মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাঙ্গামাটিতে উদ্ধার আরো দুই লাশ

রাঙ্গামাটি থেকে আনোয়ার আল হক : প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট ভয়াবহ ভূমিধসে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১০ জনে। ভূমিধসের ৫ দিন পর শুক্রবার ধ্বংসস্তুপ থেকে আরো দুইজনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার ব্রিগেডের উদ্ধারকারী দল। এই দুই লাশ উদ্ধারের পর শুক্রবার সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করার ঘোষণা দেন। উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে নিখোঁজদের মধ্যে যাদের এখনও পাওয়া যায়নি, তাদের আর খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

ফায়ার ব্রিগেডের ১৪৫ জন কর্মী এবং শতাধিক সেনাসদস্য উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছেন। ফায়ার ব্রিগেডের পরিচালক (অপারেশন) শাকিল নেওয়াজ জানিয়েছেন ভূমিধসে নিখোঁজ শেষ ব্যক্তিটির মৃতদেহ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দিয়ে বলেন, তবে আমাদের নিয়মিত অভিযান এখানেই শেষ। তবে কারো বিষয়ে খোঁজ পাওয়া গেলে সাথে সাথে সেখানে কাজ করবে কর্মীরা। এদিকে শহরে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করায় জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামেনি।

এদিকে ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকা লোকজনদের বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরে ১৭টি সহ জেলায় ৩৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন আশ্রয় নিয়েছেন। রাঙ্গামাটির আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিত ২১০০ সদস্যের মাঝে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ, পৌরসভা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পুলিশ বিভাগ এর পক্ষ থেকেও আশ্রিতদের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছেন স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা। গতকাল শুক্রবার রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানসহ জেলা প্রশানের কর্মকর্তারা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে পরিদর্শন করেন। এসময় তারা আশ্রিতদের সরকারি সহায়তা অব্যাহত খাকবে বলে জানান।

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানান এ পর্যন্ত ভূমিধ্বসে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের সহায়তার জন্য সরকারি ত্রাণ হিসাবে ৪১ লক্ষ টাকা, ২০০ মেট্টিক টন খাদ্য খাদ্যশষ্য, ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন, ১৫ লক্ষ টাকা গৃহনির্মাণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিধসে নিহত ১০৯ জনের পরিবারের সদস্যদের জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা এবং ৩০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়েছে। এদিকে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও ভূমিধসে নিহত পরিবারের সদস্যদের পরিবার প্রতি ২ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদেক আহমেদ।

এদিকে দুর্যোগের আগের দিন রোববার থেকে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃহস্পতিবার রাত থেকে সিমিত পরিসরে চালু করা হয়েছে। দুই একদিনের মধ্যেই রাঙ্গামাটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। 

এদিকে দুর্যোগের পর থেকে বন্ধ থাকা রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুন:স্থাপনের কাজ করছেন সওজ বিভাগ এবং সেনা সদস্যরা। বিকল্প উপায়ে দু একদিনের মধ্যেই রাঙ্গামাটির সাথে দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন এবং লঞ্চ মালিক সমিতির উদ্যোগে বিকল্প উপায় হিসাবে রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই জলপথে যাত্রীবাহী লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। দুর্যোগের পর রাঙ্গামাটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেও বাজারের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন বাজারগুলোতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোট পরিচালনা করা হচ্ছে। রাঙ্গামাটিতে জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে বিকল্প পথে রাঙামাটিতে জ্বালানি তেল আনা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

পাহাড়ের ইতিহাসে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটিকে পুনর্গঠনে চলছে জোর তৎপরতা। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভাসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরগুলোসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিপর্যস্থ রাঙ্গামাটির দুর্যোগপূর্ণ সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনতে নেয়া হয়েছে নানাবিদ উদ্যোগ। এরই মধ্যে এর সুফলও পেতে শুরু করেছে শহরবাসী। 

ইতোমধ্যেই ভয়াবহ এই দুর্যোগ পরবর্তী মাত্র তিনদিনের মাথায় শহরে চালু করা হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। যার ফলে আকস্মিকভাবে থমকে যাওয়া জীবনযাত্রার গতি ফিরে এসেছে অনেকটা। স্বাভাবিক হয়ে আসছে ভার্চুয়াল জীবন যাপনও। এরই মধ্যেই নির্মম এই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন তথা সরকারের পক্ষ থেকেও দেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা। 

বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যেও জেলা প্রশাসনের ত্রাণ অফিস থেকে পাঠানো হয়েছে ত্রাণ সহায়তা। অপরদিকে, যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধনের ফলে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হওয়া রাঙ্গামাটির বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের ব্যাপক উর্ধ্বগতিতে নাগরিকদের নাভিশ্বাস হওয়ার আগ মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান গতকাল শহরের সব বাজারের ব্যবসায়ীদের ডেকে জরুরি সভা করেছেন। তাদের বলা হয়েছে, মানবিক বিপর্যয়ের এই পরিস্থিতিতে কোনো বাজারে কেউ যদি কোনো পণ্য বাড়তি দামে বিক্রি করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যবসায়ী নেতারা জেলা প্রশাসককে আশ্বাস দিলেও বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের জিম্মি করে বেশি দামে পণ্য বিক্রির চিত্র দেখা গেছে। এই সকল বর্বর মুনাফালোভী সিন্ডিকেট চক্রকে নিবৃত করতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ