সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত রাজধানী

আষাঢ়ের মাত্র দু’চারদিনের টানা বর্ষণেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানী মহানগরী। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অলি-গলি ও মহল্লা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় প্রচন্ড পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাওবা কোমর পর্যন্ত পানি জমেছে। এই পানিও আবার স্বচ্ছ বা নিরাপদ নয় বরং কালো, নোংরা এবং দুর্গন্ধযুক্ত। পানিতে রয়েছে নানা রোগ-জীবাণু। রিপোর্টে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৮ মিলিমিটার। পরদিন বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আকাশ যেন ভেঙে পড়েছিল। এ সময় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৫২ মিলিমিটার। এভাবে বৃষ্টি হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরেই। কখনো হাল্কা কখনো আবার মুষলধারে হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে এমনকি বঙ্গভবনের সামনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, বঙ্গভবনের পাশের সড়ক দিয়েও যানবাহন চলাচল করতে পারেনি। যাত্রাবাড়ি ও সায়েদাবাদ থেকে গুলিস্তান হয়ে মিরপুর বা অন্য কোনো গন্তব্যের যানবাহনগুলোকে মতিঝিল-দিলকুশা হয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। অথচ এই বঙ্গভবনেই দেশের রাষ্ট্রপতি বসবাস করেন! 

বঙ্গভবনের সামনের ও পাশের সড়ক যখন পানির নিচে চলে যায় তখন রাজধানীর অন্য এলাকা ও সড়কগুলোর অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবেও পানিবদ্ধতার শিকার হয়েছে প্রতিটি এলাকা। বস্তুত এমন কোনো এলাকার কথা বলা যাবে না, যেখানে দুই থেকে তিন-চার ফুট পর্যন্ত পানি না জমেছিল। অনেক এলাকায় বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে পড়েছে। কোনো এলাকার রাজপথেই স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। মোটর সাইকেল থেকে শুরু করে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার তো বটেই, যাত্রীবাহী বাসও অচল হয়ে পড়েছে যেখানে-সেখানে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি জাতীয় দৈনিকে রাজধানীর সড়কগুলোকে গাড়ির গ্যারেজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যানবাহন অচল হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ার কারণেও নোংরা ও বিষাক্ত পানি ভেঙে মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্কুলগামী শিশু-কিশোর থেকে অফিসগামী চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী পর্যন্ত প্রত্যেককে বিপদে পড়তে হয়েছে। যানবাহনের অভাবে কোথাও কোথাও একই জায়গায় তাদের দু’তিন ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়েছে। আধ ঘণ্টার পথ অনেকে পাড়ি দিয়েছেন এমনকি চার-পাঁচ ঘণ্টায়। গুরুতর অসুস্থদেরও হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি। চলাচল করতে পারেনি অ্যাম্বুলেস। 

অর্থাৎ সব মিলিয়েই বিশেষ করে মঙ্গল ও বুধবার- এই দু’দিন রাজধানীর অবস্থা হয়েছিল অত্যন্ত শোচনীয়। বলা যায়, বৃষ্টির পানিজটে পুরো ঢাকা মহানগরীই আসলে অচল হয়ে পড়েছিল। এদিকে স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ পানিজটের কারণ নিয়ে মতামত প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, মেট্রোরেল প্রকল্প, ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, তিতাস ও বিটিসিএলসহ কয়েকটি সংস্থা বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। এক সংস্থা কোনো এলাকায় কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার পরপর অন্য কোনো সংস্থা আবার একই এলাকায় তাদের মতো করে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দেয়। ফলে ওই এলাকায় সড়কের অবস্থা যেমন স্বাভাবিক হতে পারে না তেমনি অল্প বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। 

সংগ্রামের রিপোর্টে একটি বড় উদাহরণ হিসেবে মেট্রোরেল প্রকল্পের উল্লেখ করা হয়েছে, যার কারণে আগারগাঁও হয়ে চলাচলকারী বৃহত্তর মিরপুরের অধিবাসীরা কয়েক বছর ধরে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কেননা, মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির পাশাপাশি আগারগাঁও সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এর ফলে প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতিতে কোনো শুভ পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। শুধু মেট্রোরেল প্রকল্প নয়, মিরপুরসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকারই কোথাও চলছে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গ্যাস ও অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল প্রতিস্থাপনের কাজ, কোথাও আবার চলছে ওয়াসার পানি সররাহের সংযোগ পাইপ বসানোর কাজ। একাধিক ফ্লাইওভার তো রয়েছেই। এসবই চলছে কয়েক বছর ধরে। ফলে মানুষেরও ভোগান্তির অবসান ঘটছে না। মানুষ আসলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।  

সরকারের পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কারণ, ভয়াবহ পানিবদ্ধতার কারণে মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তেমন এক অবস্থার মধ্যেও টেলিভিশনে নিজেদের চমৎকার চেহারা দেখিয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে একের পর এক ভবিষ্যৎ প্রকল্পের কথা শুনিয়েছেন দুই মেয়র, যেগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর কোথাও নাকি পানি জমতে পারবে না। দু’চারঘণ্টার মধ্যেই পাম্প দিয়ে নাকি পানি সরিয়ে ফেলবেন তারা! প্রশ্ন উঠেছে, পাম্প দিয়ে সরানো পানি কোথায় গিয়ে পড়বে বা জমা হবে? এমন প্রশ্নের কারণ, অপরিকল্পিত নগরায়নের জন্য বছরের পর বছর ধরে শত শত পুকুর ও খাল ভরাট করা হয়েছে। এসব স্থানে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন ও স্থাপনা। ভবনগুলোর আশপাশে মাটির নিচে প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট জায়গা রাখা বা প্রশস্ত ড্রেন তৈরি করা হয়নি। এছাড়া পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনা জমে গিয়ে ড্রেনগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, মাননীয় মেয়ররা পাম্প দিয়ে পানি সেচের আশ্বাসবাণী শোনালেও রাজধানীর কোনো এলাকাতেই ওই পানি জমিয়ে রেখে পরে চারপাশের নদ-নদীতে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। সুতরাং পাম্প বসানোর নামে শুধু কোটি কোটি টাকারই শ্রাদ্ধ করা হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

আমরা মনে করি, মাত্র দু’চারদিনের বৃষ্টিতে সৃষ্ট পানিজটের বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যার এই দেশে মাত্র দু-তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পুরো রাজধানী তলিয়ে যাবে, অচল হয়ে পড়বে এবং মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তির শেষ থাকবে না- এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। একই কারণে পানিজটের বিভিন্ন কারণ সম্পর্কে জানানো এবং সমাধানের পথ খোঁজা দরকার। খাল ও পুকুর দখলের পাশাপাশি এগুলো ভরাট করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণকে দায়ী করে দেয়া বিভিন্ন মহলের বক্তব্যকে আমরাও প্রধান একটি কারণ বলে মনে করি। খাল ও পুকুর দখলের এই অভিযানকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। বাধাহীন পানি প্রবাহের জন্য রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় যথেষ্ট প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ করতে হবে এবং কোনো ড্রেনেই আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না। এগুলোকে নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ওয়াসা, তিতাস, বিটিসিএল এবং দুই সিটি করপোরেশনসহ রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির দায়িত্বে নিয়োজিত সকল সংস্থার কাজে সমন্বয় করাটা জরুরি। সব মিলিয়ে আমরা চাই, আর কখনো যাতে রাজধানী এবারের মতো বিপর্যস্ত হয়ে না পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ