শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

চিকিৎসা ও কেনাকাটার জন্য মানুষ ইন্ডিয়া যায় কেন?

এবার ঈদের বাজার নিয়ে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় নানারকম  রিপোর্ট এবং মন্তব্য হয়েছে। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ঈদের অন্তত ১০ দিন আগে রিপোর্ট করা হয় যে, ঈদ শপিং অর্থাৎ ঈদের কেনাকাটার জন্য ভারতীয় দূতাবাস নাকি ভিসা পদ্ধতি  এবং ভিসা সংক্রান্ত আইনকানুন শিথিল করেছে। এই শিথিল করার কারণে ইতোমধ্যেই ২ লাখ লোককে ভিসা দেয়া হয়েছে এবং তারা ইতোমধ্যেই কলকাতাসহ  ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঈদ শপিংয়ের জন্য গিয়েছে। ঐ সব রিপোর্টে আরো বলা হয় যে,  ভিসা রিল্যাক্স করার ফলে ঐ ২ লাখ ছাড়াও আরো ৩ লাখ ভিসা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই সব ভিসা ইস্যু হয়ে গেলে  ৪ থেকে ৫ লাখ লোক ভারতের বিভিন্ন স্থানে যাবে ঈদ শপিংয়ের জন্য।
চার পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলে ঢাকার বিপণী বিতানসমূহের ঈদ কেনাকাটা সম্প্রচার করা হয়। অনেক মালিক এবং সেলসম্যান বলেন যে, এবার কেনাকাটা নাকি গত বছরের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন যে, ঈদের  কেনাকাটার জন্য লাখ লাখ বাংলদেশী ইন্ডিয়া গেছে। এ জন্যই তাদের বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে ঈদের দিনের চার থেকে পাঁচ দিন আগে বেচাবিক্রি আগের দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হয় বলে জানা যায়।
৪ লাখ, ৫ লাখ বা ২ লাখ’র কথা জানি না, তবে লক্ষাধিক লোক যে এইবার ঈদ শপিংয়ের জন্য ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন সেটা এখন ওপেন সিক্রেট।  কেনাকাটার জন্য লক্ষাধিক ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন  এবং সেখানে বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকাকে ভারতীয় রূপিতে কনভার্ট করে ইন্ডিয়াতে খরচ করে এসেছেন, এটি সমর্থন করা যায় না। এর ফলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। সেটি হলো, কেন বাংলাদেশের মানুষ ঈদের  কেনাকাটার জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে ইন্ডিয়া যাচ্ছেন। এই কারণটি বের করতে না পারলে কেন ইন্ডিয়া যায়, সেই কথা বলে বা সেই ধরনের বিলাপ করে  তাদের ইন্ডিয়া যাওয়া ঠেকানো যাবে না। কেন তারা ঝাঁকের কৈয়ের মতো ভারতে যাচ্ছে? সে সম্পর্কে বিবিসি একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট সম্প্রচার করেছে। এই রিপোর্টটি সকলকেই সিরিয়াসলি বিবেচনা করতে হবে।
ঈদ শপিং উপলক্ষে লাখ লাখ বাংলাদেশীর ভারত গমন সম্পর্কে ঈদের ৪ দিন আগে অর্থাৎ গত ২২ জুন বিবিসির বাংলা সার্ভিসে একটি রিপোর্ট সম্প্রচার করা হয়। ঐ রিপোর্টে এক মহিলা ক্রেতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে,  ঢাকায় যে শাড়িটি ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে সেটি কলকাতায় তিনি ১১ হাজার টাকায় কিনেছেন। অনেক ক্রেতা বিবিসির প্রতিনিধিকে বলেন যে, ঢাকায় তুলনামূলকভাবে উচ্চ মূল্য ছ্ড়াাও ঢাকায় সেলস ম্যানদের ব্যবহারও ভাল নয়। ঢাকায় কোনো  ভাল বিপণী বিতানে গিয়ে কয়েকটি  শাড়ি দেখার পর ক্রেতা যদি কোনো শাড়ি না ক্রয় করেন তাহলে সেলস ম্যান ঐ কাস্টমারকে কটাক্ষ করেন। কিন্তু কলকাতায় ৫০০ টাকায় শাড়ি কিনতে গিয়ে যদি দু একটি শাড়ি আপনার পছন্দ না হয় তাহলে সেলস ম্যান  আপনাকে  তার  দোকান থেকে অন্তত ৫০ টি শাড়ি দেখাবে। এসবই করবে সে হাসিমুখে। তার পরেও যদি আপনার পছন্দ না হয় তাহলে ঐ সেলস ম্যান আপনাকে হাসিমুখে বলবে, আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারলাম না বলে আমরা দুঃখিত। এই রকম ব্যবহার কি আপনি ঢাকার কোনো বিপণী বিতানে  পাবেন? বিবিসি প্রতিনিধির কাছে অনেক  কাস্টমার এ প্রশ্ন করেছেন।
 কেনাকাটার জন্য বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় গিয়েছেন এমন অনেক  ক্রেতার সাথে বিবিসির কথা হয়েছে। বাংলাদেশের বাজার মূল্য হিসাব করে অনেকে বাজেট করে কলকাতা গেছেন। কিন্তু সেখানে কেনাকাটা সারার পরেও অনেকের হাতে  কিছু উদ্বৃত্ত টাকা থেকেছে। কারণটি হলো, তারা যে বাজেট নিয়ে ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন, সেখানে গিয়ে দেখেন যে, বাস্তবে জিনিসপত্রের দাম তার বাজেটের চেয়ে কম। তখন  অনেকে  এই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন বা ডাক্তার দেখিয়েছেন। 
॥দুই॥
বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, শুধুমাত্র  কেনাকাটার জন্যই নয়, লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছেন। তারা শুধু কলকাতায়ই যাচ্ছেন না, চিকিৎসার জন্য তারা দিল্লি, মাদ্রাজ এবং ক্ষেত্র বিশেষে হায়দারাবাদ যান। একটি জরিপে দেখা যায় যে, ভারতগামী বাংলাদেশিদের সিংহভাগই যান ভ্রমণ ভিসা নিয়ে। তারা রথও দেখেন, কলাও  বেচেন। তারা শপিং করেন, চিকিৎসা করেন এবং ভ্রমণ করেন। চিকিৎসার জন্য দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ ইন্ডিয়া যাচ্ছেন। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে এবং কেউ বিমানে। যার যেমন সামর্থ্য।
 ট্যুরিজম বা ভ্রমণের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার  বা লাখ লাখ মানুষ ইন্ডিয়া যাচ্ছেন কেন? এ সম্পর্কে ভাল করে খোঁজখবর নিলে যে চিত্র বেরিয়ে আসে সেটি মোটেই সুখকর নয়। শুধুমাত্র বিবিসির রিপোর্টে বিশ্বাস করবো কেন? নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে অনুসন্ধান করেও এই চিত্র পাওয়া গেছে। হাজার হাজার কেসের মধ্যে মাত্র দ’ু একটি উল্লেখ করছি।
আমার এক আত্মীয়া দীর্ঘ দিন ধরে ডায়াবেটিস এবং কিডনি রোগে ভুগছে। ঢাকার নামি চিকিৎসক জবাব দেন যে, তাকে ডায়ালাইসিস করতে হবে। সে কলকাতা যায়। সেখানে বলে যে ডায়ালাইসিসের কোনো প্রয়োজন নেই। ওষুধ খেলে অনেক খানি সেরে যাবে। ফিরে এসে সেই মোতাবেক ওষুধ খায়। দ’ বছর হয়ে গেল। সে ডায়ালাইসিস করেনি। সে ভালই আছে।
আরেকটি কেস বলছি। আমার এক আত্মীয়  একই অসুখে বেশ সাফার করছিল। ঢাকায় তাকে একটি নাম করা হাসপাতাল থেকে বলা হলো যে, তার কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিল যে, সে ঢাকায় এই কাজটি করবে না। কলকাতায় করবে। সে কলকাতা যায়  এবং ডোনারও সাথে নিয়ে যায়। কলকাতায় সে  যে হাসপাতালে যায় সেটির নাম বাংলাদেশের অনেকেই জানেন। সেই হাসপাতাল থেকে তাকে বলা হলো যে, এই মুহূর্তে ট্রান্সপ্লান্টেশনের কোনো প্রয়োজন নেই। যে ওষুধগুলো দেয়া হচ্ছে সে ওষুধগুলো খেয়ে দেখেন কি হয়। ৬ মাস পরে আসুন এবং চেক আপ করুন। এর পর দেড় বছর পার হয়ে গেছে। সে ঐসব ওষুধ খেয়েছে এবং মোটামুটি সুস্থ আছে। এর মধ্যে সে তিনবার কলকাতা গেছে এবং চেক আপ করিয়ে এসেছে।
এখন প্রিয় পাঠক এবং দেশবাসী বলুন, আমাদের যতই দেশপ্রেম থাক না কেন, এমন একটি পরিস্থিতি এবং পটভূমিতে দেশে চিকিৎসা করে সে কি কিডনি হারাবে?  ডায়ালাইসিস করে সে কি প্রতিবার ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা গুণবে? একটি লোক  বিনা কারণে তার একটি কিডনি হারাবে? এমন ক্ষেত্রে বিদেশে চিকিৎসা করানো ছাড়া তার আর কোনো  উপায় আছে কি?
অথচ, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। অনেক আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐসব হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা করানো হচ্ছে এবং চিকিৎসা করছেন অনেক নামকরা ডাক্তার বা সার্জন। বাংলাদেশে  মেডিসিন, কার্ডিওলজি, চক্ষু, দন্ত প্রভৃতিতে একাধিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রয়েছেন। কিন্তু সংখ্যায় তারা অত্যন্ত নগণ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন মেডিসিন ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জানি। এদের ফি ১২০০ টাকা। দৈনিক  ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী দেখেন। সিরিয়াল পেতে লম্বা লাইন লাগাতে হয় এবং অনেক বিলম্ব হয়। আমি তাদের দুজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ৬০-৭০ জন রোগী দেখে তাদের সকলের ওপর কি জাস্টিস করতে পারেন? তারা উত্তরে বলেছিলেন ৩০ জন রোগী দেখার পর ব্রেন এলোমেলো হয়ে যায়। তার পর ভুলভাল হতেই  পারে। কিন্তু কি করবো? পেসেন্টের অনেক চাপ।
॥তিন॥
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি। ডাক্তারের ফি  এবং ওষুধপত্রের খরচ তো আছেই। এ্যাপোলো, ইউনাইটেড, ল্যাব এইড প্রভৃতি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ৭ দিন থাকলে দেড় লাখ টাকার কমে বেরিয়ে আসা যায় না। আর যদি  সার্জারি বা অপারেশন থাকে  তাহলে  আরো দুই লাখ টাকা। মোট আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। অথচ, কলতাতা গিয়ে একই চিকিৎসা দেড় লাখ টাকার মধ্যে সেরে দেশে ফেরা যায়।
আরেকটি অপ্রীতিকর দিক না বললেই নয়। আমার দুজন আত্মীয়ের কথা বলছি। তারা ঢাকায় গ্যাস ও ডায়রিয়ার সমস্যা নিয়ে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে যান। ডাক্তার সাহেব তাকে দেখে বলেন, আপনাকে এখনই এন্ডোস্কপি করতে হবে। খরচ পড়বে ১৭ হাজার টাকা। বেরিয়ে এসে আমরা  বললাম, দেখি না, এন্ডোস্কপি এখন না করলে কি হয়। তারা এন্ডোস্কপি করেন নি। দেড় বছর হয়ে গেছে। কোনো সমস্য হয়নি। ২য় জন কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে বলা হয়েছে এন্ডোস্কপির প্রয়োজন নেই। তিনি ভালই আছেন।
প্রিয় পাঠক ভাইয়েরা, আমার এই লেখার অনেক রকম ব্যাখ্যা অনেকেই করতে পারেন। অনেকে ভুলও বুঝতে পারেন। কিন্তু আমার বক্তব্য হলো, বাংলাদেশে মেধাবী ডাক্তার আছেন। ভাল ভাল হাসপাতালও রয়েছে। এই ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা এখন প্রায় ২ কোটি। সেই তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হাতেগোণা যায়। আমাদের কারো দেশপ্রেমিকতার অভাব নেই। চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে। কমানো যে সম্ভব, সেটি তো প্রমাণ হয়ে গেছে হার্টের স্টেন্টিংয়ের জন্য যে রিং বসানো হয় তার দাম ৪ ভাগের একভাগ কমানোতে। ১ লাখ টাকার রিং সরকার ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন। চিন্তা করুন, এরা ৪ গুণ মুনাফা করছে। এখন তারা সরকারের বেঁধে দেয়া দামে রিং বিক্রি করতে  গাঁইগুই করছে। ঢাকার একটি হাসপাতাল আছে যেখানে ডায়ালাইসিস করতে মাত্র দেড় হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ, একটু বড় হাসপাতালে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা।
যতদিন মুনাফার উদগ্র লালসা না কমবে, যতদিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে মানবিকতার সৃষ্টি না হবে, ততদিন খাঁটি বাংলাদেশি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ ইন্ডিয়ায় কেনাকাটা এবং চিকিৎসার জন্য যেতে বাধ্য হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ