রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শ্বেতপাথরের দৈত্য আর ওকা

ওকার নাতি যে ছোট্ট জাকুয়ো, সে মাঝে মাঝে ভারী বিপদে ফেলত ওকাকে। সব নাতির মতোই কাজুয়োও ভাবত, তার ঠাকুরদার মতো দারুণ লোক আর হয় না, সারা পৃথিবী খুঁজে তাঁর মতো একজনও মিলবে কি না
সন্দেহ। ওকার অসাধ্য কিছুই নেই, এ কথা কাজুয়ো তার বন্ধুদের কাছে বুক ফুলিয়ে বলে বেড়াত।
একদিন কাজুয়ো আর তার দুই বন্ধু- মিনোরু আর শিগেও- ওকার বাড়ির সদর দরজার কাছে খেলা করছিল। সদর দরজার দু’পাশে মস্ত থামের ওপরে ছিল দু’টো বিশাল শ্বেতপাথরের সিংহের মূর্তিÑ যেন তারা ওকার বাড়ি ঢোকার রাস্তা পাহারা দিচ্ছে। কাজুয়ো বলে বসল, ‘জানিস তোরা, সারা ইয়েদো শহরে এত বড় সিংহ আর নেই।”
এখন হয়েছে কী, মিনোরুর দাদু ছিলেন এক বিখ্যাত ভাস্কর, তিনি পাথর কেটে সব মূর্তি তৈরি করতেন। মিনোরু কাজুয়োর কথা মেনে নিল না, বলল, “ও:, তাই নাকি? আমার ঠাকুরদা এর চেয়ে ঢের বড় সব সিংহ তৈরি করে।”
আরেক বন্ধু যে শিগেও সেও তো কম যায় না। সে বলল, “তোর ঠাকুরদার কথা ফেলে দে। আমার ঠাকুরদা তার দ্বিগুণ সিংহ তৈরি করতে পারে।”
“হাঁ! পারে না আরও কিছু!” মিনোরু ঠাট্টা করল, “জানিস, আমার ঠাকুরদা ইচ্ছে করলে সারা পৃথিবীটাকেই কেটেকুটে একটা সিংহ তৈরি করতে পারে।”
এতে কাজুয়ো বেচারা খুব মুশকিলে পড়ল।
মিনোরু একেবারে পৃথিবী ধরে টান দিয়েছে, কাজেই সে কী বলবে ভেবে পেল না। সে জানে তার ঠাকুরদার মতো আর কেউ নয়, কিন্তু পৃথিবীর চেয়ে বড় সাইজের সিংহ কি তিনি বানাতে পারবেন? কিন্তু তাই বলে সেও ওদের কাছে হেরে যাবে নাকি? তা কেমন করে হবে। তাই সে বলে উঠল যে, আর কেউ যে কম্মটি কক্ষনো পারবে না, সেটা তার ঠাকুরদা পারবে। তার ঠাকুরদা মহাজ্ঞানী ওকা যে-কোনো পাথরের সিংহকে জ্যান্ত করে তুলতে পারবেন।
শিগেও আর মিনোরু হেসেই কুটিপাটি। “যাঃ, তা কখনও হয় নাকি?” অবিশ্বাসী গলায় বলল তারা, “এ হতেই পারে না।”
কাজুয়ো খুব রেগে গেল। সে বলল, “কে বলল হতে পারে না? চল আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি,” বলে সে দু’জনকে টানতে টানতে ওকার কাছে নিয়ে চলল।
ওকার বয়স তো অনেক। তবু কাজুয়োর মতো চার বছরের শিশুদের মন তিনি ভালোই বুঝতেন। কাজেই তখন তার নাতি দুই বন্ধুকে নিয়ে তার ঘরে এসে পৌঁছোল এবং শ্বেতপাথরের সিংহকে জ্যান্ত করে তোলার জন্যে তাঁকে জোর করতে লাগল, তিনি বেশ বিপাকে পড়লেন। তাঁর জ্ঞান প্রচুর, বুদ্ধিও অনেক। কিন্তু তাই বলে তাঁর এমন কোনো জাদুমন্ত্র জানা নেই যে পাথরের সিংহ জ্যান্ত হিংস হয়ে যাবে। কিন্তু বুঝলেন, একথা কখনোই বলা যাবে না। বললে বন্ধুদের কাছে কাজুয়োর মাথা হেঁট হয়ে যাবে।
তাই ব্যাপারটা নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবনাচিন্তা করলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, ব্যাপারটা অসম্ভব নয়- এই পাথরের সিংহকে জ্যান্ত সিংহ করে তোলা। রূপকথা যারা পড়েছে তারা সবাই একথা জানে। তা এক কাজ করো। মিনোরুর দাদু যে সিংহ বানিয়েছেন তার একটা আমাকে এনে দাও না, আমি দেখি তার জীবন দেওয়া যায় কি না।” ওকা ভাবলেন ‘কেমন চালাকি করেছি। এবার মুশকিলে পড়েছে বাবুরা।”
কিন্তু কাজুয়ো মোটেই দমে যাবার পাত্র নয়। সে অধৈর্য হয়ে বলল, “কেন দাদু, মিনোরুদের সিংহ আনতে যাব কেন? ওই তো আমাদের গেটে দাঁড়িয়ে আছে দুটো পাথরের সিংহ। তার একটাকে তুমি প্রাণ দাও না। প্রাণ দাও আর বলো যে, ও যেন মিনোরু আর শিগেওকে অল্প একটু করে কামড়ে দেয়। তাহলে জন্মে আর ওরা আমার কথা অবিশ্বাস করবে না।”
ওকা একটু গম্ভীর হলেন কথাটা শুনে। তারপর বললেন, “তুমি যা বলছ তাও অবশ্য করাই যায়। তবে কিনা, একটা পাথরের জন্তুকে প্রাণ দিতে অনেক পরিশ্রম লাগে তো। আসলে আজ সারাদিন আমার খুব খাটুনি গেছে, শরীরটাও তেমন ভাল নেই-”
বলতে বলতেই ওকা হঠাৎ থেমে গেলেন, বুঝলেন, ও কথাটা বলা আগে ঠিক হয়নি। বাচ্চারা যেভাবে তাঁরদিকে তাকাচ্ছে তাতে বোঝাই গেল, ওরা তাঁর জারিজুরি ধরে ফেলেছে। তিনি পালাবার ফন্দি খুঁজছেন বলেই ওদের মনে হচ্ছে। কাজুয়োর চোখে প্রায় জল এসে গেছে।
“আচ্ছা, ঠিক আছে।” ওকা গলা ঝেড়ে নিয়ে বললেন, “শরীর যাই হোক, কাজটা করা যাবে। চলো যাই, গিয়ে সিংহটাকে একবার দেখি।”
ওকা এগিয়ে চললেন সিংহটার দিকে, তিনটি ছেলে গুটিগুটি তাঁর পেছন-পেছন চলল। যেতে যেতে ওকা তাদের চিনে পাথরের বাঁদরদের জ্যান্ত হয়ে ওঠার আশ্চর্য সব গল্প বললেন। বাচ্চারা চোখ বড় বড় করে শুনছিল গল্পগুলো। এইভাবে পাথরের সিংহগুলোর কাছে এসে পড়ল তারা। সবাই নিশ্চিত যে, ওকা নিশ্চয়ই একটা সিহকে প্রাণ দিয়ে তাকে জ্যান্ত করে তুলতে পারবেন।
একটা সিংহের কাছে গিয়ে ওকা সেটাকে ভালো করে দেখতে লাগলেন। “কাজটা খুব পরিশ্রমের হলেও,” ওকা বললেন, “একেবারে অসম্ভব নয়।” ছেলেদের দিকে তাকালেন তিনি। “সিংহটা মস্ত। জ্যান্ত হলে ভয়ংকর হয়ে উঠবে, এমন আশা করাযায়।”
ছেলে তিনটির মুখ একটু শুকনো মনে হল। “আচ্ছা দাদু, তুমি ওটাকে জ্যান্ত করে তোলো, আর আমরা ওই গাছটার আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে দেখি কেমন?” কাজুয়ো বলল।
“তা তো হবে না” ওকা বললেন, “আমি বুড়ো মানুষ, আমার একার গায়ের জোরে তো হবে না। তোমাদেরও আমার সঙ্গে হাত লাগাতে হবে। প্রাণ দেওয়া অত সোজা কাজ নয়। এখন তোমরা একে অন্যের কাছে বিদায় নাও।”
“বিদায় নেব?” শিগেও জিজ্ঞেস করল।
“সে তো নিতেই হবে!” ওকা উত্তর দিলেন, “এ সিংহটা যখন জ্যান্ত হয়ে উঠবে তখন আমাদের চারজনকেই তো আস্ত খেয়ে ফেলবে। তোমরা বাড়িতে সকলের কাছে বিদায় নিয়ে এসেছ তো?”
বাচ্চা ছেলে তিনটি সিংহটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কীরকম চুপ করে গেল। শেষে শিগেও খানিকটা ফিসফিস করে বলল, ‘মহামান্য ওকা, আপনার যখন শরীরটা ভালো নেই বলছেন, তাহলে এখন থাক না। কাজ কী সিংহটার প্রাণ দিয়ে।”
“তা কি হয় দাদু,” ওকা বললেন, “আমি যে সিংহটাকে জীবন দিতে পারি সেকথা প্রমাণ করব কী করে, যদি এখন কাজটা করে না দেখাই তোমাদের চোখের সামনে?”
মিনোরু চট করে বলল, “না, না, আমাদের খুব বিশ্বাস আছে আপনার ওপর। আমরা জানি আপনার অনেক ক্ষমতা।”
শিগেও সঙ্গে সঙ্গে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরা সবাই জানি! আপনাকে করে দেখাতে হবে না।”
“আমি কি কোনোদিন বলেছি যে তুমি পার না দাদু?” কাজুয়ো অনুযোগ করল।
ওকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তা তোমরা যদি সবাই এমন জোর কর, তাহলে থাক, এখন সিংহটাকে প্রাণ দিয়ে কাজ নেই। চলো তাহলে বাড়ির দিকে যাওয়া যাক। মনে হচ্ছে কাজুয়োর ঠাকুরমা মিষ্টিটিষ্টি তৈরি করছেন। দ্যাখা যাক তার কিছু আমাদের জোটে কিনা।” ওকা আর একবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “তবে কিনা, আমার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলুম তোমাদের কায়দাটা দেখিয়ে বেশ তাক লাগিয়ে দেব- ওই সিংহটাকে জীবন দিয়ে। তা ঠিক আছে মন খারাপ হোক যাই হোক, সবাই যে প্রাণে বেঁচে গেলুম সেটাই বা খারাপ কী, কী বল তোমরা?”
[জাপানের লোক কাহিনী পবিত্র সরকার রচিত ‘ওকার সূক্ষ্মবিচার’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত।]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ