বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন ও কার্যক্রমের প্রেক্ষাপট!

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : একুশ শতকের সমস্যাসংকুল বিশ্বায়নে বাণিজ্যনীতি একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাণিজ্যনির্ভর অর্থ ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি দেশই আমদানি রফতানি নির্ভর। এ কারণে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজ নিজ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থক্ষুন্নের কারণ ঘটাতে পারে। এ লক্ষ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সুসম্পর্ক স্থাপন ও বাণিজ্যের সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে বিশ্ব বাণিজ্যসংস্থার চুক্তির আলোক অনুন্নত দেশের সুযোগ সুবিধা এবং ইসলামি আইনের সাথে তার সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূলনীতির সাথে ইসলামি আইনের দৃষ্টিকোণের তুলনামূলক ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রবন্ধ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলামী আইনের মূলনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অঙ্গীকার বা চুক্তি সমূহের মধ্যে বৈপরীত্য নেই, বরং ইসলামী আইনকে সামনে রেখে উক্ত চুক্তি পুনর্গঠিত হলে অধিক ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ রাষ্ট্রই বিভিন্ন শক্তিশালী বাণিজ্যিক সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় থেকে তাদের অর্থনীতি বিকশিত করতে ও অর্থনৈতিক নীতিমালা (Condified) একীভূতকরণে আগ্রহী। এ চাহিদার আলোকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) আসিয়ান ইত্যাদি আত্মপ্রকাশ করেছে। এসব সংস্থা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যর মধ্যে একটি অভিন্ন বাজার প্রতিষ্ঠা, শুল্ক এবং আমদানি রফতানির উপর পরিমাণ মত বিধিনিষেধের বিলুপ্তি বহিঃশুল্ক ও মাসুলে অভিন্ন হার চালু, তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ, পণ্য ও পুঁজির বিনামূল্যে পরিবহন সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা অপসারণ ইত্যাদি অন্যতম।
বিশ্ব বাণিজ্যসংস্থা (World Trade organization-WTO) মূলত ১৯৪৭ সারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশর ব্যবসা বাণিজ্যের অভিন্ন নীতিমালা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রণীত শুল্ক ও বাণিজ্য বিষয়ক সাধারণ অঙ্গীকার (General Agreement on Tarfffs and Trade-GATT) এর প্রতিস্থাপিত একটি সংস্থা। জেনেভাভিত্তিক এ সংস্থাটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে কাজ করে, যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৬৪টি। বাংলাদেশ সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে ভূমিকা রেখে আসছে। এই সংস্থার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আলোচনা পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিশ্ব বাণিজ্যিক নীতিমালার নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা ও লেনদেনে বহু পাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে তার মীমাংসা ও নিষ্পত্তিও এ সংস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
WTO ১৯৯৪ সালে এপ্রিল মাসে মরক্কোর রাজধানী বাণিজ্যিক শহর মারাকেশে অনুষ্ঠিত উরুগুয়ে রাউন্ডে অফিসিয়াল সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সংস্থার উদ্দেশ্যাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য অবাধ বাণিজ্য প্রবাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সমর্থন দেয়া অর্থাৎ বাণিজ্য স্বাধীনতায় দৃশ্যমান সব প্রতিবন্ধকতায় অপসারণ। ব্যক্তি, কোম্পানি ও সরকার পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক নিয়মনীতির ব্যাপারে সচেনতা সৃষ্টি এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করা যে, নীতিমালায় কোনো আকস্মিক পরিবর্তন আনা হবে না। অন্যভাবে বলা যায়, এ সংস্থার উদ্দেশ্য হলো, একটি স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল নীতিমালা উপহার দেয়া। WTO এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হলো, বাণিজ্যিক নীতিমালা বিষয়ক আলোচনার জন্য একটি ফোরামের আয়োজন করা।
WTO প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্য ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি করা। সংস্থা কর্তৃক সম্পাদিত বিভিন্ন সহায়ক চুক্তি ও নীতিমালার প্রায়ই ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। এ ব্যাখ্যা সাপেক্ষ নীতিমালা বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষ ও আইনগত স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে WTO ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা WTO ও ভূতপূর্ব GATT বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করেছে। সিদ্ধান্তবলিসহ এর সংখ্যা প্রায় ৬০টি। নিম্নে চুক্তির ধরণ ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চুক্তি তুলে ধরা হলো: ব্যবসা ও শুল্প সংশ্লিষ্ট চুক্তি, নিরাপত্তাভিত্তিক চুক্তি, কৃষিভিত্তিক চুক্তি, পয়ঃনিষ্কাশন সংক্রান্ত চুক্তি, পোশাক শিল্পভিত্তিক চুক্তি, ব্যবসায় বাণিজ্যে কারিগরী প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক চুক্তি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ পরিমাপ সংক্রান্ত চুক্তি, ধারা-৬ (বাজার মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রয় প্রতিরোধ) এর প্রয়োগিক চুক্তি, (শুল্ক হার নির্ধারণ) এর প্রয়োগিক চুক্তি, জাহাজীকরণ পূর্ব পরিদর্শন বিষয়ক চুক্তি, মৌল বিধির উপর চুক্তি, আমদানীর লাইসেন্স প্রক্রিয়ুার উপর চুক্তি, সমকারী ও ভর্তুকিভিত্তিক চুক্তি, পরিসেবামূলক ব্যবসা সংশ্লিষ্ট চুক্তি, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পত্তির স্বত্ব সংক্রান্ত ব্যবসা বিষয়ক চুক্তি, বিরোধ নিষ্পত্তির প্রশাসনিক বিধি প্রক্রিয়া বিষয়কি সমঝোতা চুক্তি, বিশ্ব অর্থনীতির কর্মকৌশল প্রণয়ন বিষয়ক বৃহত্তর সম্মেলনের সিদ্ধান্তবলী, ব্যবসায়িক বিধি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া, বহুপাক্ষিক ব্যবসা চুক্তি, সিভিল এয়ারক্রাফট বিষয়ক বাণিজ্যিক চুক্তি, সরকারি আয় সংক্রান্ত বাণিজ্যিক চুক্তি, আন্তর্জাতিক দুগ্ধ চুক্তি, গবাদি পশুর মাংস চুক্তি।
বিশ্বের অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হওয়া এসব চুক্তি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত। এর ভিত্তিতে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনে মূলনীতি ও মূলনীতির প্রতিফলন ঘটাতে বাধ্য থাকে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় সরকারের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও এর মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য পণ্য ও সেবার উৎপাদক, আমদানি পর্যালোচনার পর বিশ্বের অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়।
WTO এর চুক্তির কর্ম পরিসর ব্যাপকভিত্তিক যেমন, কৃষি, বস্ত্র ও পোশাক ব্যাংকিং টেলিযোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় ক্রয় বিক্রয়, শিল্প মান, খাদ্য স্যানিটেশন প্রবিধান, মেধা সম্পত্তি ইত্যাদি। এসব বাণিজ্যে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কিছু মূলনীতি রয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গৃহিত মূলনীতি ও এর মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহ পর্যালোচনা করলে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যেগুলো ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বাণিজ্যে উৎসাহিত করার অন্যতম মাধ্যম বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা সমূহ হ্রাস করা শুল্ক বা মাসুল, আমদানি রফতানি নিষিদ্ধ বা সীমিতকরণ বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার অন্যতম। ১৯৪৭ সালে গ্যাট সৃষ্টির পর থেকে আটবার বাণিজ্যিক পরিসর বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বহুপাক্ষিক চুক্তির (Multilateral Trade Negotiation-MTN) প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক (কাস্টমস) কমিয়ে আনার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা নিষেধ করা বিষয়ে, যার ফলস্বরূপ ১৯৮০ সালের পরবর্তী সময়ে শিল্প পণ্যের ওপর শুল্কের হার প্রায় ৬.৩ এ নেমে এসেছিল।
অর্থনীতিতে বহুপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে মুক্ত বাণিজ্য যথেষ্ট সহজতর, প্রয়োজন শুধু বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা। পৃথিবীর সব দেশেরই কিছু না কিছু রাষ্ট্রীয় সম্পদ (যেমন, জনশক্তি, বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি) যার ভিত্তিতে উক্ত রাষ্ট্র দেশীয়, এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা রাখে। মুক্ত বাণিজ্যিনীতি পণ্য ও সেবার অবাধ বাণিজ্যের অনুমোদন করে, যাতে স্বল্পমূল্যে সর্বোৎকৃষ্ট পণ্য উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পায়। WTO সদস্য দেশগুলোতে বাণিজ্যিক পরিবর্তনের ধারণা দেয় এবং উন্নয়শীল দেশগুলোতে প্রতিশ্রুত কর্তব্য পালনে যৌক্তিক সময়সীমা বেঁধে দেয়।
এই মূলনীতিটি মূলত (Most- Favoured Nation- MFN) অধিকতর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত দেশ এর প্রবিধান। যা কালোবাজারির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কমে পণ্য বিক্রি করা বা Dumping নীতিকে নিরুৎসাহিতকারী এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করে নিঃশর্ত ও অবাধ বাণিজ্যের জন্য প্রণীত একটি বিধান। আইনী জটিলতা ও বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এ বিধানের লক্ষ্য রাষ্ট্রের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক ও অন্যায্য বাণিজ্য দ্বারা সৃষ্টি ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষতিপূরণ নিশ্চত করা। WTO এর অধিকাংশ চুক্তিরই উদ্দেশ্য ব্যবসা বাণিজ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় সমর্থন দান। এই মূলনীতির নির্দেশনা মতে, সদস্য দেশের ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে বৈষম্য করা যাবে না, সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা সমবণ্টন আবশ্যক। এমনকি দেশী ও বিদেশী পণ্য বা সেবার মধ্যেও বৈষম্য পরিহার করে উভয়ের মধ্যে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দেয়া উচিত।
Dumping এবং Subsidization সংক্রান্ত্র ১৯৪৭ সালের GATT এর বিধানকে WTO আরও সম্প্রসারিত করেছে। তবে এ সংস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক, মাশুল তুলে দেয়ার পরামর্শ প্রদান করলেও ক্ষেত্রবিশেষে স্ববিরোধী রূপ ধারণ করে। কেননা এ পরিসরে পরিস্থিতির আলোকে ও সীমিত আকারে কখনো কখনো শুল্ক ও মাশুল গ্রহণের অনুমোদনও দিয়ে থাকে। এতদসত্ত্বেও এটি অবাধ ও নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার একটি বিস্তৃত প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়াও এটি মেধাস্বত্ব, পরিসেবা কৃষি বাণিজ্য ইত্যাদির প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ বাজারজাতের লক্ষ্যে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করেছে।
ব্যবসা বাণিজ্যে একপক্ষীয় বিশাল খাত থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে অন্যের সাথে চুক্তিভুক্ত হওয়া বা অঙ্গীকার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়, যাতে লেনদেনরত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা জন্মে। বাণিজ্যিক অঙ্গীকার মূলত ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পূর্বানুমান অর্থাৎ অঙ্গীকরকে কেন্দ্র করেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যত পরিকল্পনা বা সুযোগ সুবিধার পরিষ্কার ধারণা পেয়ে থাকে। স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমান বিবেচনায় এনে বিনিয়োগে উৎসাহ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। বহুপাক্ষিক ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, ব্যবসায়িক পরিবেশের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করা। কেননা পূর্বানুমান নির্ভর দেশের বাণিজ্য নীতি যথা সম্ভব স্বচ্ছ ও সুষ্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়।
WTO এর ব্যবস্থাপনায় কোন দেশ পণ্য বা সেবার জন্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করতে সম্মত হলে তারা বাধ্যগত প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। পণ্য সম্পর্কিত এই বাধ্যগত প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে শুল্কের হার নির্ধারিত হয়ে থাকে। তবে কোন দেশ তাদের বাণিজ্যিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য শুধামাত্র আপস মীমাংসার মাধ্যমে বাধ্যগত অঙ্গীকারটি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করতে পারবে। উরুগুয়ে রাউন্ডে বহুপাক্ষিক বাণিজ্যিক আলোচনার অন্যতম দিক ছিল বাধ্যগত অঙ্গীকারের অধীনে বাণিজ্যিক বাজার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান।
WTO সদস্যদের মধ্যে তিন চতুর্থংশেরও অধিক দেশ স্বল্পউন্নত এবং অর্থনীতির বাজারে পরিবর্তনশীল বা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচিত। ২০১৫ সালের WTO কর্তৃক প্রকাশিত এবং ইন্টারনেটে প্রচারিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, তার ১৬৪টি সদস্য রাষ্ট্র থেকে শুধুমাত্র ত্রিশ শতাংশ দেশ উন্নত এবং বাকিগুলো অনুন্নত। উরুগুয়ে রাউন্ডের অষ্টম বছরের ষাট শতাংশের ও অধিক দেশ স্বাধীনভাবেই বাণিজ্য সহজীকরণ কর্মসূচি (Launched in punta del Este in Uruguay) বাস্তবায়নের সপক্ষে। একই সময়ে পূর্ববর্তী রাউন্ডের তুলনায় উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনার মধ্যে উন্নয়শীল দেশগুলো বেশি সক্রিয় ও প্রভাবশালী ছিল। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য মর্মে যে ধারণা প্রচলিত ছিল তার অবসান ঘটে।
WTO এর ব্যবস্থাপনায় স্বল্পউন্নত দেশগুলোকে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় প্রদান এবং সামগ্রিক উন্নয়নে এর সক্রিয় ভূমিকা অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞাদের নিকট সমাদৃত। গ্যাট এর পূর্বেকার চুক্তিগুলোও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্যিক কল্যাণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
উরুগুয়ে রাউন্ড শেষে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য পালনীয় বাধ্যবাধতাসমূহ উন্নয়নশীল দেশগুলোও নিজেদের জন্য গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু কার্যনির্বাহী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে স্বল্প উন্নত দেশগুলোর দরিদ্রতাকে বিবেচনায় এনে দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ প্রদান করা হয়। যাতে সেসব রাষ্ট্র মূলনীতির আলোকে অর্পিত বাধ্যবাধকতার সাথে সময়ের সমন্বয়পূর্বক নীতিমালা বাস্তবায়নে সক্ষমতা লাভ করতে পারে। উক্ত রাউন্ডে আরও একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, শিল্পোন্নত দেশগুলো স্বল্পউন্নত দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি পণ্যের দ্রুততর প্রবেশাধিকার বাস্তবায়নে ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করবে।
এই ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরত্বপূর্ণ দিক হলো, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের মান বজায় রাখা। কোন কিছু আবিষ্কার, উদ্ভাবন, নতুনত্ব আনয়ন, গবেষণা, নকশা, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, রেকর্ডিং, বই, কম্পিউটার সফটওয়্যার ও অনলাইনে সেবার ক্রয় বিক্রয় (তথ্য ও সৃজনশীল সংশ্লিষ্ট) পরীক্ষামূলক বিষয়াদি মেধাস্বত্বের অন্তর্ভুক্ত। উদ্ভাবকগণকে তাদের উদ্ভাবন ও সৃষ্টিকর্মের অপব্যবহার প্রতিরোধে যথাযথ অধিকার দেয়া উচিত, যাতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয়। ব্র্যান্ড নাম বা পণ্য লোগো ট্রেডমার্ক হিসেবে উদ্ভাবন পেটেন্টে নিবন্ধিকরণ ও মেধাস্বত্ব আইনের আওতাভুক্ত। এই চুক্তি দ্বারা কপিরাইট, পরিসেবার বাণিজ্যিক চিহ্ন, ভৌগলিক সুনাম, শিল্প ডিজাইন, পেটেন্ট, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এর ডিজাইন বিন্যাস (topographies) সহ ট্রেডমার্ক ও অপ্রকাশিত তথ্যের গোপানীয়তা সংরক্ষণ করে।
WTO এর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত (Dispute settlement Body-DSB) একটি বহুপাক্ষিক বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র। এর উদ্দেশ্য সদস্য দেশগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্য নিশ্চিত করা ও চুক্তিভুক্ত শর্তসমূহ পুননিরীক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্থ দেশকে অভিযুক্ত দেশ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সাহয়তা দান। এছাড়াও DSB চুক্তির বিধান বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রদান এবং যেসব দেশ বিধি বহির্ভুত কার্যক্রমের সাথে জড়িত তাদের ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।
WTO এর ব্যবস্থাপনায় বিরোধ নিষ্পত্তির সম্পূর্ণ দায়ভার DSB এর উপর ন্যস্ত। এতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী প্যানেল রয়েছে, যা আপীলের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রত্যাখ্যানের বিষয় বিবেচনা করে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে প্যানেলের একক কর্তৃত্ব বা পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে, এ বিষয়ে WTO-এর ব্যবস্থাপনা পূর্বসূরি WATT এর চেয়ে আরো শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বয়ংক্রিয়। DSB এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, এর অকার্যকারিতায় পুরো WTO ব্যবস্থাপনায় ধস নেমে আসতে পারে; একইভাবে তা অন্তঃসারশূণ্য হিসেবেও পরিলক্ষিত হয়।
এ সংস্থার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১৪ সাল পযন্ত গত ২০ বছরে প্রায় ৪৮৮টি দাবি উত্থাপিত হয়েছে, এই বিশাল সংখ্যা হতে আংশিক বিরোধ মীমাংসিত হয়েছে। WTO বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাপনা খুব ব্যয়বহুল, একটি মামলার আপীল পর্যায়ের পরামর্শের ক্ষেত্রে আর্থিক ও মানবিক প্রস্তুতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়, এতে (শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) তিন বছরের একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। নিচের সারণিতে এ বিচার প্রক্রিয়ার সময়সাপেক্ষিকতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। উপরন্তু, স্থানীয় আইনি দক্ষতার অভাবে এই ক্রমবর্ধমান জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ায় বেগ পেতে হয়, যার ফলে বিকল্প না থাকায় অনেক উন্নয়নশীল দেশকেই পেশাদার বিশেষজ্ঞ আইনজীবি নিয়োগ করতে হয়।
বিগত বিরোধ নিষ্পত্তির অভিজ্ঞতা নিম্নের বিষয়াবলি নির্দেশ করে : ১। DSU তে বিশেষাধিকারমূলক বিভিন্ন বিধান এখনও পর্যন্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি ২। এই বিশেষাধিকারমূলক বিধান বিষয়ে কোন বাস্তবায়ন কার্যবিধি না থাকায় উন্নয়নশীল দেশ যে সুযোগ হতে বঞ্চিত হচ্ছে: ৩। বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ সহজতর করার জন্য বিশেষাধিকারমূলক মূলনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমিত উন্নতি সত্ত্বেও বিরোধ নিষ্পত্তিতে উন্নয়ণশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ এখনো উন্নত দেশগুলোর সমান হওয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, WTO বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত উন্নত এবং অনুন্নত দেশের মধ্যে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রদান করতে সক্ষম হয়নি। WTO এর উপরোল্লিখিত মূলনীতি ও চুক্তিগুলোর ব্যাপারে ইসলামী আইনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
ইসলাম পূর্ব আরব উপদ্বীপে মুক্ত ব্যবসা বাণিজ্য ও অবাধে পণ্য বিনিময় ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা কুরাইশে উল্লেখ করা হয়েছে : “নিশ্চয়ই কুরাইশরা অভ্যস্ত ছিল, তারা অভ্যস্থ ছিল শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের প্রতি। অতএব, তাদের এই কাবার রবের ইবাদত করা উচিত, যিনি তাদেরকে ক্ষুধামুক্ত করে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এবং ভীতিমুক্ত করে নিরাপত্তা নিশ্চত করেছেন।”
কুরাইশরা ছিল এক ঐক্যবদ্ধ জাতি, তারা তাদের গতানুগতিক বাণিজ্যের উদ্দেশ্য শীতকালে ইয়ামেনে ও গ্রীষ্মকালে সিরিয়ার নিরাপত্তার বেষ্ঠনীতে সফরে বের হতো আরব বিশ্বের যে অঞ্চলে ব্যবসায়ীরা অবাধে ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধা পেত তা ছিল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা। সে সময় আরবে আদর্শিক ও স্বাধীন বাণিজ্যের ব্যাপক পরিচিতি ও প্রচলন ছিল। কুরআনে অবাদ বাণিজ্যের বিপক্ষে কোন বিধান অবর্তীর্ণ হয়নি, বরং মানবতার সমৃদ্ধির জন্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তাকে আরও উৎসাহিত করা হয়েছে। শুধুমাত্র ঐসব বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদন বা পণ্যের লেনদেন মানবকল্যাণ তথা গোটা সমাজের অর্থব্যবস্থার অন্তর্নিহিত স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। মহান আল্লাহ বলেন : “হে ইমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, কেবলমাত্র তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় (তা বৈধ), আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি দয়ালু।”
তৎকালীন আরব ভূখন্ডে বা কাছাকাছি ভৌগলিক এলাকায় অবাধ ও মুক্ত বাণিজ্যে কোন প্রকার বাধা বা বিধিনিষেধ ছিল না। ইসলাম ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি স্বাধীনতা এবং উদারতার নীতি অনুমোদন করে, স্বয়ং মুহাম্মদ স. এই পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অবাধ ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন সূরা আল জুমুআয় আল্লাহ বলেন : “অতঃপর সালাত শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (অর্থাৎ জীবনোপকরণ) তালাশ করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যেন তোমরা সফলকাম হতে পার।” অর্থ্যাৎ নামায শেষে জীবিকা উপার্জনের জন্য কর্মবব্যস্ত হতে হবে, পাশাপাশি যাবতীয় লেনদেন, ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া বিধিনিষেধ অনুসরণ করলে লাভবান বা সফলকাম হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এখানে আরদ বা জমিন শব্দ দ্বারা নির্দিষ্ট কোন ভূখ-কে বুঝায় না বরং সারা বিশ্বকে বুঝায়।
পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ বিচরণশীল ভূমি ও বাকি তিন চতুর্থাংশ পানি তথা বিশাল সমুদ্র। অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের সিংহভাগ সমুদ্রনির্ভর। এই সমুদ্র সীমাতে ও ব্যবসা বাণিজ্য করার ইসলামের দিক নির্দেশনা রয়েছে। সমুদ্র কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য ও লেনদেনের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন : “দুটি সমুদ্রের জলের বহমান দু ধরণের, কখানো সমান হয় না, একটি মিষ্টি ও তৃষ্ণা নিবারক এবং অন্যটি লোনা, উভয়টি থেকেই তোমরা তাজা গোশত (মাছ) আহার করে থাক, ব্যবহার্য অলংকারাদি আহরণ কর, তুমি তাতে তার বুক ছিরে যানবাহন (সমুদ্রে চলমান জাহাজ) চলতে দেখ, যেন তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।”
ব্যবসা বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। কেননা ইসলাম সামগ্রিকভাবে সমাজের সর্বস্তরে আদল, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। ব্যবসা বাণিজ্যের অংশীদার হিসেবে অন্য ধর্মে বিশ্বাসীকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে না। পাশাপাশি অংশীদারের মধ্যে ব্যবসায়িক কোন দ্বন্দ্ব বা বিরোধ সৃষ্টি করার বা আচরণে বৈষম্য দেখানোর অধিকার ইসলামী মূলনীতি অনুমোদন করে না। মুসলিম ব্যবসায়ীকে অমুলিমদের সঙ্গে কৃত চুক্তি সে রূপেই সম্পাদন করতে হয়। বরং ইসলামী মূলনীতি প্রতিটি চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকার নির্দেশ করে। কোন দল, মত, গোত্র, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, এ ক্ষেত্রে কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। এই বিষয়টি ও কুরআনের অনেক আয়াত ও রাসূল স. এর হাদীস দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যেমন মহান আল্লাহ বলেন : “যদি তোমাদের একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিৎ অন্যের আমানত পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করা।” একই বিষয়ে সূরা নিসাতে ও বলা হয়েছে : “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে কোন বিচার মীমাংসা করবে তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদেরকে সদুপদেশ দান করেন।”
রাসূল স. নিজেও মুশরিক ও অমুসলিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তাঁর পরিচালিত ব্যবসায়িক লেনদেনে অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, ব্যবসায়ী ও পণ্যের প্রতি বৈষম্যহীন ন্যায়সঙ্গত আচরণের ওপর ভিত্তি করেই এ বিষয়ক মূলনীতিসমূহ প্রণীত হয়েছে।
প্রচলিত WTO এর মূলনীতি বৈষম্যহীন অবাধ বাণিজ্য, সুষম ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতমূলক বাণিজ্যের প্রতি উৎসাহিত করে; কিন্তু কখনো সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার নিশ্চয়তা দেয় না। অন্যদিকে শরীয়াহ আইনে ব্যবসায় সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি একাধিপত্য ও ডাম্পিংসহ সামগ্রিকভাবে ক্ষতিকর বিষয়ে প্রতিরোধমূলক কঠোর ব্যবস্থার বিধান আরোপ করে। একাধিপত্য নীতি, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যের প্রতিবন্ধক, যা শরীয়াহ আইনের সাথে সামঞ্জ্যহীন। রাসূল স. এ নীতি নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন : “যারা পণ্য কুক্ষিগত করে রাখে, তারা সীমা লঙ্ঘনকারী।”
Dumping হচ্ছে বাজার দখলের লক্ষ্যে ন্যায্য মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে অবৈধ উপায়ে পণ্য রফতানি, যা অবাধ প্রতিযোগিতামূলক বাজারের প্রতিবন্ধক। যদিও পবিত্র কুরআন ও হাদীসে সরাসরি ডাম্পিং সংক্রান্ত কোন বিধিবিধান নেই, কিন্তু শরীয়াহ মূলনীতির সাধারণ নীতিমালা অনুযায়ী তা অবশ্যই অনৈতিক ও মানব কল্যাণের প্রতিবন্ধক। একদা ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব রা. বাজার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি দেখলেন, এক ব্যবসায়ী নির্ধারিত মূল্যের কম মূল্যে কিশমিশ বিক্রয় করছে। তৎক্ষণাৎ তিনি ব্যবসায়ীকে নির্দেশ দেন, হয়তো পণ্যের দাম বাড়াও, নয়তো বাজার ত্যাগ করো। এই মূলনীতি বা সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কোন সাহাবী, এমনকি অদ্যাবধি কোন ইসলামি চিন্তাবিদ কোন প্রকার আপত্তি করেননি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তির আওতায় ডাম্পিং নিন্দা করা হয় কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়নি।
শরীয়ার মূলনীতি বা বিধানের মধ্যে চুক্তি বা লিখিত দলিলের মাধ্যমে পূর্বানুমান খুবই সুচারুরূপে উল্লেখ রয়েছে। শুল্ক বা মাসুল সংশ্লিষ্ট কোন প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণা, যেটি চুক্তি হিসেবে মর্যাদা পায় না, সেসব প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণার শরীয়াহর আলোকে অঙ্গীকার বা চুক্তির ন্যায় সম্পাদন করার বিধান রয়েছে। ইসলামী আইনের সাথে WTO এর ব্যবস্থাপনার মূলনীতির কোন বৈপরত্যি না থাকলে তা প্রতিপালনে কোন আপত্তি নেই। তাছাড়া অঙ্গীকার পালনে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন : “হে ইমানদারগণ! তোমাদের সকল চুক্তি পূর্ণ করো।” এছাড়া কুরআনের অনেক আয়াতে এ নির্দেশ এসেছে, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অঙ্গীকার রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। তাছাড়া মহনবী স. স্বয়ং ব্যক্তিগত কাজকর্ম ও নসিহতের মাধ্যমে ও অঙ্গীকার সংরক্ষণের গুরুত্বরোপ করেছেন। তিনি বলেন : “যে আমানাতদারি রক্ষা করে না, তার ঈমান নেই। আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, তার কোন ধর্ম নেই। অর্থাৎ একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অঙ্গীকার রক্ষা করা। চুক্তির পর্যায়ে নয় এমন প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণা ও ইসলামী আইনে অবশ্য পালনীয়। যেমন সূরা মুমিনূনে বলা হয়েছে : “এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুশিয়ার থাকে। অর্থাৎ আমানত ও অঙ্গীকরের ব্যাপারে যারা সচেতন তারাই সত্যিকারের মুমিন ও সফলতা লাভ করবে।” একইভাবে সূরা মা’আরিজেরও বলা হয়েছে যে : “এবং যারা আমানাত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে। আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করা মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূল স. এর বাণী ও একই নির্দেশনায় অণুপ্রাণিত করেছে। তিনি বলেন : “ক্রেতা বিক্রেতা (বেচাকোন শেষ করে) যতক্ষণ না তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়, ততক্ষণ তাদের (ভালোমন্দ বিচার করে বেচাকেনা বাতিল করার) ইখতিয়ার থাকে। যদি তারা সত্য কথা বলে এবং বস্তুর বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করে, তবেই এ ক্রয়বিক্রয়ে দুজনকেই কল্যাণ দান করা হয়। পক্ষান্তরে যদি তারা মিথ্যা কথা বলে এবং বস্তুর গুণাগুণ গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়বিক্রয়ের কল্যাণ নষ্ট হয়ে যায়।”
অতএব ব্যবসা বাণিজ্যে অসদুপায় অবলম্বন করলে রহমত ও বরকত দূরীভূত হয়, বিশেষত যখন কোন মিথ্যা বা চুক্তির দ্বারা কোন ব্যবসায়িক পণ্যের তথ্য লুকানো হয়। বিক্রয়ের প্রতারণার ব্যাপারে তিনি আরও বলেন : “যারা আমাদের ধোঁকা দেয় তারা আমাদের কেউ নয়। ধনাঢ্য টালবাহনাকারী ব্যক্তি সম্পর্কে নবী স. আরও স্পষ্টভাবে বলেন : “ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা যুল্ম (চরম অন্যায়)।”
উপরোল্লিখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়, প্রতারণা জালিয়াতি এবং অন্যান্য সকল প্রকার শঠতা শরীয়াহ পরিপন্থি এবং ওয়াদা পূরণ করা অপরিহার্য। কেননা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একজন মুসলিম যেসব বৈষিষ্ট্যের ভিত্তিতে মুনাফিক থেকে পৃথক হয় এটি তার অন্যতম। এ অপরিহার্যতা আরও জোরালো হয়, যদি উক্ত প্রতিশ্রুতি কোন কিছুর সংঘটক হয় এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্তি এর উপর ভিত্তি করে কোন কাজে প্রবেশ করেন। এ ক্ষেত্রে যদি উক্ত ওয়াদা পূরণ করা না হয়, তবে প্রতিশ্রুতি গ্রস্থ হবেন। অথচ ক্ষতিগ্রস্থ করা ও নিজে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া ইসলাম সমর্থন করেনা।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে WTO চুক্তির ব্যবস্থাপনা খাপ খাইয়ে নিতে এবং তাদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময়সীমা বৃদ্ধি করার সাথে ইসলামি আইনের কোন প্রকার বৈপরীত্য নেই, বরং সামঞ্জস্য রয়েছে। এ বিষয়ে রাসূল স. এর কিছু বাণী রয়েছে, যাতে দুর্বলের ঋণের পরিমাণ কমানো বা পাওনা পরিশোধে অক্ষমকে পাওনা পরিশোধ হতে নিস্কৃতি দানে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন হুযাইফা র. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন : তোমাদের পূর্ববর্তী কোনো এক ব্যক্তির রূহের সাথে ফেরেশতারা সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কোনো কাজ করছো? লোকটি জবাব দিলো, আমি আমার কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিতাম যে, তারা যেন সচ্ছল ব্যক্তিকে (যদি সে ঋণগ্রস্থ হয়) অবকাশ দেয়, (এমনকি সে অব্যাহতি চাইলেও) অব্যাহতি দেয়। রাবী হুযাইফা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন, এ কথা শুনে ফেরেশতারাও তাকে অব্যাহতি দিলেন।
এ মূলনীতি অসচ্ছলদের প্রতি সহযোগিতার উৎসাহ দেয়, যাতে তারা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়। অতএব WTO কর্তৃক অনুন্নত দেশগুলোর জন্য চুক্তির বাধ্যবাধকতা পূরণে নমনীয় আইন প্রণয়নের সাথে ইসলামী মূলনীতি একমত পোষণ করে।
ট্রিপস (TRIPS) চুক্তি দ্বারা বিভিন্ন ধরণের মেধাস্বত্ব সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির বিভিন্ন ধরণের সুরক্ষা শরীয়াহ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা প্রশ্নে সমকালীন আলিমগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ১৫ ইং ডিসেম্বর কুয়েতে ইসলামী জুরিস্টস কাউন্সিল এর পঞ্চম সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, উদ্ভাবক বা স্বত্বাধীকারীদের সৃষ্টিকর্ম যথাযথ মূল্যায়নের লক্ষ্যে এ অধিকারসমূহের শরিয়াহ নীতি অনুসারে সংরক্ষিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আলিমদের সংস্থায় কম্পিউটার সংক্রান্ত এক প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, তা মূল প্রবর্তকের সম্মতি ছাড়া কপি, লেখা, বা বিক্রয় করা যাবে কিনা? শেখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল জীবরীন তার জারিকৃত ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন, শরীয়ার আইন অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইসলামিক ল রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার প্রকাশিত ইসলামি আইন ও বিচার গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলিমগণের মতামত উল্লেখ পূর্বক এ সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে যে, মেধাস্বত্ব এক ধরণের সম্পদ। একজন সৃজনশীল ব্যক্তি তার মেধা ব্যয় করে এ সম্পদ অর্জন করেন। অতএব, এর মালিকানা পাওয়ার অধিকার তারই। কেননা এ জাতীয় নিরেট স্বত্ব ফিকহী পরিভাষায় ব্যবহৃত মাল এর পর্যায়ভুক্ত।
ইসলামি মূলনীতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে একটি পরিস্কার রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে। এ আইনে প্রথমত বিরোধ সৃষ্টির যাবতীয় উপায় রুদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, কোনো কারণে বিরোধ সৃষ্টি হলে তার ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির দিক নিম্নরূপ: কোনো ব্যক্তি, জাতি বা রাষ্ট্রের পক্ষে অন্যায় সাক্ষ্য প্রদান বা ফয়সালা নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন : “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দ্যশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কক্ষণো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্র্তী। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুব অবগত।”
সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের বিপক্ষে হলেও তাতে স্থির থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দান করো, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয় স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবু। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, (এটা কখনো দেখবে না, কেননা), তাদের উভয়ের চেয়ে আল্লাহর অধিকার অনেক বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে যেয়ে রিপুর (মনের ইচ্ছার) কামনা বাসনার অনুসরণ করো না। যদি তোমরা ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কেটে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত।
উভয় পক্ষের সমঝোতাই উত্তম পদ্ধতি হিসেবে গণ্য। যেমন ইরশাদ করা হয়েছে : সন্ধি বা সমঝোতাই উত্তম শরীয়াহ আইনের দৃষ্টিতে বিচার দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করাই স্বাভাবিক অবস্থা বা সাধারণ নীতি। বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া একটি বিকল্প ব্যবস্থা মাত্র। শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া বিচারকার্য বিলম্বিত করা বিচারকের জন্য অনুমোদিত নয়। পূর্বসূরি আলিমগণ, বিশেষত যারা ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থা বিষয়ক গ্রন্থাদি রচনা করেছেন বা বিচারব্যবস্থার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা বিলম্বিত বিচারের ক্ষেত্র নির্ধারণ করেছেন এবং এ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইসলামি আইনে দ্রুত বিচারই কাম্য।
রাসূল স. এর হাদীস ও তার জীবনী হতে দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে সমতার বিধান সংশ্লিষ্ট প্রচুর ঘটনা বিদ্যমান। সাইয়িদুনা উমার রা. বিচারপতি আবু মুসা আল আশআরী রা. এর কাছে বিচার সংক্রান্ত কিছু উপদেশ সম্বলিত একটি ঐতিহাসিক পত্র প্রেরণ করেছিলেন যাতে, উল্লেখ ছিল, বিচারপ্রার্থীরা আপনার উপস্থিতিতে এবং সামনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবে, যাতে একটি সুবিধাভোগী বিচারপ্রার্থী আপনার সরলতা ও অসচেতনতার সুযোগে তার পক্ষে প্ররোচিত করতে না পারে, বা কোন হীন দরিদ্র লোক যেন তার অমঙ্গলের জন্য আপনার অবিচারকে ভয় না করে। অর্থাৎ বিচার মীমাংসা হবে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে, যাতে কোন পক্ষ তার অপর পক্ষের অনুপস্থিতিতে বিচারকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে না পারে। একইভাবে এমন আচরণ না করা, যার ফলে বিচার প্রার্থীরা বিচার প্রার্থনায় অনীহা পোষণ করতে পারে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা থেকে আলোচিত সাতটি মৌলিক নীতির সাথে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামি আইনের দৃশ্যমান কোনো বিরোধ নেই। তবে প্রয়োগিক ক্ষেত্র ও গৌণ বিষয়ে বিরোধ থাকা অস্বাভাবিক কাজ। উপরন্ত, মানব রচিত আইন হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মূলনীতিতে অপূর্ণতা এবং আল্লাহ প্রদত্ত আইন হিসেবে শরীয়াহর মূলনীতির পূর্ণতা স্বীকৃত।
অতএব প্রমাণিত হলো যে, WTO চুক্তির অন্তর্ভুক্ত মূলনীতি ও অঙ্গীকারসমূহ শরীআহ মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মূলনীতির আলোকে প্রণীত বিধিবিধান ও প্রয়োগ করা হচ্ছে না বিভিন্ন সমস্যার অজুহাতে, মূলত এর বিধি বিধান বাস্তবায়নের রয়েছে সদিচ্ছার অভাব। প্রণীত বিধান কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় পূর্ববর্তী সংস্থা GATT এর মতো WTO অকার্যকর হয়ে পড়বে। উন্নয়নশীল দেশসহ সকল সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর মূলনীতির আলোকে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাপনায় বিধি প্রণয়ন ইসলামী মূলনীতি অনুমোদন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ