন প্রত্যাশায় অধীর অপেক্ষার পালা। বিগত শীতে আফগানদের জীবনে অনেক পরিবর্তন ছিল লক্ষণীয়। এইসব পরিবর্তন আফগান ও পশ্চিম এশিয়ার জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে বাধ্য। গত ডিসেম্বরে আফগান প্রশ্নে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে পাকিস্তান ও চীনের অংশগ্রহণ বিরাট তাৎপর্য বহন করে। তিনটি দেশই আফগানিস্তানে আইএস’র উপস্থিতিতে শংকিত। ভবিষ্যৎ আলোচনায় আফগান সরকারকে যুক্ত করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করা হয়। ইতিমধ্যে ডুর‌্যান্ড লাইনের উভয় পাশে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে যার ফলে নিরীহ বেসামরিক লোকজন নিহত হয়। এর ফলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দোষারোপ ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় উভয়ের বিরুদ্ধে পারস্পরিক সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে ব্যস্ত থেকে। ডুর‌্যান্ড লাইনের দুই পাশে রক্তপাতের উপকারভোগী হলো মূলত ভারত। পাকিস্তানী নেতারা যখন পানামা পেপারস নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে বাদানুবাদ নিয়ে ব্যস্ত তখন ভারত আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে ব্যস্ত। আফগানিস্তানে মার্কিন তপ্লীবাহক সরকারের অধীনে বিদ্রোহী তালেবানদের চাপে ড. আশরাফ ঘানির সরকার পর্যুদস্ত অবস্থায় এক প্রকার অসহায় অবস্থায়। আফগানিস্তানে দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং বেপরোয়া দুর্নীতি সমগ্র শাসনব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। আফগান সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ও প্রেসিডেন্ট ঘানি ও প্রধান নির্বাহী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কোন্দলে জর্জরিত আফগান প্রশাসন তালেবান বিদ্রোহীদের প্রচণ্ড চাপে এক প্রকার অসহায়। মার্কিনীরা বহু দেনদরবার করে যে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করে দিয়েছিল তা শুধুমাত্র নামেই বিরাজমান। বাস্তবপক্ষে নর্দার্ন এ্যালায়েন্স ও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের ক্ষমতার দুর্গ পুশতুনদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই মাত্র। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে উভয় বলয় নিষ্ঠুর ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আশরাফ ঘানির সাথে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সমঝোতা সরকারের সাথে ক্ষমতাশালী পুশতুন সম্প্রদায়কে সঙ্গে পাওয়ার প্রয়াস মাত্র। এর ফলে আশরাফ ঘানি সরকারের ক্ষমতা কিছুটা হলেও সংহত হতে পারে।
ভারত একটি ঐকমত্য আফগানিস্তানের পরিবর্তে আফগানিস্তানকে নিয়ে নোংরা খেলায় মেতে থাকে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তান বিরোধী ও পুশতুন বিরোধী গোষ্ঠীকে মদদ দেয় ভারত। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর শীর্ষ কমান্ডার কুলভূষণ যাদব সম্প্রতি পাকিস্তানের হাতে আটক হয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। ডুল্যান্ড লাইনের উভয় পাশে এবং পাক-ইরান সীমান্তে একটি সন্ত্রাসী আস্তানা গড়ে তোলাই ভারতের উদ্দেশ্য বলে কুলভূষণ যাদব প্রকাশ করেন। আফগানিস্তানের ন্যাশনাল সার্ভিসে (NDS) অনুপ্রবেশ করে ‘র’ এর সন্ত্রাসীরা কাজ করছে। ভারতীয় কূটনীতিকরা আফগানিস্তানের প্রশাসনে ঢুকে চানক্য কায়দায় আফগান প্রশাসনকে বুঝাতে চায় পাকিস্তানই আফগানিস্তানের আসল শত্রু। আফগান সুশীল সমাজকেও একইভাবে বোঝায় ভারতীয় চানক্য গোষ্ঠী।
ক্ষমতার বলয় এবং নিরাপত্তা বিভাগে ঘুষসহ নানা প্রলোভনে উদ্বুদ্ধ করে পাকিস্তানের মাটিতে আগ্রাসন চালাতে সন্ত্রাসী তৈরি ও পাঠাচ্ছে। এভাবে আশরাফ ঘানির সরকারের সাবোটেজের আয়োজনে পাক-আফগান সম্পর্কে বাধার সৃষ্টি করে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল আইএসকে আফগানিস্তানে এনে ডুর‌্যাল্ড লাইনের দুই পাশে রক্তপাত ঘটিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় বিকল্প সন্ত্রাসী সংগঠন সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। আইএস আফগানিস্তানে ঘাঁটি গাড়তে না পেরে পাকিস্তান বিদ্বেষী টিটিপিকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ডুর‌্যান্ড লাইনের দু’পাশে পাকিস্তান বিদ্বেষী গ্রুপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং দু’ভ্রাতৃপ্রতীম দেশের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা কেবল ভারতের অবদান। পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘র’ বিভিন্ন কৌশলে কাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশন ও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক এমনকি আন্তর্জাতিক বৈঠককে ‘র’ তাদের পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত ‘র’ এর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠন করা ‘র’ এর প্রতিনিধি সংগঠন যেমন টিটিপি ও আইএস’র পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো। সম্প্রতি আমিরাত দূতাবাসে হামলা তারই প্রমাণ। ভারতীয় ও আফগান মিডিয়াকে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফায়দা লাভ। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও ভারতকে শান্তির আস্তানা হিসেবে সকল আন্তর্জাতিক সেমিনার-কনফারেন্সকে ব্যবহার করা। গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, পাক-আফগান সীমান্তে সন্ত্রাসী হামলা ঘটেই চলছে। পাক-আফগান সরকার কেন নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করতে পারছে না, নেপথ্য কারণ কী? ‘র’ এর এই নোংরা খেলা কেন দুই ভ্রাতৃপ্রতীম রাষ্ট্র বোঝার চেষ্টা করে না! ইসলামাবাদ ও কাবুলের উচিত আত্মসমালোচনা ও আত্মোপলব্ধি করা। এ ব্যাপারে কাবুল ও ইসলামাবাদের সুশীল সমাজের এগিয়ে আসা উচিত। দুই ভাতৃপ্রতীম দেশের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবসানে সুশীল সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে।
আফগানিস্তানকে বলা হয় ‘হার্ট অফ এশিয়া’। অতীতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থে আফগানিস্তানে বছরের পর বছর রক্ত ঝরেছে। যদিও ইন্দিরা-ডকট্রিনের মাধ্যমে ভারত বরাবরই আফগানিস্তানকে তার আঞ্চলিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসের আস্তানা বানাতে ভারত তৎপর। আফগানিস্তানে ভারতীয় নীলনকশা প্রতিহত করতে হলে কৌশলী ও দক্ষ হাতে মোকাবিলা করতে হবে। দক্ষ কূটনীতি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে ইন্দো-আফগান নেকসাস ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে হবে।
‘র’ এর অপারেশন ইনচার্জ ড. সুবাস কপিলার সাম্প্রতিক উক্তির মধ্যদিয়ে ভারতীয় শিবিরের হতাশা ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখ্য, সাউথ এশিয়ান এ্যানালাইসিস গ্রুপের তিন উদ্যোক্তা ‘আফগানিস্তানকে চীন-পাকিস্তান-রাশিয়া ট্রয়কার হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না’ শীর্ষক এক নিবন্ধে আফগানিস্তান প্রশ্নে রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের ভূমিকাকে জঞ্জাল বলে আখ্যায়িত করে আফগানকে জঞ্জালমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ড. কপিলা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মার্কিন রাডার থেকে আফগানিস্তান মুছে গেছে বলে মনে হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আফগানিস্তান মার্কিন রাজনীতিতে আর আলোচনার বিষয় নয়। ২০১৭ সালের শুরুতেই নির্বাচনী ডামাডোলের ভিতর মার্কিন উদাসীনতার সুযোগ নিচ্ছে পাকিস্তান-রাশিয়া-চীন ট্রয়কা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। দীর্ঘ দিনের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পাকিস্তানের দ্বৈত ভূমিকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত শত সৈন্য হারাতে হয়েছে আফগানিস্তানে। ২০১৭ সালে মার্কিন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় যেন পাকিস্তান-চীন-রাশিয়া ট্রয়কার কাছে হেরে যেতে না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।” নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিতে আফগানিস্তান যেন হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে ড. কপিলা যুক্তরাষ্ট্রকে পরামর্শ দেন। তিনি আরও পরামর্শ দেন পাকিস্তান-চীন-রাশিয়া ট্রয়কা আপাতদৃষ্টিতে নিঃস্বার্থ সহযোগিতার ছদ্মাবরণে যেন আফগানিস্তানে নতুনভাবে কোন সামরিক সমস্যার সৃষ্টি না করে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সতর্ক থাকতে হবে এই কারণে যে, চীন-রাশিয়া-পাকিস্তান ট্রয়কার কারণে যেন যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যেতে না হয়। চীনের নতুন নীতি-কৌশল হলো যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যেতে বাধ্য করা যেন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
ড. কপিলার বক্তব্যে আফগানিস্তান প্রশ্নে ভারতের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ড. কপিলারা আশা করেন রক্তস্নাত আফগানিস্তানে ‘র’ এর নোংরা খেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধান ভূমিকা পালন করুক। কৌতূহলের বিষয় হলো ট্রাম্প-পুতিন সংলাপে বিশ্বের সকল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান দু’জনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আশার কথা এই যে, ইতিহাস প্রমাণ করেছে আফগানিস্তানে সকল সময়ে হতাশার উপরই আশার জন্ম হয়েছে। ভারত যতই হতাশা প্রকাশ করুক না কেন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ভ্রাতৃপ্রতীম মুসলিম দেশ পাকিস্তান বরাবরই আফগান ভাইদের পাশে আছে এবং থাকবে। আফগান রাজনীতির যারা দর্শক এবং পৃষ্ঠপোষক তাদের উপলব্ধি হওয়া উচিত যে, ভারত আফগানদের প্রকৃত বন্ধু নয়। নোংরা খেলা বহু খেলা হয়েছে, আর নয়। পাকিস্তানের উচিত আফগান রাজনীতি, প্রশাসন, সুশীল সমাজ তথা সকল ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়া। আফগানিস্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচনে এগিয়ে আসা। পাকিস্তান আফগানিস্তানে এক বা একাধিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে দিতে পারে। এটি হবে আফগান ভাইদের জন্য পাকিস্তানের সর্বোত্তম ও স্থায়ী পুরস্কার। আফগান মিডিয়া ও বিনোদন কর্মে পাকিস্তান সাহায্য করতে পারে। প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান এগিয়ে আসতে পারে। মার্কিন প্ররোচনায় আফগানিস্তান ভারতের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে এই বাস্তব অভিযোগের পাশাপাশি পাকিস্তানের উচিত আফগান রাষ্ট্রীয় ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে পাকিস্তানের মিশে যাওয়া। আফগান মুসলিম ভাইদের পাশে পাকিস্তানের মুসলিম ভাইদের দাঁড়ানো একান্তই নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
ভারতীয় চানক্যদের নীলনকশা ব্যর্থ করে আফগানিস্তানে সুস্থ রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই হবে আফগানিস্তানে একবিংশ শতাব্দীতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। পাক-আফগান দুই ভাই হাতে হাত ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান সংহত করাই একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অবদান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ