বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

খাদ্যপণ্য ঘাটতি প্রসঙ্গ

দৈনিক সংগ্রামের খুলনা অফিস জানিয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ কৃষকই জমিতে কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে অজ্ঞ। সরকারিভাবে উপজেলা পর্যায়ে কীটনাশক ব্যবহারের ওপর কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেবার কথা থাকলেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলায় উন্নয়নমুখি প্রকল্পের ওপর যখন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তখন কীটনাশক ব্যবহারের সাদামাটা ধারণা দেয়া হয় মাত্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশের ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কৃষি সেক্টরকে গতিশীল করতে সরকার অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নত পদ্ধতিতে অধিক ফসল উৎপাদনের দিক বিবেচনা করে সরকার উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরুও করে দিয়েছেন। পাশাপাশি মানবদেহে ঝুঁকি এড়াতে জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাসে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি অধিদফতর। তাই কীটনাশকের ব্যবহার কমছে বলে দাবি করেছেন কৃষি অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা অধিকাংশই কৃষি অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য কাউকে পাওয়া যায় না। উপজেলা ও ইউপিতেও সময়মত সভা হয় না। কৃষকদের ডাকা হয় না। প্রশিক্ষণতো দূরের কথা। কীটনাশক প্রয়োগের কোনও ধারণাই নেই তাদের। ফলে সনাতন পদ্ধতিতেই চলছে চাষাবাদ। তাই ফসলের কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়াতো যায়ই না, কখনও কখনও তা হ্রাসও পাচ্ছে। শুধু খুলনা অঞ্চলেই কৃষির এমন দুরবস্থা তা কিন্তু  নয়। বলা চলে সারাদেশেই একই হাল কৃষক ও কৃষির। কাজেই কৃষকদের আগে কৃষিতে উপযুক্ত ট্রেনিং দেয়া দরকার।
কীটনাশকেরই প্রয়োগপদ্ধতি কৃষকরা অনবহিত এমন নন। সঠিক জমিচাষ, বীজনির্বাচন, বপন ও রোপণ সম্পর্কেও অনেকের ধারণা কম। সারপ্রয়োগের নিয়মও অনেক কৃষকের অজানা। তাহলে সঠিক উৎপাদন পাওয়া কীভাবে সম্ভব? আমাদের দেশে ধান, গম, ভুট্টা, বিভিন্ন ধরনের ডাল, সর্ষে প্রভৃতির উৎপাদন অনেক কম। সঠিক চাষপদ্ধতি, বালাইনাশক প্রয়োগের নিয়ম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হলে কৃষকরা ভালো করবেন তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এ খাতে সরকারের ব্যয় কম হয় তাও না। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা ও তদারকির অভাবে আমাদের কৃষিখাত অনেক পিছিয়ে পড়ছে। সরকারি তরফ থেকে এতোদিন বলা হয়েছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার কথা। এবার কিন্তু ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই দেশের কৃষিপরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। শুধু চাল নয়, আগামিতে বিপুল পরিমাণ গমও আমদানি করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে। কৃষি উন্নয়ন এবং এ বিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্পের নামে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থও ব্যয় হয় প্রতিবছর। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রের কিছু উন্নয়ন হলেও আশানুরূপ হয়েছে তা বলা যায় না। এক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি তাও নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি, অযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক তোষামদি বিভিন্ন সেক্টরের মতো কৃষি সেক্টরেও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। কেউ কাউকে মানতে চান না। যে যার ইচ্ছেমাফিক চলেন। অনেকে আসল কাজ বাদ দিয়ে নেতাদের পেছনে ছোটেন এমন অভিযোগও শোনা যায়। কৃষি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিরও সঠিক ব্যবহার হয় না। অন্যদিকে আমাদের কৃষিতে প্রয়োগযোগ্য নয় এমন উপকরণও আমদানি করে ফসলের ক্ষতি করা হয় বলে বহুদিনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বীজ, সার, কীটনাশক উল্লেখযোগ্য। দেশি অনেক কোম্পানি এমন কীটনাশক সরাসরি সরবরাহ করে যেগুলোর কর্তৃপক্ষীয় অনুমোদন নেই। এগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতিও জানা নেই কৃষকের। কিন্তু জমিতে বা ক্ষেতে তা দিব্যি ব্যবহার হচ্ছে। অথচ এমনটি হবার কথা নয়।
দেশের কৃষিখাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জমি আমাদের অতীব প্রয়োজনীয় সম্পদ। এর ওপর নির্ভর করে আমাদের অস্তিত্ব। জমির মান ও ঊর্বরতা শক্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। এব্যাপারে কৃষিবিজ্ঞানীদের যেমন  দায়িত্ব অনেক, তেমনই ক্ষমতাসীনদেরও করণীয় বহু। কয়েক বছর থেকে ব্লাস্টরোগে আক্রান্ত হয়ে ধান, গম জমিতেই বিনষ্ট হচ্ছে। ফসল পুড়িয়ে ফেলা ছাড়া কোনও কার্যকর পরামর্শ দিতে পারেন না সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামিতে নির্ঘাত খাদ্যঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবার আগেই সতর্কতা অবলম্বন না করলে বড় ধরণের খেসারত দিতে হতে পারে। আমরা মনে করি দেশে উৎপন্ন খাদ্যপণ্যের ঘাটতি ইতোমধ্যে প্রকট হতে চলেছে। প্রতিদিন ধান-চালের দাম বাড়ছে। গমসহ অন্য সহযোগী ফসল ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদির মূল্যও আকাশছোঁয়া। বলা বাহুল্য, খাদ্যপণ্যের মওজুদ পরিস্থিতিতে অশনি সংকেত স্পষ্ট হতে চলেছে। এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ