শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বিষ্টি মালার ছাতা মাথায় বর্ষা এলোরে

শরীফ আবদুল গোফরান : মাথার উপরে বিশাল আকাশ। সুনীল আকাশ। সূর্য ঐ আকাশ জুড়ে। কী সুন্দর কিরণ! বাতাস বইছে। দখিণা বাতাস। ফুরফুরে বাতাস। ঝরঝরে পথঘাট। আনমনা কিশোরের মন। রাতভর বৃষ্টি ছিল। সকালে বৃষ্টি। থেমেছে বেশক্ষণ। কদম ফুলগুলো হাসছে। মনকাড়া হাসি। রজনীগন্ধার কী মিষ্টি গন্ধ। আউশের ক্ষেতে নেমেছে চাষী। কাটছে মুঠি মুঠি ধান। বাঁধছে আটি। আটি মাথায় ছুটছে কিশোর। ছুটছে বালক। দুষ্টু বালক। হাঁসগুলো ছুটছে জোরে। সাঁতার কাটছে। টুইটুম্বর পুকুরে।কিন্তু একি! ব্যাঙেরা আবার ডাকছে যে! সূর্য্যি কোথায় গেল? কোথায় আলো? সব যে আঁধার। আকাশ আঁধার। আকাশে জমেছে মেঘ। ভাঁজে ভাঁজে। পুঞ্জে পুঞ্জে। উড়ু উড়ু মেঘ। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। দল বাঁধা মেঘ। মেঘের কত রঙ। সাদা মেঘ, সবুজ মেঘ, ধূসর মেঘ, হিঙ্গুল মেঘ, সিঁদুরে ঊর্না মেঘ, হাঁড়িয়া মেঘ, হিঙ্গলে মেঘ, কুণ্ডল মেঘ, অলক মেঘ, কোদালে-কুড়লে মেঘ, জলুয়া মেঘ, ফজ্জল মেঘ, রাঙা মেঘ, এমনি কত মেঘ। কত রূপ কত রঙ, কত নাম। মেঘের খেলা জমে উঠে আকাশে। মেঘ ঢেকে দেয় আকাশ। স্থির থাকে না মেঘ। ছুটতে থাকে ফের। দল ভেঙে যায়। গলতে থাকে। ঝরতে থাকে। বৃষ্টি হয়। নামে বৃষ্টি। মেঘের পাহাড় ভেঙে। সুনীল আকাশ ছেয়ে। বাতাসের ঢেউ বেয়ে। আষাঢ়ের গান গেয়ে বর্ষার গল্প বলে।
ঝরে বৃষ্টি। টুপটুপ, ঝর ঝর। ঝুপ, ঝুপ। বিরাম নেই। ঝরছে তো ঝরছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। গর্জে উঠে আকাশ। বাতাস ছুটে পাগল হয়ে। শোঁ শোঁ আওয়াজ তোলে। থামবার নামও নেই। থেমে যায় আবার। কত মেজাজ বৃষ্টির। এখানে আছে তো ওখানে নেই। এ গ্রামে আছে তো ও গ্রামে নেই। নদীর এ তীরে আছে তো ও তীরে নেই। আবার নামে তেপান্তরের মাঠ জুড়ে। কত সুর বৃষ্টির। গানের সুরে নামে কখনো। হৃদয় আকুল করে। গর্জে উঠে কখনো। ভয় জাগায় মনে। সবচেয়ে মজা, রোদমাখা খেঁকশিয়ালের বিয়ের বৃষ্টি।
বৃষ্টির কত রূপ আমাদের এদেশে। বর্ষার কত সাজ। বৃষ্টি আর বর্ষাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে কত গল্প। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
‘মনে পড়ে ছোটবেলায় শুনেছিলাম গান
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদে এল বান’
বর্ষার আরো অনেক গল্প আছে। প্রাচীনকালের সাহিত্যেও ছিল বর্ষার মেঘের গল্প। কালিদাসের ‘মেঘদূতে’ও আছে গল্প। এক রাজা একজন লোককে শাস্তি দিয়েছেন। সেকেলে শাস্তি। জেল খাটতে হবে না, মারও খেতে হবে না। তাকে ছাড়তে হবে ঘর-বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন। যেতে হবে জঙ্গলে। মানে বনবাসে। ভালোই তো হলো। বনে কি আর খাবারের অভাব আছে? কত ফলমূল সেখানে, যা একটু হিংস্র পশুর ভয়। লোকটি ঠিক ঠিক গেল জঙ্গলে। সে টেরই পেলো না, কিভাবে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। একদিন দু’দিন করে দশমাস হয়ে গেল। আর মাত্র দুটি মাস। দু’মাস পরই সে জঙ্গল ছেড়ে যাবে। ফিরে যাবে মুক্ত জীবনে। ফিরে যাবে বাড়িতে। নিজের ঘরে। কে জানতে, সময়ই ঘটবে ঘটনাটা, রোজ বিকেলে আকাশটা কেমন হয়ে যায়। মুখ গোমড়া করে। মেঘ জমে আকাশে কালো কালো মেঘ। মেঘের বুক চিরে নামে বিদ্যুতের ঝলক। বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ। দিনরাত বৃষ্টি ঝরে। যেন পৃথিবীটা পানিতে ডুবিয়ে দেবে। লোকটা আর স্থির থাকতে পারে না। বুকের ভেতর শুরু হয় ওলটপালট। হু হু করে কেঁদে ওঠে মন। ব্যথা- বেদনায় নীল হয়ে যায় সে। ছুটে যেতে চায় জঙ্গল ছেড়ে। মানুষের ভিড়ে যেতে চায়। জনকোলাহলে মিশতে চায়। কিন্তু উপায় যে নেই। যাবে কি করে? সে যে শাস্তি ভোগ করছে। তার শাস্তি যে আরো দু’মাস আছে। তাকে যে আরো দু’মাস থাকতে হবে বনে। ভাবতে ভাবতে এক কাণ্ড করে বসে সে। একেবারে পাগলের কাণ্ড। সে মেঘকে ভাই ভাবে। আপনজন বলে, আকুতি-মিনতি করে। অনুরোধ করে। কাছে ডাকে মেঘকে। বলে, ভাই কত জায়গায় না তুমি উড়ে উড়ে যাও। কতজনের কত উপকার করো একবার শুধু আমার উপকার করো। তোমার পায়ে ধরি ভাই, তুমি শুধু একবার আমার বাড়িতে গিয়ে বলো যে- আমি ভালো আছি। বেশ ভালো। কেউ যেন একটুও চিন্তা না করে। আর ক’দিন এই তো দু’মাস পরেই আমি বাড়ি ফিরে যাবো। এটুকু কথা বলে এসো না ভাই।
কী দারুণ গল্প। বৃষ্টিকে নিয়ে এতো অবাক করা গল্প বোধ হয় দুনিয়ার আর কোথাও নেই। থাকবে কি করে! দুনিয়ার আর কোথাও এমন রূপের বর্ষাও হয়তো নেই।
বর্ষা এ দেশের মানুষের জীবনের সাথে মিশে আছে। ষড় ঋতুর উল্লেখযোগ্য ঋতু বর্ষা। গ্রীষ্ম আর শরতের কিছু অংশও দখল করে নেয় বর্ষা। আষাঢ় আর শ্রাবণের বর্ষার দু’মাসে প্রকৃতির মধুর রূপ আবার দুখেরও কারণ হয়। ঝড় হলে, ঘূর্ণিঝড় হলে, বন্যা হলে নামে ভীষণ দুঃখ। তবুও সবুজের এ দেশে বর্ষা না হলে চলে না। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদের খরতাপে অতিষ্ঠ জীবন স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে বর্ষার, বৃষ্টির প্রয়োজন অনিবার্য।
বর্ষা, বৃষ্টিকে নিয়ে এ দেশের কত কবি লিখেছেন কত কবিতা। কি মিষ্টি সেসব কবিতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন :
“বাদলের ধারা ঝরে ঝরো-ঝরো
আউশের ক্ষেত জলে ভরো ভরো,
কালি মাখা মেঘে ওপারে আঁধার
ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে”

ফররুখ আহমদ লিখেছেন :
‘বৃষ্টি এলো কাশ বনে
জাগলো সাড়া ঘাস বনে
বকের সারি কোথায় রে
লুকিয়ে গেলো বাঁশ বনে।’
যেমন অনেক কবিতায় বাংলার বর্ষার রূপ তুলে ধরেছেন প্রকৃতি প্রেমিক কবিরা। বর্ষায় বাংলার মাঠঘাট ডুবে যায়। পুকুর, ডোবা, নদী-নালা, খাল-বিল সবই পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায়। পানিতে ভাসমান গ্রামের বাড়িগুলোকে দেখে মনে হয় বুঝি এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ডিঙি নৌকায়, কলার ভেলায় চড়ে মানুষ এ বাড়ি ও বাড়ি যায়। দৃশ্যটি বেশ উপভোগের।
বৃষ্টি ভেজা কাদা কাদা পথ দিয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে না। মন ভারি হয়ে যায়। তখনি নাকে এসে লাগে ফুলের সুবাস। বর্ষায় কত ফুল ফোটে। কদম, কেয়া, পদ্ম, শাপলা, রজনীগন্ধা, হাস্নাহেনা, হিজল, কলাবতী, চালতা, কলমিলতা, নীলকমল, উলট চণ্ডাল, দোলনচাঁপা, সুলতানচাঁপা, কাঁঠালচাঁপা, কচুরিপানা, এমন নানা নামের বিচিত্র ফুল। আম, কাঁঠালের মধুর গন্ধ তখনো হারিয়ে যায় না। ডাহুকী, শালিক, কাক, কোকিল, হরেক পাখির কিচির মিচির ডাকে প্রকৃতি মেতে ওঠে এ বর্ষায়। হাজার রূপে বর্ষার রূপের কথা বলে শেষ করা যায় না। শহরের বস্তিবাসী আর গ্রামের গরীব মানুষের জীবনে যে বর্ষা আসে, বর্ষার সে রূপও এড়িয়ে যাবার নয়। আনন্দ-বেদনার কত দিক বর্ষা, বৃষ্টির। তবুও বর্ষা আসে বারবার। বছর ঘুরে। আবহমান কাল ধরে আসে বর্ষা। বর্ষার আগমনে আমরা আনন্দ গেয়ে উঠি-
‘বৃষ্টি মালার ছাতা মাথায় বর্ষা এলোরে
সারা গাঁয়ে গোলাপ পানি ছিটিয়ে দিলোরে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ