সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খুলনা অঞ্চলে সাত বেসরকারি পাটকল বন্ধ ॥ খুঁড়িয়ে চলছে চারটি

খুলনা অফিস : খুলনা অঞ্চলের বেসরকারি ৩০টি পাটকলের মধ্যে ৭টি বন্ধ রয়েছে। আর চারটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বাজারে এসব মিলের শ্রমিকদের পরিবার-পরিজন নিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এসব জুট মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা মজুরী, বেতন ও গ্রাচ্যুইটিসহ বকেয়া পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অনেকেই বেকার অবস্থায় রয়েছে। আর অনেকেই ভিন্ন কাজে যোগদান করেছে। এসব শ্রমিকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বন্ধ পাটকলগুলো চালু এবং বকেয়া পাওনার দাবিতে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এদিকে মিলগুলোর চলমান সমস্যা সমাধানে আজ রবিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বেসরকারি জুট মিল শ্রমিক, মালিক এবং প্রশাসনের ত্রি-পক্ষীয় বৈঠক রয়েছে।
পাট অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পাট সূতা, বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশন সূত্রে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরে বেসরকারি পাটকল রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এ্যাজাক্স জুট মিল, সোনালী জুট মিল, মহসেন জুট মিল, আফিল জুট মিল, জুট স্পিনার্স, সাগর জুট মিল, স্পেশালাইজড (টুয়াইন) জুট মিল, নওয়াপাড়া জুট মিল, গ্লোরি জুট মিল, সালাম জুট মিল, দৌলতপুর জুট টেক্সটাইল, ওয়েব জুট মিল, এফ আর জুট মিল, আইয়ান স্পিনিং, নওয়াপাড়া শিডলু স্পিনিং, ইয়াছিন, আহাদ জুট মিল, আকিজ জুট মিল, সুপার জুট মিল, কাজী শাহনাজ প্রাইভেট জুট মিল, জুট টেক্সটাইল মিল (মন্ডল), ওহাব জুট, মিমু জুট মিল, মুনস্টার জুট মিল, লক্ষণ, এআর জুট মিল ও ট্রানসেশন জুট মিল। এসব জুট মিলের মধ্যে ২০১৩ সালের ২২ জুন খুলনার মহসিন জুট মিল প্রথম দফায় লে-অফ ঘোষণা করে। দীর্ঘ ১৩ মাস ৫ম দফা লে-অফ থাকার পর ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই মহসেন জুট মিলটি বন্ধ ও মিলের ৬৬৭ জন শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করে মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটি স্থায়ী বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের পর শ্রমিক পরিবারগুলোর মাঝে হতাশা নেমে আসে। শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ে। এ মিলে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রায় ১৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
এছাড়া গত ঈদ-উল আযহার আগ থেকে কৌশলে অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে জুট স্পিনার্স। মিলে হুইসেল বাজে, কয়েকজন শ্রমিক হাজিরাও দেয়। পাট নেই, উৎপাদনও বন্ধ। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করতে পারছে না। সর্বশেষ গত এপ্রিল মাসে মিলটির বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের ঈদ বোনাস, ৪০ সপ্তাহের মজুরী ও কর্মচারীদের প্রায় ১৩ মাসের বেতনসহ প্রায় ৬ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। মিলটি বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা অসহায় হয়ে আন্দোলনে নেমেছে। গত শুক্রবারও সমাবেশ করেছে তারা। শুধু মহসেন আর জুট স্পিনার্স মিলই নয়, একে একে বন্ধ রয়েছে এ্যাজাক্স, ট্রানসেশন, শাহ নেওয়াজ, ইয়াছিন জুট ও স্পেশালাইজড জুট মিল। আর আংশিক চালু অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে চারটি পাটকল মিল। এগুলো হচ্ছে সোনালী, আফিল, নওয়াপাড়া ও সাগর। এসব পাটকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরী, গ্রাচ্যুইটি ও বোনাসসহ কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এমন অবস্থায় খুলনা অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আর এমনটা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন। শিল্পাঞ্চলের এসব মিলে চলছে কোন না কোন সমস্যা। আর এই সকল কারনেই এখন রুগ্ন শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ব্যবসা বাণিজ্যে ও চলছে চরম মন্দা।
খুলনা জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, যেসব মিলে মজুরী, বেতনসহ পাওনা নিয়ে জটিলতা চলছে এমন দু-তিনটি মিলের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আজ দুপুরে মিল কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন এবং শ্রমিক নেতাদের মধ্যে বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ বলেন, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ২৭টি বেসরকারি পাটকল রয়েছে। এসব জুট মিলের মধ্যে সাতটি এখন বন্ধ রয়েছে। আর চারটি আংশিকভাবে চালু রয়েছে।
মিলগুলো লাভজনক থাকা সত্ত্বেও মালিকরা মিলগুলো বন্ধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এসব মিলের বিরুদ্ধে জেডিএল ও কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক এর বাস্তবায়নে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় মালিকরা পার পেয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের বেকারত্ব দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ শ্রমিকরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হতে পারে। এ কারনে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে এ অঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সমস্যার বিষয়ে তুলে ধরা হবে।
জুট স্পিনার্স মিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা দীর্ঘদিন মজুরী না পেয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। ফলে বাধ্য হয়ে গত মে মাস থেকে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আজ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সন্তোষজনক সমাধান না হলে আগামী ১৯ জুন সকাল ১০টায় রাজপথে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ২০ জুন সকাল ১০টায় খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে। ওইদিনই পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ