শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঈদের পরই সরকার পতনের আন্দোলন

গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশান ইমানুয়েলস ব্যাংকুট হলে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)-এর আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ঈদের পরে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণার ইংগিত দিয়ে জনগণক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল রোববার এক ইফতার অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপার্সন এই কথা বলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো নীতি নেই, আর্দশ নেই। এরা শুধু লুটপাট করতে জানে। আমরা দেশের মানুষকে বলতে চাই, এই আওয়ামী লীগ থেকে সাবধান হোন, এদেশেকে বাঁচান। সকলে এক হোন, ঐক্যবদ্ধ হোন। প্রয়োজনে রাজপথে অবস্থান নিতে হবে নিজেদের। রাজপথে অবস্থান নেয়ার সময় আসবে ঈদের পর। রাঙ্গুনিয়াতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরের ওপর ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এর সুষ্ঠু বিচার দাবিও করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি জানতে চাই, মহাসচিবের ওপর এই হামলা হলো, তারপরে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। আমাদের লোকজন কিছু না করলেও সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। আমি বলতে চাই, ওদের ধরতে হবে, তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে, জেলে পুরতে হবে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
মহাসচিবের গাড়িবহরে হামলায় ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, আজকের এই হামলার ঘটনায় প্রমাণ হলো দেশে যত সন্ত্রাস, যত বিশৃঙ্খলা, যত অরাজগতা- সব আওয়ামী লীগ করেছে। পাবর্ত্য চট্ট্রগ্রামের ঘটনায় আওয়ামী লীগ তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। সেখানে এই দুযোর্গ বিএনপি বড় দল হিসেবে সেখানে মহাসচিবের নেতৃত্বে একটা টিম গেছে, তারা দেখবে, তাদের সাহায্য করবে। ওখানে রাস্তাঘাট খারাপ ছিলো, আমাদের লোকেরাই ঠিক করে দিয়েছে যাতে আমাদের নেতারা সেখানে যেতে পারেন। কিন্তু সেখানে যেমাত্র বিএনপি গেছে, সেজন্য আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতার ওপরে আক্রম করেছে তা আপনারা দেখেছেন।
এই অবস্থায় বিএনপি যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে অন্য মানুষরা কী করে নিরাপদ থাকবে। যখন তখন মানুষের ওপর হামলা হচ্ছে, কাউকে গ্রেপ্তার করা হয় না। –অভিযোগ করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।
আওয়ামী লীগের অপশাসন ও বাজেটের সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি করারোপের প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা খেতে পারি না, দেশের মানুষ খেতে পারবে না, শুধু ট্যাক্স দিতে হবে, ভ্যাট দিতে হবে, অমুক দিতে হবে, আওয়ামী লীগের মার খেতে হবে, মিথ্যা মামলায়  জেলখানায় বন্দী থাকতে হবে। না হলে এই গুম-খুনের শিকার হতে হবে। এগুলো মানুষ চায় না। জনগণকে বলব, এথেকে নিজেরা বাঁচতে চান, নিজেদের পরিবারের স্বজনদের বাঁচাতে চান এবং দেশটাকে বাঁচাতে চান- তাহলে আসুন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সকল দলকে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে সকলে মিলে যেটা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি হবে, সেই কর্মসূচি দিয়ে আমরা এদেরকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করবো।
 আমি স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, এদেশে নির্বাচন হবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে নয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থেকে এদেশে নির্বাচন হবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে, ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে। আমি দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমি বলতে চাই, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন দিলে সেই নির্বাচনে কেউ অংশ গ্রহণ করবে না, সেই নির্বাচন দেশ হতে দেয়া হবে না।
২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ১১দিনে মাথায় আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘ আওয়ামী লীগ ওইসময় নির্বাচনে এসেও যখন তারা দেখলো তাদের অবস্থা ভালো নয়, তখন তারা সেই নির্বাচন থেকে সরে গেলো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলো। পরে ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সঙ্গে যোগ সাজশে সেখানে এই নির্বাচন বানচাল করে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করে সামরিক শাসন জারির ব্যবস্থা করলো।”
এখন থেকে যে অবস্থা শুরু করেছে তাহলে আওয়ামী লীগের অধীনে কি করে নির্বাচন হবে? সেজন্য আমরা ঈদের পরে পরে সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবো এবং আপনারাও (শরিকরা) যারা আছেন, নিজেরা দেবেন- একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। আওয়ামী লীগ থাকলে তার গু-া বাহিনী থাকবে, তার পেটুয়া বাহিনী থাকবে, যাকে সেখানে বসিয়েছে তারা থাকবে। নির্বাচন কমিশন একটা তাঁবেদার কমিশন যেকোনোভাবে আওয়ামী লীগকে জেতাবার চেষ্টা করবে। অবশ্যই লেভেল  প্লেয়িং ফিল্ড নির্বাচন হতে হবে। তাহলে আওয়ামী লীগের সমর্থন কতটুকু, তাদের পায়ের নিচে কতটুকু মাটি আছে বুঝতে পারবে।
বাজেটের ১৫% ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলেন, আজকে দেশের প্রতিটি মানুষ, রিকসা চালক, শ্রমিক, মুদির দোকানদার থেকে আরম্ভ করে সাধারণ দোকাদার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা আওয়ামী লীগের এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ এবং তাদের এই ভ্যাট, তাদের এই দুর্নীতি, তাদের এই লুটপাট, তাদের এই প্রশাসনে অচলাবস্থায় মানুষ ক্ষুব্ধ।
সমস্ত ব্যাংক তারা লুটপাট করে শেষ করে দিয়েছে। এখন নতুন করে ব্যাসিক ব্যাংকে টাকা দেয়া শুরু করেছে। মানুষের পকেট কেটে, ট্যাক্স ও ভ্যাট বসাবে, বিদ্যুতের দাম বেশি বসাবে, সাধারণ মানুষের ওপর কর বসিয়ে তারা এই ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখবে। এদের কোনো নীতি নেই, এদের কোনো আদর্শ নেই। এরা শুধু লুটপাট ছাড়া কিছু জানে না। ’৭৪ সালে এই করে মানুষকে না খাইয়ে দুর্ভিক্ষ করেছিলো। অথচ তারা নিজেদের সকলে সোনার মুকুট পড়ে একেক জনের বিয়ে হয়েছে-আপনারা তা দেখেছেন। এখন আবার ’৭৪ অবস্থা বিরাজ করবার অবস্থার মতো এসে যাচ্ছে।”
জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান টিআইএম ফজলে রাব্বি চৌধুরী, মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দারসহ জোট নেতাদের নিয়ে ইফতার করেন খালেদা জিয়া।
ইফতারে ২০ দলীয় জোট নেতাদের মধ্যে ছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম, ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট এম এ রকীব, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, জাগপা‘র অধ্যাপিকা রেহানা প্রধান, এনডিপি‘র খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনপিপি‘র ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পিপলস লীগের গরীব নেওয়াজ, ন্যাপ ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, মুসলিম লীগের শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, ডিএল‘র সাইফুদ্দিন মনি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা শেখ মজিবুর রহমান, খেলাফতে ইসলামী মাওলানা আহমেদ আলী কাশেমী, বিজেপির আবদুল মতিন সউদ, কল্যাণ পার্টির শাহিদুর রহমান তামান্না প্রমুখ।
জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএমএম আলম, আহসান হাবিব লিংকন, নবাব আলী আব্বাস খান, আনোয়ারা বেগম, মাওলানা রুহুল আমিন, জাফরুল্লাহ খান চৌধুরী, সেলিম মাস্টার, শফিউদ্দিন ভুঁইয়া, প্রয়াত নেতা কাজী জাফর আহমেদের বড় মেয়ে কাজী জয়া, কেন্দ্রীয় নেতা কাজী মো. ইকবাল, মো. শরিফউদ্দিন, এএসএম শামীম, কাজী ফয়েজ, সোলায়মান শামীম ইফতারে অংশ নেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার, ফরিদা মনি শহিদুল্লাহ প্রমুখও ছিলেন।   
টুইট বার্তা: রাঙ্গুনিয়ায় হামলার ঘটনার পরপর নিজের একাউন্টে এক টুইটার বার্তায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, বিএনপি মহাসচিবের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার নিন্দা জানাবার ভাষা নেই। ১/২ এই হামলা গণতন্ত্র, রাজনীতি, নাগরিক অধিকার ও পরমত সহিষ্ণুতার ওপর হামলা। এর পরিণাম শুভ হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ