বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সুপেয় পানি সংরক্ষণে পর্যটনের ভূমিকা

মোঃ এমদাদুল হক (বাদশা) : মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন এর মহিমান্বিত সৃষ্টি পৃথিবীর ২.৫% ভাগ মাত্র সুপেয় পানি এবং ৯৮.৮% ভাগ বরফ ও ভূ-গর্ভস্থ পানি। ০.৩% ভাগেরও কম পানি আছে নদী, হ্রদ এবং বায়ুমন্ডলে; ক্ষুদ্রতম অংশ (০.০০৩%) জীবদেহ ও উৎপাদিত সামগ্রীতে রয়েছে। উপর্যুক্ত পরিসংখ্যান থেকে জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য পানির ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যায়। জাতিসংঘ বহু বছর ধরেই বিশ্ব ব্যাপী পানীর স্থায়িত্ব পানি সহযোগীতার কথা বলে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় জাতিসঙ্ঘ ২০১৩ সালকে আন্তর্জাতিক পানি-সহযোগীতা বছর হিসেবে ঘোষণা করেছে। “পর্যটন ও পানি সংরক্ষণ আমাদের সাধারণ ভবিষ্যত” (Tourism & Water Protecting our Common Future) শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে ২০১৩ সনে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হয়েছে। বিশ্ব পরিবেশবাদী নেতারা বলেন যে, এই প্রতিপাদ্য পানি নিরাপদ রাখা, সংরক্ষণ ও অক্ষুন্ন রাখাসহ (for preserving, conserving & protecting water) বিশ্বব্যাপী পানির চাহিদানুযায়ী বন্টন এর ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করবে। অস্থিতিশীল/ অপচয়মূলক পানির ব্যবহার (Unsustainable consumption) এবং জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী পানি সম্পদকে হুমকি দিচ্ছে। এ বছর বিশ্ব পর্যটন দিবস পর্যটন শিল্প যাতে পানির বুদ্ধিবৃত্তিক সংরক্ষণ করে তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। জাতিসঙ্ঘের মহা সচিব মি. বান-কি-মুন বলেন, “এই আন্তর্জাতিক পানি সহযোগিতা বছরে পর্যটন শিল্প/প্রতিষ্ঠানসমুহকে পানির ব্যয় হ্রাস ও ব্যবহৃত পানির ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধন (Improve waste management) এবং ব্যক্তি বিশেষের প্রতিও আহবান জানাই যেন তারা ভ্রমণের সময় পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সচেতনতামূলক আচরণ করেন। পানিকে বাঁচানোর অগ্রাধিকার চর্চা করতঃ আমরা আমাদের কাংখিত ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারি।”
বিশ্ব পর্যটন দিবস, ২০১৩ এর কার্যপত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা হয় :
WTD (World Tourism Day) ২০১৩ পানি-সংযোগ বা পানি ব্যবহারের সুবিধার ক্ষেত্রে পর্যটনের ভূমিকাকে ব্যাপকভাবে প্রচারের জন্য একটি অদ্বিতীয় সুযোগ এবং ভবিষ্যতে টেকসই পানির জন্য বিভিন্ন সংস্থার অবদানের ওপর আলকপাত করে। এটি নিম্নলিখিত মূল-বার্তার ক্ষেত্রে অবহিত করা হবে : (ক) পরিষ্কার ও সহজলভ্য সুপেয় পানি হচ্ছে পর্যটনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। (খ) পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপী নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা সীমিত করছে। (গ) পর্যটন পারে এবং করা উচিৎ পরিবেশগতভাবে উন্নত, রাজনৈতিক ও আর্থিক সাপোর্ট দ্বারা সুপেয় পানির উৎস সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে।”
 বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ব পর্যটন দিবস, ২০১৩ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পর্যটন প্রধানত পানির উৎকর্ষতার ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের কারণে বাংলাদেশের পর্যটন সাধারণত কক্সবাজার, সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সুন্দরবন কেন্দ্রিক গড়ে ওঠেছে। কোরাল, কোরাল রিফ, বালুকাময় সমুদ্র সৈকত এবং ম্যানগ্রোভ ফরেস্টই প্রধান আকর্ষণ। এগুলো আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থেও বৈচিত্র্য এনেছে। মনুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য সমুদ্রে নিক্ষেপের ফলে সাগর-মহাসাগর দূষিত হচ্ছে। এর ফলে কখনো কখনও অতিরিক্ত সমুদ্র শৈবাল জন্মে যার ফলে সেখানে কম অক্সিজেন পৌঁছে। পানিতে কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উপকূলীয় পরিবেশের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি :
১) যখন নৌযান চালাবো তখন তার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য বর্জ্য পানিতে ফেলব না, এবং নৌ চলাচলের সময় কোন প্রাকৃতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করব না।
২) যখন কোন রেস্টুরেন্টে যাব তখন কোন অবৈধভাবে ধৃত সীফুড ও অন্যান্য জিনিস পরিত্যাগ করব।
৩) পরিবেশ দূষণ রোধ কল্পে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে সরকারী যানবাহন ব্যবহার করব।
৪) পানি ব্যবহারে আমাদের সতর্ক হতে হবে, পানি খুবই মূল্যবান, প্রতি ফোটা পানিই সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে; এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কম পানি ব্যবহারের ফলে সমুদ্রে কম ময়লা পানি যাবে।
৫) সমুদ্রে ডুবুরীদের দ্বারা ডাইভ করার সময় তাদের দায়িত্বশীল ও জ্ঞান থাকতে হবে যাতে কোন কোরাল রিফ নষ্ট না করে।
৬) গ্লোবাল উষ্ণতা হ্রাস করার জন্য বেশী করে গাছ লাগাতে হবে।
৭) অবৈধ সুভেনির/স্মরণিকা কিনব না এবং উৎসাহ দিব না।
৮) সমুদ্র সৈকতে আমরা কোন আবর্জনা ফেলব না এবং এ কাজে স্থানীয় গ্রুপকে সহযোগিতা করব।
৯) টেকসই পানি নীতিমালা ও স্বচ্ছ পানিবাহিত পর্যটনকে উৎসাহিত করাই হবে আমাদের আদর্শ কার্যক্রম।
পবিত্র কোরআনে পানির সঠিক ব্যবহারের উপর যারপরনাই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গ্রিক দার্শনিক Empedocles বলেছেন ৪টি মৌলিক উপাদানের মধ্যে পানি একটি যাকে  মহা বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
 আসুন আমরা সবাই পানির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করি এবং আগামী প্রজন্মকে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে সক্রিয় হই। আমীন।
লেখক - নদী গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাবেক পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ,
E-mail : emdadulbadsha@yahoo.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ