বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : বাংলাদেশের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বিশাল আকারের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করলেন আওয়ামী সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট। এ বাজেটকে অর্থমন্ত্রী নিজে উচ্চাভিলাসী বললেও বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয় বলে মনে করেন। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ অর্থনীতিবিদদের সার্বিক যে প্রতিক্রিয়া তাতে এর নেতিবাচক দিকই সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে। জাতীয় সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘এ বাজেট লুটপাটের বাজেট’, ‘নিজেদের পকেট ভারী করতেই এ বাজেট’। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ‘এ বাজেট গরিব মারার সর্বশ্রেষ্ঠ বাজেট’। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলেছেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের কারণে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাবে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এই বাজেটে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবু আহমেদ বলেছেন, বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব তেমন কিছু নেই। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘কথামালার বাজেট’ বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের প্রফেসর ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা সুশাসনের সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে বাজেটে কোন নির্দেশনা নেই। বাজেট ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো উচিত। বাংলাদেশের বাজেট অত্যন্ত অস্বচ্ছ। প্রস্তাবিত এই বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের প্রফেসর ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমান বাজেট কতটুকু বিনিয়োগবান্ধবÑ সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগ বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই বাজেট প্রস্তাবে। ব্যবসায়ীরা এই বাজেটকে বিনিয়োগবান্ধব বলছেন না। ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক বাড়ানো অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। মানুষকে ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে দূরে রাখতে প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক আমানতে আবগারি শুল্ক বসানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের প্রফেসর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাবেক গভর্নর বলেন, মদ, গাঁজাসহ কিছু পণ্য রোধকল্পে আবগারি শুল্ক হয়। এবারের বাজেটে ব্যাংকিংয়ে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাজেটের প্রথমে বলা হয়েছে, ‘উন্নয়নের মহাসড়কে, সময় এখন বাংলাদেশের’। উন্নয়নের মহাসড়কে যেতে প্রস্তুতি দরকার। প্রস্তুতি ছাড়াই মহাসড়কে উঠে গেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সাথে কোন মিল নেই। মূল্যস্ফীতি বিষয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সব জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।  এরপরও মূল্যস্ফীতি নাকি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কোথায় জরিপ করছে? কীভাবে করছে? বাজেটের টাকা দেবে গৌরি সেন অর্থাৎ আমজনতা! গতানুগতিক ও গাণিতিক এই বাজেটের ‘রূপকল্প’ ‘রূপগল্পে’ থেকে যাবে। বাজেট বাস্তবায়ন সত্যিই চ্যালেঞ্জ হবে।
বাজেট নিয়ে এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি পত্র-পত্রিকাগুলো বাজেটের যে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতেও এবারের বাজেটের নেতিবাচক দিকটিই বেশি ফুটে উঠেছে। অর্থাৎ বাজেট নিয়ে সরকারে মহল ছাড়া আপামর জনগণ খুশি ও আশাবাদি হতে পারছে না। অবশ্য বাজেট ঘোষণার আগেই অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেট হবে চাপাচাপির বাজেট। চাপাচাপি এবারই করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, বাজেটের টাকা আহরণ ও যোগান দিতে জনগণকে চেপে ধরতে হবে। তাদের পকেট থেকে চাপাচাপি করে টাকা বের করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী এমন এক সময় বাজেট ঘোষণা করলেন যখন গ্যাসের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৯৫০ টাকা হয়ে গেছে। বাজেটেও ঘোষণা দিয়েছেন ইউনিট প্রতি গ্যাসের দাম আরো বাড়বে। বিদ্যুতের দামও বাড়বে। মোটা চালের দাম কেজি প্রতি ৫০ টাকা। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সংকটজনক অবস্থায়। চালের মজুদ সর্বকালের সর্বনিম্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এমন এক অসহনীয় পরিস্থিতিতেই সরকার অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের উপর অতিমাত্রায় করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। এ থেকে কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সাধারণ মানুষের সামনে এক মহাদুর্দিন রয়েছে। দরিদ্র জনগণকে চিড়েচ্যাপ্টা করার যত প্রকারের পন্থা রয়েছে, সরকার সবই অবলম্বন করবে। বাজেটের আকার যে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, তার ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষকে প্রতিপদে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে। দেয়ার মতো টাকা না থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হলে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতেই হবে। এ থেকে জনগণের বাঁচার কোন উপায় নেই। সবচেয়ে বেশি এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শিকার হবে দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ। অথচ আওয়ামী সরকার উঠতে বসতে কথায় কথায় দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে থাকে। দারিদ্র্যলাঞ্ছিত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের আয়ের একটি বিরাট অংশই যদি সরকার ভ্যাটের মাধ্যমে কেটে নিয়ে যায় তাহলে তাদের দারিদ্র্য মোচন হবে কীভাবে? সোজা কথায় বলা যায়, সরকার এবারের বাজেটের মাধ্যমে বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের সঞ্চয় বলতে এখন আর কিছুই থাকবে না। ব্যাংকে টাকা রাখলে সেখানে লাভের পরিবর্তে তাদের লোকসান গুনতে হবে। ১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখলে ৮০০ টাকা আবগারি শুল্ক কাটা হবে, এর পাশাপাশি ব্যাংকের দেয়া মুনাফার উপর শতকরা ১৫ ভাগ হারে কর ও ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ কাটার পর দেখা যাবে ১ লাখ টাকায় লাভ দূরে থাক তা কমে ৯৮-৯৯ হাজার টাকা হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী যে চাপাচাপির বাজেট বলেছেন এ থেকে কারো বুঝতে বাকি নেই তিনি যতভাবে সম্ভব সাধারণ মানুষকে চেপে ধরেছেন। এর মাধ্যমে যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে এ দিকটি তিনি একটুও বিবেচনায় নেননি।
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট অর্থ বিনিয়োগ ও বেকার সমস্যা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের পুরো আমল ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই। এ ব্যাপারে সরকারের তেমন কোন উদ্বেগ আছে বলেও মনে হয় না। থাকলে বিনিয়োগ মন্দা কাটিয়ে উঠার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যেত। এবারের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় পুরোপুুরিই উপেক্ষিত থেকে গেছে। বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ঘুষ-দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব, অবকাঠামো ও সুশাসনের অভাবÑ এসব ব্যাপারে যে ধরনের সংস্কার ও উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বাজেটে তা নেই। এতে দেশে বিনিয়োগের যে ঋণাত্মক পরিস্থিতি চলছে তা অব্যাহতই থেকে যাবে। সরকার এদিকে মোটেও মনোযোগ না দিয়ে কেবল জনগণের পকেট কেটে কীভাবে রাজস্ব আদায় করা যায় সেদিকেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি। জনগণ যাবে কোথায়? প্রতিপদে ভ্যাট-ট্যাক্স তাদের দিতেই হবে। জনগণের পকেটের দিকে আওয়ামী সরকারের এই অপদৃষ্টি বেশ কয়েক বছর ধরেই বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারের বাজেটের মাধ্যমে তা আরো কেবল প্রসারিতই করা হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না বিনিয়োগের সাথে কর্মসংস্থানের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত মিলে কোটি কোটি কর্মক্ষম মানুষ বেকার জীবন যাপন করছে। এর সাথে শিল্প, কলকালখানা বন্ধ হয়ে নতুন বেকারের তালিকা কেবল বেড়েই চলছে। এই কোটি কোটি বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য এবারের বাজেটে তেমন কোন দিক নির্দেশনা নেই। ফলে দেশে আগামীতে বেকার মানুষের সংখ্যা কোথায় দাঁড়াবে তা চিন্তাও করা যায় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কোন স্তরে পৌঁছবে তা এখনই টের পাওয়া যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ১৫ পার্সেন্ট ভ্যাটে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, জিনিসপত্রের উপর ভ্যাট-ট্যাক্স বসবে দাম বাড়বে না- এমন আহাম্মকী কথা বিশ্বের কোন দেশের কোন মানুষ শুনেছে কিনা আমাদের জানা নেই।
আমরা মনে করি, বিশাল অংকের বাজেট ঘোষণা করা সরকারের কোন কৃতিত্বের ব্যাপার নয়। এবারের বাজেট যদি ৮ লাখ কোটি টাকাও ঘোষণা করা হতো তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকতো না। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসে যে কোন অংকের বাজেট ঘোষণা করা যেতেই পারে। মূল বিষয় হচ্ছে, লক্ষ্য অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে কিনা? আমরা দেখে আসছি, কোন বাজেটেরই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয় না এবং কোন বাজেটই তার কাক্সিক্ষত মাত্রায় লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এবারের উচ্চাভিলাসী বাজেটে বাস্তবায়ন নিয়েও বিশ্লেষকদের শংকা রয়েছে। তবে বাজেটে সাধারণ মানুষকে শোষণ করার যেসব বিষয় থাকে, সরকার বিশেষ কৌশলে সেগুলো বাস্তবায়ন করে ছাড়ে। মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলার যত প্রকারের পদক্ষেপ আছে তা নিতে সরকার কখনো দ্বিধা করে না। অপরদিকে বাজেটের আকার বাড়ানোর অর্থ এর আয়ের ক্ষেত্র বাড়ানো। এই আয় বাড়াতে গিয়েই দেশের সাধারণ মানুষের পকেটে এখন সরকারের হাত পড়েছে। বাজেটে আওয়ামী সরকারের উচ্চাভিলাসী মেগা প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিক এসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, আরো ব্যয় করা হবে। অর্থাৎ প্রকল্প মানেই বরাদ্দ এবং বরাদ্দ মানেই অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির দিগন্ত প্রসারিত করা। আবার শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই হয় না, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হয়। সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক বছরের মধ্যে রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলা আদৌ সম্ভব হবে কী? স্বপ্নের ফানুস উড়ানো এক ধরনের প্রবঞ্চনার শামিল। কাজেই অতি উচ্চাভিলাসী হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন যাপনকে এক মহাসংকটে ফেলার বাজেট কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ