বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

২০১৬ সালের ভারত

ভারতের ২০১৬ সাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে নোট বাতিলের কারণে। এছাড়াও ঘটনাপ্রবাহের শীর্ষে ছিল সন্ত্রাসী হামলা, কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ‘সার্জিক্যাল স্টাইক, সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত, ছাত্র বিক্ষোভ ইত্যাদি।
সন্ত্রাসী হামলা দিয়ে শুরু
দেখতে দেখতে কেটে গেল ২০১৬ সাল। বছরটা শুরু হয়েছিল ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলা, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এবং ছাত্র বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। জানুয়ারি মাসের শুরুতেই পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে হানা দেয় কথিত জঙ্গিরা। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গুলী বিনিময়ে নিহত হয় ছজন জঙ্গির সবাই। আর সেইসঙ্গে নিহত হন তিনজন ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী। সন্দেহ, হামলার পেছনে ছিল পাকিস্তানের জয়স-ই-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজারা জঙ্গিরা পুলিশের একটি গাড়ি ছিনতাই করে ভারতীয় সেনার পোশাকে পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে ঢোকার চেষ্টা করেছিল।
ছাত্র বিক্ষোভ, দাঙ্গা, ভাঙচুর
দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বামপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের ডাকা এক সভায় দেশবিরোধিতার কিছু ঘটনার অভিযোগে পুলিশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কানাইয়া কুমারসহ কিছু ছাত্র নেতাকে গ্রেফতার করে। সরকারের অভিযোগ ঐ সভায় সংসদে সন্ত্রাসী হামলার প্রধান অপরাধী আফজল গুরুর ফাঁসির প্রতিবাদ করে তাঁকে শহিদের সম্মান দেয়া হয়। এরপর হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত গবেষক-ছাত্র রোহিত ভেমুলারের আত্মহত্যার ঘটনায় দেশ জুড়ে শুরু হয় ছাত্র বিক্ষোভ। অভিযোগ, জাতপাতের ভিত্তিতে রোহিতের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করায় সে আত্মহত্যা করেছিল। উত্তরবঙ্গের মালদা জেলার কালিয়াচকে মৌলবাদী হিন্দু মহাসভা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে অবমাননাকর কিছু মন্তব্য করেছেÑ এই অভিযোগে হাজার হাজার মুসলিম পথে নামে। প্রতিবাদ মিছিল সহিংস হয়ে ওঠায় আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শুরু হয় সংঘর্ষ। ক্রুদ্ধ জনতা পুলিশ থানা, বিডিও অফিস ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে। পরবর্তী পাঁচ মাসে ঘটে আরও ২৭৮টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসেবে এইসব দাঙ্গায় প্রাণ হারায় ৩৮ জন এবং জখম হয় প্রায় ৯০০ মানুষ।
অর্থনীতি আর রাজনীতির খেলা
মার্চ মাসে যথারীতি ২০১৬-২০১৭ সালের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বাজেটে জোর দেয়া হয় গ্রামীণ বিকাশকে। অগ্রাধিকার দেয়া হয় গরিব কল্যাণ প্রকল্প, কৃষি বিমা, গ্রামে গ্রামে রান্নার গ্যাস সরবরাহ করার ওপর। অধিক অর্থ বরাদ্দ করা হয় ১০০ দিনের কাজের জন্য। কর কাঠামো থাকে মোটামুটি অপরিবর্তিত। মে-জুন মাসে পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হয় কংগ্রেস শাসনাধীন আসামে। সরকার গঠন করে বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস আরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতা ধরে রাখে। তামিলনাড়ুতে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসে জয়ললিতার এআইএডিএমকে দল। আর কেরালায় সরকার গঠন করে সংযুক্ত বাম গণতান্ত্রিক দল। সেপ্টেম্বর নাগাদ মোদি সরকারের আর্থিক সংস্কার এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক লক্ষ শ্রমজীবী ২৪ ঘণ্টার দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়। বাম দলগুলির ডাকা এই হরতাল আংশিক সফল হয়।
ভারত-বাংলাদেশ ‘সু-সম্পর্ক
আগস্ট মাসে আকাশবাণী থেকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য মৈত্রী বেতার চ্যানেলের শুভারম্ভ করেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। সেইসঙ্গে চালু করা হয় বাংলা ভাষায় মাল্টি-মিডিয়া সার্ভিস। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত থাকা সত্তে¦ও তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফর পিছিয়ে দেয়া হয় অজ্ঞাত কারণে। অবশ্য বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জুমান খান ভারতে আসেন মোদী সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। মূলত গুলশান সন্ত্রাসী কা-ের সঙ্গে ইসলাম ধর্ম প্রচারক জাকির নায়েকের পিস টিভিতে প্রচারিত মৌলবাদী ইসলামি অনুষ্ঠানের যোগসূত্র তুলে ধরতে এবং মুম্বাই-এর ইসলামি রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে যে এনজিওটি চলে নায়েকের নামে, তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে দিল্লীকে অনুরোধ জানান খান। এরপর ভারত ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনে বিদেশী অর্থ সাহায্য নিষিদ্ধ ঘোষণ করে।
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে ফাটল
বিগত বছরে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। জুলাই মাসে হিজবুল মুজাহিদিনের জঙ্গি নেতা বুরহান ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলীতে নিহত হবার পর, কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লাগাতার প্রতিবাদ আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। অচল হতে থাকে জনজীবন। স্কুল-শিক্ষায়তন বন্ধ থাকে। বিক্ষোভকারীরা পুড়িয়ে দেয় ২০টি স্কুল। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এবং পাকিস্তান সরকার তাকে শহিদের সম্মান দিলে, তাই নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাদ-প্রতিবাদ ওঠে চরমে।
এই পরিস্থিতিতে ঘৃতাহুতি দেয় ১৮ই সেপ্টেম্বরে জম্মু-কাশ্মীরের উরি সেনা শিবিরে সন্ত্রাসী হামলা। তাতে নিহত হন ১৯ জন ভারতীয় সেনা। ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ভারতীয় সেনা নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালায়। গুঁড়িয়ে দেয় বেশ কিছু জঙ্গি ঘাঁটি। পাকিস্তানের দিক থেকে অবশ্য তা অস্বীকার করা হয়। তারপরও নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সন্ত্রাসী হানা চলতেই থাকে। ডিসেম্বরে রাজ্যের নাগ্রোটা সেনা শিবিরে জঙ্গি হানায় নিহত হন সাতজন। সেনা জঙ্গি হামলায় ২০১৬ সালে নিহত হন ৬৪ জন ভারতীয় সেনা, যা কিনা গত দুবছরের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়াও নিহত হয় শতাধিক অসামরিক ব্যক্তি, জখম হয় প্রায় হাজার দশেক। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যের পিডিপি-বিজেপি জোট সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ অঙ্কুরেই ব্যর্থ হয়।
সন্ত্রাসের মদতদাতা পাকিস্তান?
পাশাপাশি ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসের মদতদাতা দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে কূটনৈতিক পন্থায় কোণঠাসা করার উদ্যোগ নেয়। গোয়ায় অষ্টম ‘ব্রিকস’ এবং ‘বিমস্টেক’ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানকারী দেশগুলির সামনে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন কিন্তু চীন ও রাশিয়া বেঁকে বসে। তাদের মতে, পাকিস্তানকে এককভাবে এ জন্য দায়ী করা অনুচিত। সম্মেলনে ভারত ছাডাও ছিলেন ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ নেতারা। বিমস্টেক এবং হার্ট অফ এশিয়া সম্মেলনেও একই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে ভারত পাশে পায়, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে। অন্যদিকে ভারতের দিক থেকে পাকিস্তানে সিন্ধু নদের জলপ্রবাহ হ্রাস করার চেষ্টা নিয়েও দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। পাকিস্তানের তরফে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। বলা হয়, সিন্ধু নদের জলবণ্টন চুক্তি একতরফাভাবে হেরফের করা যাবে না
নোট বাতিল : মোদির রাজনৈতিক ফাঁদ?
তবে নবেম্বর মাসে মোদী সরকারের আচমকা নোট বাতিলের ঘোষণায় গোটা দেশ কেঁপে ওঠে। বাতিল করা হয় ৫০০ ও হাজার টাকার নোট। দেশের মুদ্রা ব্যবস্থায় এটাকে মোদির আরেক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বলে অভিহিত করা হয়। ব্যাংকগুলিতে এবং এটিএমে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পুরোনো নোট জমা দিয়ে নতুন নোট তোলার দীর্ঘ লাইনে ক্লান্ত হয়ে পড়ে মানুষ। গরিব ও ছোট ছোট বিক্রেতাদের ওঠে মাথায় হাত। চাষীদের হাতে টাকা না থাকায় চাষাবাদ বন্ধ হবার উপক্রম হয়। সংসদের ভেতরে ও বাইরে শুরু হয় এই নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কাজিয়া। সংসদে এ জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদির জবাবদিহির দাবিতে প- হয়ে যায় সংসদের গোটা শীতকালীন অধিবেশন। সব থেকে আগ্রাসী হয়ে ওঠে তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোকে একজোট করতে পথে নামেন। বিভিন্ন রাজ্য সফর করেন এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে প্রতিবাদপত্র দেন তিনি। কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীও বিভিন্ন জনসভায় মোদি সরকারকে তুলোধোনা করতে থাকেন। শেষ অস্ত্র হিসেবে মোদির বিরুদ্ধে ঘুস নেবার অভিযোগও তোলা হয়।
ভারতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক
বিগত বছরের বিভিন্ন সময়ে ২১ জন বিশ্বনেতা ভারত সফরে আসেন। এর মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রঁসোয়া ওলঁদ, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, চীনের প্রসিডেন্ট শি জিনপিং, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেনট জুমা, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি, মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি প্রমুখ। মূলত ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ছিল এ সব আলোচনার শীর্ষে।
পরিবর্তন আসেনি সমাজে, জনমানসে
ভারতের দৈনন্দিন সমাজ জীবনে ধর্ষণ ও মহিলাদের শ্লীলতাহানির ধটনায় কমতি ছিল না ২০১৬ সালেও। বছরের প্রথমার্ধেই ধর্ষণের সংখ্যাটা ৩৪ হাজারের মতো। নির্ভয়া কা-ের পুনরাবৃত্তি হয় উত্তর প্রদেশের বুলন্দশায়ের শহরে। মা ও মেয়েকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ধর্ষণ করা হয়। সেখানে এমনকি নিস্তার পাননি ভারতে বেড়াতে আসা বিদেশী পর্যটকরাও। শুধুই কি ধর্ষণ? ধর্ষণের পর খুনের ঘটনাও ঘটেছে এ বছর, আকছারই।
তারপরও ঢেলে সাজছে প্রতিরক্ষা
প্রতিরক্ষা শক্তি আরও মজবুত করতে ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফায়েল যুদ্ধ বিমান কেনার জন্য মাল্টি-বিলিয়ান ডলারের চুক্তি সই হয় গত সেপ্টেম্বরে। সরাসরি কেনা হচ্ছে ১৩৬টি রাফায়েল যুদ্ধ বিমান। অন্যগুলি ফ্রান্সের সহযোগিতায় তৈরি হবে ভারতেই। ডিসেম্বরের শেষে স্বদেশে তৈরি পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাল্লার আন্তর্মহাদেশীয় পরমাণু অস্ত্র বহনক্ষম ক্ষেপাণাস্ত্রের পরীক্ষা সফল হয়। লক্ষ্য সম্ভবত চীনের থেকে আত্মরক্ষা। এছাডা যুক্তরাষ্ট্র থেকেও কেনা হচ্ছে সেনা বাহিনীর জন্য বিভিন্ন সমর উপকরণ। -ডিডব্লিউ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ