শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ফরহাদ মজহারের অপহরণ প্রসঙ্গে

দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারকে নিয়ে গত সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত মানুষকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। এর কারণ, তাকে গুম বা অপহরণ করা হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর আদাবর থানায় একটি জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করার পাশাপাশি রাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, সেদিন ভোর পাঁচটার পরপর মোবাইলে ফোন করে কে বা কারা তাকে নিচে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। নিজের শ্যামলীর বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে টেলিফোনে তিনি তার স্ত্রীকে জানিয়েছেন, তাকে অপহরণ করা হয়েছে এবং অপহরণকারীরা তার কাছে ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। টাকা না দেয়া হলে তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে অপহরণকারীরা। এভাবে কথা বলার এক পর্যায়ে ভীতসন্ত্রস্ত ফরহাদ মজহার জানিয়েছিলেন, তাকে সম্ভবত ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নিজের জীবনের ব্যাপারেও গভীর উদ্বেগ প্রাশ করেছিলেন তিনি।
খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এক টুইট বার্তায় তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেছেন, না হলে সম্পূর্ণ দায় সরকারকেই বহন করতে হবে। তিনি আরো বলেছেন, এটা শাসকচক্রের আরেকটি নিষ্ঠুর কর্মকান্ড। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সরকারের নির্দেশে বিশেষ এজেন্সির লোকজন ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করেছে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নও একই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে অনতিবিলম্বে অপহৃত ফরহাদ মজহারকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছিল। রাতে ফরহাদ মজহারের বাসায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অজান্তে এত বড় কোনো ঘটনা দেশে ঘটতে পারে না এবং তিনি চাইলে ফরহাদ মজহারকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। পারিবারিক ওই সংবাদ সম্মেলনে অপহৃত ফরহাদ মজহারকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের অপহরণের ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করার এবং প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ফরহাদ মজহারকে জীবিত উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
এদিকে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকেও দৃশ্যত উদ্ধার তৎপরতাকে জোরদার করা হয়েছিল। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে আইন-শৃংখলা বাহিনী সেই মোবাইলের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়, যে মোবাইল দিয়ে ফরহাদ মজহার তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ট্র্যাকিং করার পর খুলনার কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোডের শিববাড়ি এলাকায় কয়েক ঘণ্টা ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালায় র‌্যাব ও পুলিশ। অন্য এক খবরের ভিত্তিতে খুলনা নিউ মার্কেটেও অভিযান চালানো হয়। সবশেষে তাকে নাকি একটি বিশেষ পরিবহনের ঢাকাগামী গাড়িতে খুঁজে পায় র‌্যাব। সোমবার দিবাগত গভীর রাতে খুলনায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর যশোরের নওয়াপড়ার ভাঙ্গা গেট এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে ঢাকাগামী গাড়িটিকে থামিয়ে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে প্রথমে অভয়নগর থানায় নেয়ার পর সেখান থেকে রাজধানীর আদাবর থানায় হস্তান্তর করেছে র‌্যাব। বলা হয়েছে, তিনি নাকি একাকী ভ্রমণ করছিলেন। তার সঙ্গে একটি ব্যাগে একসেট কাপড় এবং মোবাইল চার্জার থাকার কথাও জানিয়েছেন র‌্যাবের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে ফরহাদ মজহারের মেয়ে বলেছেন, ওই ব্যাগটি তার পিতার নয়। আদাবর থানায় আনার পর অপহৃত বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারকে সাংবাদিক বা অন্য কারো সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি। তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ফরহাদ মজহার তাদের শুধু এটুকুই বলেছেন, বেশির ভাগ সময় তার চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি কাউকে চিনতে পারেননি। কারা তাকে কেন অপহরণ করেছিল সেটাও জানতে পারেননি।
মঙ্গলবার বিকেলে ফরহাদ মজহার সম্পর্কিত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, আদাবর থানা থেকে প্রথমে গোয়েন্দা সদর দফতরে এবং তারপর সেখান থেকে তাকে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছিল। কোর্টে বিচারক তার জবানবন্দী নেয়ার পর ১০ হাজার টাকার মুচলেকায় তাকে মুক্তি দিয়েছেন এবং তিনি তার পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন।
ফরহাদ মজহার জীবিত উদ্ধার হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করার পাশাপাশি তার কথিত অপহরণকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা গভীর উদ্বেগও প্রকাশ করছি। কারণ, তিনি সাধারণ কোনো কবি-সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবী নন, তার রয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্বাস। সে বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি লেখালেখি করেন। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য রাখেন। তার লেখালেখি ও বক্তব্যের খুব সামান্যই বর্তমান সরকারের পক্ষে যায়। বাস্তবে তিনি আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী ভূমিকা পালন করে এসেছেন। সেই সাথে রয়েছে তার ভারতবিরোধী অবস্থানও। অপহরণের আগের দিনও রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভারতে গরুর গোশ্ত খাওয়ার কারণে মুসলিম হত্যার তীব্র বিরোধিতা করে বক্তব্য রেখেছিলেন। সচেতন মহলের অনেকে একেই অপহরণের আশু প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এ বিষয়ে আমরা অবশ্য এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা বরং পুরো বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। আমরা একই সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিরও পুনরাবৃত্তি করি। ফরহাদ মজহার কিংবা তার মতো অন্য কোনো বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে সবাইকে একমত হতে হবে এমন কথা অবশ্যই মনে করি না। ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে, বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে গুম ও গুপ্ত হত্যা বেড়ে গেছে বলেই ফরহাদ মজহারের ব্যাপারে সরকারের দিকে আঙুল তুলেছিলেন বিভিন্ন মহল।
আমরা এমন অবস্থার অবসান ঘটানোর দাবি জানাই। সরকারের উচিত রাজনৈতিক চিন্তা ও বিশ্বাস নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জানমালের হেফাজত করার পদক্ষেপ নেয়া। আর কাউকে যাতে ফরহাদ মজহারের পরিণতি বরণ করতে  না হয় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ফরহাদ মজহারের কথিত অপহরণের ব্যাপারেও তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো সরকারের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ