বৃহস্পতিবার ০৫ আগস্ট ২০২১
Online Edition

বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কাশ্মীরে ব্যাপক সংঘর্ষ

৮ জুলাই, এনডিটিভি, এএফপি : সীমান্তে সংঘর্ষে হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যবার্ষিকীর দিনে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়েছে স্থানীয়রা।
সীমান্তে পাল্টাপাল্টি গুলী ও গোলাবারুদ বর্ষণে দুই ভারতীয়সহ অন্তত ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া আহত হয়েছে অন্তত ১১ জন। শনিবার সকালে পুঞ্চ সীমান্তের লাইন অব কন্ট্রোলের কাছে পাক সেনাবাহিনীর গুলীতে ভারতীয় এক দম্পতি নিহত হয়েছে। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুলীতে চার পাকিস্তানী নাগরিক নিহত ও আরো ৯ জন আহত হয়েছে বলে ডনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এছাড়া কাশ্মীরের বান্দিপুর সীমান্তে পাক সেনাবাহিনীর গুলীতে শনিবার সকালের দিকে আরো তিন ভারতীয় সেনা আহত হয়েছেন।
বুরহান ওয়ানির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কাশ্মীর উপত্যকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। শনিবার হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কাশ্মীরে মোবাইল সেবা ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে ভারত।
স্থানীয়রা বলছেন, মানুষের চলাচলে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বাড়ি থেকে বের হলে তাদেরকে গুলী করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী।
গত বছরের ৮ জুলাই কাশ্মীরের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার বুরহান ওয়ানি ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুলীতে নিহত হয়। এর পর থেকেই ব্যাপক বিক্ষোভ ও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে দফায়  সংঘর্ষে জড়ায় উত্তপ্ত কাশ্মীরের মানুষ।
২৩ বছর বয়সী হিজবুল এই কমান্ডারের মৃত্যুর পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে তার সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি ঘোষণার পর রাস্তায় নেমে আসে বুরহানের অনুসারীরা।
মাসের পর মাস ধরে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় তারা। কয়েক মাসের সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রতিবাদ দমনে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্লেট গানের গুলীতে মারাত্মক আহত হয় আরো কয়েকশ মানুষ।
বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে ভারতের প্রতি ঘৃণা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
ক্রমেই জোরদার হচ্ছে স্বাধীনতার স্লোগান। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও ছড়িয়েছে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের স্বাধীনতার স্লোগান।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে কাশ্মীর সমস্যা বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে ভারতের ওপর ক্রমেই চাপ বাড়ছে।
সম্প্রতি ভারত সফরে এসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানও কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে মোদীকে বলে গেছেন। মোদী সঙ্গে বৈঠকে এরদোগান বলেছেন, কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে তিনি মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী।
এদিকে এসএ মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্বতশৃঙ্গ অঞ্চলটিতে স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত ডজন ডজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবাস। কিন্তু গত বছরের ৮ জুলাই যখন স্বাধীনতাকামী নেতা বুরহান ওয়ানিকে গুলি করে হত্যা করা হয় তখন থেকেই ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে বেসামরিক লোকজন ক্রমবর্ধমানহারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
২৩ বছর বয়সী বুরহান যে একটি একে-৪৭ নিয়ে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ার আলোড়ন তুলে ছিল তার মৃত্যুর পর কাশ্মীরীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। কয়েক মাস ধরে গণ বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন বেসামরিক লোককে হত্যা করা হয়েছে যার অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়। এই অঞ্চলের সরকারি বাহিনী দ্বারা ব্যবহৃত পেলেট বন্দুকের গুলিতে আরও অনেকেই অন্ধ হয়ে যায় যা কর্তৃপক্ষ এবং ইতিমধ্যেই বিচ্ছিন্ন জনগণের মধ্যে বিভেদকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
শ্রীনগরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা জুলাই থেকে আহত বেসামরিক নাগরিকদের একটি নিয়মিত প্রবাহ পেয়ে চলেছেন এবং ‘ভয়াবহ’ চোখের আঘাত নিয়ে আসা ১০০০ এরও বেশী মানুষের চিকিৎসা করেছেন।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের একটি জনাকীর্ণ হাসপাতালে গুলিতে আহত অবস্থায় শুয়ে আছে ১৭ বছর বয়সী এক ছাত্র- ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে হাজার হাজার আহত বেসামরিক কাশ্মীরির মত সেও গত বছর কাশ্মীরের একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী নেতার মৃত্যুতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। সম্প্রতি একটি জঙ্গি আশ্রয় কেন্দ্রে গোয়েন্দা তল্লাশি চালানোর জন্য সরকারী বাহিনী ছবির মত সুন্দর হিমালয়ের উত্তরাঞ্চলে তার গ্রামে এসেছিল, তখন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কিশোর বিদ্রোহীদের পালাতে সাহায্য করার জন্য বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে নিজের শরীর পেতে দিয়েছিল।
শ্রীনগর এর হাসপাতালের বিছানা থেকে সে এএফপিকে জানায়, ‘আমি আটকা পরা যোদ্ধাদের প্রতি যখন সৈন্যরা গুলি চালাচ্ছিল তখন এর মাঝখানে লাফিয়ে পড়ে তাদের দিকে ছোড়া গুলিতে আহত হই।’
ক্রোধ এবং প্রতিহিংসা : বিদ্রোহের নতুন উপকেন্দ্র দক্ষিণ কাশ্মীরের কিছু এলাকায় গ্রামবাসীরা সরকারের জঙ্গি বিরোধী অপারেশনের মধ্যে হস্তক্ষেপ শুরু করে। তারা সরকারি বাহিনীর দিকে পাথর নিক্ষেপ করে, বিক্ষোভ তৈরির মাধ্যমে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে বিদ্রোহীদের পালানোর সুযোগ করে দেয়। কাশ্মীরের ইতিহাসবিদ সিদিক ওয়াহিদ বলেন, ‘এটি এখন সম্মুখ মোকাবিলায় রূপ নিয়েছে। কাশ্মীরের জনগণের রাগ এবং প্রতিহিংসা এরকম আগে কখনও দেখা যায়নি।’
কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা- যাদের বেশিরভাগই তাদের বাড়িতে গৃহবন্দী অথবা জেলবন্দী- তারা সবাই ওয়ানির মৃত্যুতে গতকাল শনিবার থেকে এক সপ্তাহের বিক্ষোভ পালনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ কিছু এলাকায় জনগণের আন্দোলন এবং স্থগিত মোবাইল ইন্টারনেট সেবা নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে।
একজন সিনিয়র অফিসার জানান, দক্ষিণ কাশ্মিরের পুলিশ স্টেশনে গ্রামবাসীদের মধ্যে সক্রিয় কর্মীদের চলাফেরা বন্ধ করার জন্য মোটরবাইকগুলি আটক করা হয়েছে। দক্ষিণ কাশ্মির এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় ২০০০ সৈন্যের দুটি অতিরিক্ত সেনা ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করেছে ভারত সরকার। তবে কিছু কর্মকর্তা বলছেন যে, এখন মূল চ্যালেঞ্জ জঙ্গি হুমকি নয় বরং জনতার রোষের মোকাবেলা করা।
এক সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম গোপন করার শর্তে এএফপিকে জানান, ‘সশস্ত্র জঙ্গিরা এখন বড় চ্যালেঞ্জ নয়, জঙ্গিবাদবিরোধী অপারেশন জোরদার করা হয়েছে এবং আমরা তাদের নির্মূল করছি। কিন্তু জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার মত কোনও রাজনৈতিক দলে অনুপস্থিতিতে, তারা (বিদ্রোহী) ভারতের বিরুদ্ধে জনগণের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে।’
ভারতের একমাত্র মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর ২০১৪ সাল থেকে ভারতের প্রতি অনুগত দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)সাথে এক অপ্রিয় জোটের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে, এটা কাশ্মীরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের বিরোধিতাকে আরও তীব্র করছে এবং ওয়ানির মৃত্যুর পর বিদ্রোহীদের সাথে প্রায় ১০০ জন কাশ্মীরি যুবক যোগ দিয়েছে। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী থেকে অনেকেই অস্ত্র ছিনিয়ে নিতেও সক্ষম হয়েছে।
শুরুতে যেই কিশোরের কথা বলা হচ্ছিল সেও তাদের সাথে যোগদানের আশা করছে বলে জানায়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অনেক দুর্বল এবং মৃদু স্বরে সে জানায় ‘আমি প্রার্থনা করছি এখান থেকে বের হয়েই আমি একটি অস্ত্র খুঁজে পাবো এবং আমার ভাইদের সাথে যোগ দিতে পারবো’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ