বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সবাই শনাক্ত নাও হতে পারে

* নিহতের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে
১৬ জুন, বিবিসি/এএফপি : যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের কেনসিংটনে ভয়াবহ আগুনে মৃতের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই আগুনে নিহত সব ব্যক্তিকে কখনোই শনাক্ত করা সম্ভব না-ও হতে পারে বলে সতর্ক করেছে পুলিশ।
আগুনে কার্যত কয়লা হয়ে যাওয়া গ্রেনফেল টাওয়ার নামের ওই ২৪তলা আবাসিক ভবনে তৃতীয় দিনের মতো তল্লাশি চালাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
যদিও ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভবনের ভেতরে আর কেউ জীবিত আছে বলে তাদের মনে হয় না। কাউকে জীবিত পাওয়ার আশা তারা করছে না।
গত মঙ্গলবার রাতের এই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৭ ব্যক্তির নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রাণহানির সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষের তৎপরতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক অব্যাহত আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনার পূর্ণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
পুলিশ জানায়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তারা ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে।
আগুনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনকে সাময়িকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের কমান্ডার স্টুয়ার্ট কান্ডি বলেছেন, ‘দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, আমরা নিহত সবাইকে শনাক্ত করতে সক্ষম না-ও হতে পারি।’
নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাণহানি তিন সংখ্যায় পৌঁছাবে না বলেই আশা করছেন তিনি। ৬০০-৮০০ লোকের আবাস গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুন লাগে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত একটার দিকে। ভবনটিতে অন্তত ১২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস বলেছে, আগুন লাগার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভবনের বেশ কিছুসংখ্যক বাসিন্দা নিখোঁজ ছিলেন।
অন্যদিকে লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ার ভবনে বৃষ্টি প্রতিরোধী যে প্রলেপ বা ক্ল্যাডিং ব্যবহার করা হয়েছিল তা যুক্তরাষ্ট্র আগেই বাজেয়াপ্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ভবনে এ ধরনের ক্ল্যাডিং ব্যবহার নিষিদ্ধ।
আগুনের ভয়াবহতা দেখে ভবনটির নির্মাণের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটি নির্মানে কোন কোন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোতে কী ত্রুটি রয়েছে, কেনইবা আগুন ছড়িয়ে পড়ল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের মে মাসে ভবনটির সংস্কার করার সময় এর বাইরে অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল ব্যবহার করা হয়। অগ্নি নিরাপত্তাজনিত কারণে ৪০ ফুটের বেশি উঁচু ভবনে ওই প্রলেপ ব্যবহার করা যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ।
ধারণা করা হয়, গ্রেনফেল টাওয়ার ভবনে যে প্যানেল ব্যবহারি করা হয়েছিল তা মার্কিন কোম্পানি রেইনোবন্ড-এর তৈরি করা। এ রেইনোবন্ড কোম্পানি তিন ধরনের প্যানেল তৈরি করে থাকে। এর মধ্যে একটি দাহ্য প্লাস্টিক কোর আর দুটি আগুন প্রতিরোধী কোর। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রেনফেলের ভবনে অপেক্ষাকৃত সস্তা ও অনেক বেশি দাহ্য পলিথিলিন কোর ব্যবহার করেছেন ঠিকাদাররা।
মার্কিন কোম্পানি রেইনোবন্ডের এক সেলসম্যান দ্য টাইমসকে বলেন, গ্রেনফেল টাওয়ারে যে ধরনের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের উঁচু ভবনে ব্যবহার নিষিদ্ধ। এর কারণ, ‘এতে আগুন ও ধোঁয়া ছড়ায়’।
তিনি জানান, পলিথিলিন কোর (পিই ভার্সন) সাধারণত ছোটখাটো বাণিজ্যিক ভবন এবং পেট্রোল স্টেশনগুলোতে ব্যবহার করা হয়। উঁচু টাওয়ার কিংবা হাসপাতালের মতো বড় বড় ভবনে এ কোর ব্যবহার করা হয় না। ওই সেলসম্যান আরও বলেন, ‘এফআর হলো অগ্নি প্রতিরোধক প্রলেপ, আর পিই কেবলই প্লাস্টিক।’
ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, খবরটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রেইনোবন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত সাড়া পাওয়া যায়নি।
কোনও ভবনে প্রতি বর্গমিটারে অগ্নি প্রতিরোধী প্যানেল ব্যবহারে খরচ পড়ে ২৪ পাউন্ড। দাহ্য কোরের চেয়ে এক্ষেত্রে ২ পাউন্ড বেশি খরচ হয়। গ্রেনফেল টাওয়ারের ২০০০ মিটারের অগ্নি প্রতিরোধী প্রলেপ দিতে নির্মাতাদের দাহ্য কোরের তুলনায় ৫ হাজার পাউন্ড বেশি খরচ হতো।
গ্রেনফেল টাওয়ারে জিংকের রেইন স্ক্রিন ক্ল্যাডিং ব্যবহার করা হয়েছিলো। ক্ল্যাডিং সাধারণত কাঠ, প্লাস্টিক কিংবা মেটাল দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি পানি বা বাষ্প বের হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। এতে করে বৃষ্টির পানি দেয়ালে প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়া নিচের প্রলেপে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। অগ্নি-নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রাহাম ফিল্ডহাউস বলেন, ‘ক্ল্যাডিংয়ের পেছনের বস্তুগুলো অদাহ্য হওয়ার কথা। আমি জানি না তারা কোনও বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নিয়েছে কিনা।’ তিনিও মনে করেন বৃষ্টি প্রতিরোধক এই ক্ল্যাডিংয়ের কারণেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যজুড়ে কয়েক হাজার ঘরবাড়িতে জরুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা নাহলে ভবনের বাইরে ব্যবহৃত প্রলেপের কারণে এসব ভবনও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ