শনিবার ২৪ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বিদ্যুৎ আর পানি নিয়ে ভেল্কিবাজি না স্যাবোটাজ

জিবলু রহমান : [তিন]
বর্তমানে অধিকাংশ গভীর নলকূপে জেনারেটর বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে তাৎক্ষণিক জেনারেটর চালিয়ে পানি উঠানোর নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু পাম্পম্যানরা জেনারেটর চালাচ্ছে না। কিন্তু বিল ভাউচারে দেখা যাচ্ছে দিনের অধিকাংশ সময় জেনারেটর চালানোর কথা রয়েছে। এজন্য তারা জ্বালানি তেল খরচের মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করছে।
লোডশেডিং, জেনারেটরের অকার্যকারিতা এবং পানির স্তর নেমে গেলে কখনও কখনও অবশ্য উৎপাদন কমে। তবে বর্তমানে উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি।
রাজধানীতে চাহিদার ৭৮ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ। বাকি ২২ শতাংশ পানি রাজধানীর পাশের বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নিয়ে শোধন করে কিছু কিছু এলাকায় সরবরাহ করা হয়। সায়েদাবাদ-১, সায়েদাবাদ-২ ও চাঁদনীঘাটে তিনটি শোধনাগার এবং ৭৩০টি গভীর নলকূপ দিয়ে মোট চাহিদার পানি উৎপাদন করা হয়।
আজকের ঢাকা মহানগরীর গোড়াপত্তন বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে ১৬০০ শতাব্দীর মোঘল আমলে। নগরীর অভ্যন্তরীণ খালগুলো বেগুনবাড়ী, সেগুনবাগিচা, আরামবাগ, জিরানী, ধোলাই, দেব ধোলাই, কল্যাণপুর, মহাখালী খালসহ শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ব্যবহৃত হতো নৌপথ হিসেবে। উত্তর-পশ্চিমে তুরাগ নদী দিয়ে মালবাহী নৌকা নগরীতে প্রবেশ করে বেগুনবাড়ী-ধোলাইখাল হয়ে বুড়িগঙ্গা দিয়ে বের হতো। নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যম ছিল বিদ্যমান খাল আর পাশ্ববর্তী নদী। অবৈধ খাল দখলের প্রবণতা ছিল না। কলের আবর্তে পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম করা হয় অপরিকল্পিতভাবে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে দেয়া হয়নি গুরুত্ব। ভরাট করা হয়েছে প্রাকৃতিক খাল এবং জলাধার। যত্রতত্র খাল ভরাট করে রাস্তাঘাট, কলকারখানা, বসতবাড়ি নির্মাণে নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হওয়ার উপক্রম। বর্তমান শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী দু’টির পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দূষণের মাত্রা বেড়েছে। তাই শোধন করার ক্ষমতা কমেছে। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পানি উত্তোলনে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলনও কমেছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। যে কারণে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে।
ঢাকা মহানগরীর মিরপুর, লালবাগ, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, মনেশ্বর রোড, গণকটুলি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, শেখেরটেক, বিজলী মহল্লা, ছাপরা মসজিদ, আজিজ মহল্লা, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার এলাকায় পানির তীব্র সংকট চলছে। রাজধানীর শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী, মুগদা, মাদারটেক, মানিকনগর, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী, নয়াপল্টন, রাজারবাগ, শান্তিনগর, মগবাজার, চামেলীবাগ, টিকাটুলি, হাজারীবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, ধানমন্ডি, কলাবাগান, বাড্ডা, কুড়িল, শাহজাদপুর, পুরান ঢাকার গে-ারিয়ার দীননাথ সেন রোড, সতীশ সরকার লেন, মুরগিটোলা, মিরহাজীরবাগ, জুরাইন, পোস্তগোলা, সুরিটোলা, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৫ দিন থেকে প্রায় এক মাস ধরে চলছে তীব্র পানি সংকট।
পানির এমন সংকটের কারণে রাজধানীবাসীর অসন্তোষ বাড়ছে। ঢাকা ওয়াসার কাছে পানি সংকটের সমাধান না পেয়ে প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে বিক্ষোভ, রাস্তা ও পানির পাম্প অবরোধ এবং ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে অনেক এলাকায় দিনে দু’একবার পানি সরবরাহ হলেও তাতে দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকায় পান করা যাচ্ছে না।
এ সুযোগে ওয়াসার একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারী পানি বাণিজ্য শুরু করেছে। এক গাড়ি পানির দাম ৫শ’ টাকা হলেও দেড় হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে কোনো কোনো এলাকায়। পানি না পেয়ে অনেকে মিনারেল বোতলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।অনেকেই গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আসছেন আত্মীয়র বাসা থেকে। হাতিরঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন পুকুর এবং লেকেও গোসল করতে দেখা গেছে অনেককে।
পানির জন্য ওয়াসার স্থানীয় অফিসে গিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। অফিস থেকে বলা হয়, বেশির ভাগ গাড়ি নষ্ট। এই সংকট দেখিয়ে ৫শ’ টাকার এক গাড়ি পানির দাম দেড় হাজার টাকা নেয়া হয়। এছাড়া কখনও বলা হয়, ভিআইপিদের পানি দিতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগে গভীর রাতে এক-দেড় ঘণ্টার জন্য সামান্য সরবরাহ হতো। কিন্তু তিন-চার দিন ধরে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু বাড়িতে দু’দিক থেকে পানির লাইন নেয়া আছে। সেসব বাড়িতেও পানির সংকট আছে।
মূলত ওয়াসা তাদের পানির উৎপাদনটাই প্রচার করে। যদিও উৎপাদিত পানির ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সিস্টেম লস থাকে। এই সিস্টেম লসের পানি বাদ দিলে নগরবাসী প্রতিদিন পানি পাচ্ছে  ১৬২ থেকে ১৬৫ কোটি  লিটার। প্রতিদিন প্রায় ৮০  কোটি লিটার পানি ঘাটতি নিয়ে চলছে ঢাকা ওয়াসা। বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ের কারণে পানির এই ঘাটতি ৯০ কোটি লিটারে গিয়ে ঠেকে। এছাড়া যান্ত্রিক ক্রটির কারণে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি জেনারেটর বন্ধ থাকে। অনেক জেনারেটর পুরাতন হয়ে যাওয়ায় মাঝে মধ্যে কিছু জেনারেটর বিকল হয়ে যায়। ফলে বিশাল পরিমাণ ঘাটতি নিয়েই এখনো ঢাকা ওয়াসা নগরবাসীকে পানি সরবরাহ করছে।
রাজধানী এবং নারায়ণগঞ্জে ৬৭০টি পানি উত্তোলন পাম্প রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের সময় জেনারেটর ব্যবহার করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ জেনারেটর ব্যবহার করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ গেলে এসব চালু করা হয়। কিন্তু তা দিয়ে পানি উঠে না। বের হয় বাতাস। আর এই লোডশেডিংয়ের সময়ে চলা জেনারেটরের তেলের টাকা ভাগ-ভাটোয়ারা হয় ওয়াসার শীর্ষ থেকে নিম্ন কর্মচারী পর্যন্ত। ওয়াসায় এটা নাকি ওপেন সিক্রেট। জেনারেটরে পানি উঠে কি-না এ নিয়ে কোনো তদারকি নেই।
ঢাকা ওয়াসা বক্তব্য হলো, এ মুহূর্তে পানি নিয়ে রাজধানীবাসীর জন্য বাড়তি কোন সুখবর নেই। প্রয়োজনের তুলনায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় জেনারেটরজনিত সমস্যার ফলে পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। এখানে ওয়াসার কিছুই করার নেই। চাহিদা অনেক বেশি থাকায় পানি সংকট কিছুদিন অব্যাহত থাকবে। এ সমস্যা কাঁধে নিয়েই শুষ্ক মওসুমের বাকি সময়টা পার করতে হবে ওয়াসাকে। শুধু তাই নয়, শুষ্ক মওসুমের এ ঘাটতি আগামী ৫ বছর অব্যাহত থাকবে। নতুন প্ল্যান্ট বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় পদ্মা নদীর পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও খিলক্ষেতে মেঘনা নদীর পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন না করা পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর ব্যাপারে আর কোন সুখবর নেই।
পানির সমস্যা মোকাবিলায় আরও তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। সেগুলো হলো-মেঘনা নদীতে ৪৭৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প ফেজ-৩, যা দিয়ে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করা হবে। মেঘনা নদীতে আরও একটি ৫২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ঢাকা পরিবেশ সাসটেইনেবল পানি স.
রবরাহ প্রকল্প’ হাতে নেয়া হয়েছে, যাতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন হবে। পদ্মা নদীতে ৩৫০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা জলাশয় পানি শোধনাগার প্রকল্প ফেজ-১’ যাতে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করা হবে। এসব প্রকল্পের কাজ আগামী ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হবে। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ