বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নিহতের সংখ্যা দেড় শতাধিক ছাড়িয়েছে অবিরাম বর্ষণে অকাল বন্যা

 

সংগ্রাম ডেস্ক : কয়েক দিনের টানা বর্ষণের পর তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৫ জন হয়েছে। আহত ও নিখোঁজ রয়েছেন এখনও অনেকে।

চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড় ধস, গাছচাপা, দেয়ালচাপা ও বজ্রপাতে গত দু’দিনে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সড়কের ওপর ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরাতে গিয়ে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ ৪ সেনা সদস্য।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (বিকাল ৫টা) পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৫৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১০১ জন, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও চন্দনাইশে ৩১ জন, বান্দরবানে ১০, কক্সবাজারের টেকনাফে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেই সাথে লাশের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

রাঙামাটি : পাহাড় ধসে মাটিচাপায় রাঙ্গামাটি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বুধবার সকাল পর্যন্ত ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সদর হাসপাতালে ১৪ জনের লাশ নেয়া হয় এবং বিকালে আরও দু’জনের লাশ উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধসে মাটিচাপায় ২ জনের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেন সিভিল সার্জন ডা শহীদ তালুকদার।

কাপ্তাইয়ের রাইখালীর কারিগরপাড়ায় ৪ জন এবং কাউখালী উপজেলায় ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে স্থানীয় সূত্র। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মানিকছড়িতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি অপসারণের সময় ৪ সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়। তারা হলেন- মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম শান্ত, কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক ও সৈনিক মো শাহীন আলম। আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চারজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোরে জেলার মানিকছড়িতে একটি পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে যায়। এতে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। সকাল ১১টার দিকে ওই স্থানে পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারী দলের ওপর ধসে পড়ে। এতে উদ্ধারকর্মীরা মূল সড়ক থেকে ৩০ ফিট নিচে পড়ে যান। এ ঘটনায় নিহত ওই চারজনসহ ১০ জন সেনা সদস্য আহত হন।

কাপ্তাই রাইখালীর কারিগরপাড়ায় নিহত ৪ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে নাম পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিভিল সার্জন ডা শহীদ তালুকদার বিলাইছড়িতে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করলেও তাদের নাম জানাতে পারেননি।

সোমবার রাঙ্গামাটি শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় এক শিশু এবং কাপ্তাইয়ের নতুন বাজারে এক শিশু পাহাড়ের মাটিচাপায় মারা যায়।

জেলা প্রশাসন থেকে শহরসহ জেলায় মোট ৩৫ জনের নিহতের তালিকা পাওয়া গেছে বলে জানান নেজারত ডেপুটি কালেক্টর তাপস দাশ।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দু’টি ইউনিয়নে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে চার পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছে। রাজানগর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেন পাহাড় ধসে ২৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ঘুমন্ত অবস্থায় সোমবার মধ্যরাতে রাজানগর ইউনিয়নের ঠাকুরঘোনা মইন্যার টেক এলাকায় পাহাড় ধসে কাঁচাঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন নজরুল ইসলাম (৪০), তার স্ত্রী আসমা আকতার (৩৫), তাদের ছেলে ননাইয়া (১৫) ও মেয়ে সাথী আকতার (১৯)। একই উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন সুজন (২৪) তার স্ত্রী মুন্নি (১৯), মুন্নির অপর তিন বোন জ্যোৎ¯œা (১৮), শাহনূর আকতার (১৫) ও পালু (১২)। তাদের পিতার নাম মোহাম্মদ সেলিম। একই ইউনিয়নের বালুখালী এলাকায় মারা গেছেন ইসমাইল (৪২), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩৭), তাদের দুই মেয়ে ইছামিন (৮) ও ইভামনি (৪)।

চন্দনাইশ : মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ধোপাছড়ি ইউনিয়নের শামুকছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পৃথক ঘটনায় দুই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছনবনিয়া এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত একটি আদিবাসী পরিবারের কাঁচা ঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে। এতে মেকো ইয়াং খেয়াং (৫০) তার মেয়ে মেমো ইয়াং খেয়াং (১৩), কেউছা ইয়াং খেয়াং (১০) নিহত হয়। আহত হয় সানুউ ইয়াং খেয়াং ও সোউ খেয়াং। প্রায় একই সময়ে শামুকছড়ি এলাকায় মাটিচাপা পড়ে নিহত হয় আজগর আলীর মেয়ে মাহিয়া (৩)।

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ধোপাছড়ির শামুক ছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পাহাড় ধসে দুই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাহাড় ধসে আহতদের চিকিৎসা দিতে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

বান্দরবান : পাহাড় ধসে বান্দরবানে শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১১ জন। মঙ্গলবার ভোরে বান্দরবানের লেমুঝিরি ভিতরপাড়া থেকে একই পরিবারের তিন শিশু, আগাপাড়ায় মা-মেয়ের এবং কালাঘাটায় এক কলেজছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী স্টেশন অফিসার স্বপন কুমার ঘোষ। নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় মিলেছে। তারা হলো- লেমুঝিরির বাসিন্দা সমুন বড়ুয়ার তিন সন্তান শুভ বড়ুয়া (৮), মিতু বড়ুয়া (৬) ও লতা বড়ুয়া (৪), আগাপাড়ার কামরুন নাহার (২৭) ও তাঁর মেয়ে সুখিয়া আক্তার (৮) এবং কালাঘাটার কলেজছাত্র রেবা ত্রিপুরা (১৮)। অন্যদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও কয়েকজন।

জাইল্লাপাড়ায় কামরুন্নাহার ও তার মেয়ে সুফিয়া (২০) নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছে। আর গুরুতর আহত অবস্থায় দুইজনকে উদ্ধার করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন- পসান ত্রিপুরা ও বীর বাহাদুর ত্রিপুরা।

অবিরাম বর্ষণে ভোররাতে বাজালিয়ায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, পাহাড় ধসে রুমা উপজেলার সঙ্গেও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে দুদিন ধরে। অবিরাম বর্ষণে বান্দরবানে কয়েক সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গত এলাকার মানুষ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে বুধবার বিকেলে আবারও পাহাড়ি অঞ্চলে ভারি বর্ষণ হয়েছে। এতে নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় রয়েছেন পর্বত্যাঞ্চলের মানুষ।

কক্সবাজার : কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ে পাহাড়ের মাটি ও গাছ চাপায় বাবা ও মেয়ের মৃত্যু হয়েছে।

তারা হলেন- উপজেলার খারাংখালী পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়া গ্রামের বাবা মোহাম্মদ সেলিম (৪০) ও তার মেয়ে টিসু মনির (৩)।

হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী জানান, রাতে ভারি বর্ষণে হঠাৎ একটি গাছসহ পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়ে বাবা ও মেয়ের মৃত্যু হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইন উদ্দিন খান জানান, লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়েছ।

খাগড়াছড়ি জেলায় পাহাড় ধসে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

প্রবল বর্ষণে অকাল বন্যা

চট্টগ্রাম অফিস : বৃহওর চট্টগ্রামে কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে অকাল বন্যা দেখা দিয়েছে ও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে পানি নেমে গেলেও জোয়ারের সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচেছ। বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে।

 পাহাড় ধসে ৪ জন সেনা কর্মকর্তাসহ দেড়শতাধিক নিহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াত নেতৃবৃন্দের শোক : প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও রাঙ্গুনিয়াসহ পুরো চট্টগ্রামে ৪ জন সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় দেড়শতাধিক লোক নিহত, বহুসংখ্যক লোক আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গভীর শোক প্রকাশ করে এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সাহায্য প্রদানের দাবি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী আমীর মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরী সেক্রেটারি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম এক শোক বাণী প্রদান করেন। শোক বাণীতে চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াত নেতৃবৃন্দ নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানান। নেতৃবৃন্দ আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ট পরিবারসমূহকে সাহায্যার্থে সরকার ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, বার বার পাহাড় ধসের ঘটনায় জীবনহানির ঘটনা সরকারের অবহেলা ও দুর্বলতার কারণেই ঘটছে। অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এদিকে নগরীর খুলশী থানাধীন হযরত গরীব উল্লাহ শাহ মাজার পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠা অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনের দাবি জানিয়েছে কুসুমবাগ আবাসিক সোসাইটি, বায়তুল আমান ও শাহ গরীব উল্লাহ আবাসিক সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকবৃন্দ। বুধবার এ বিষয়ে একটি লিখিত আবেদন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে দেয়া হয়। আবেদনে বলা হয়, ‘গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে তিন পার্বত্য জেলা সহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ যে কুসুমবাগ আবাসিক সোসাইটি, বায়তুল আমান ও শাহ গরীব উল্লাহ আবাসিক সোসাইটি গুলো পাহাড় ঘেরা। গরীব উল্লাহ শাহ মাজারের পেছনে পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘদিন ধরে কিছু লোক অবৈধভাবে ঘরবাড়ী তৈরী করে বসবাস করছে। যেসব ঘরগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোন সময় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। এই বাড়িগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তৈরী করে ভাড়া দিয়েছে। এখানে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনও রয়েছে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি নগরীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকা তৈরী করলেও এই পাহাড়টির কথা জানে না সংশ্লিষ্ট কেউ। আমরা বারবার প্রশাসনের নিকট দরখাস্ত বা লেখালেখীর মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেও অজ্ঞাত কারণে প্রশাসন এ নিয়ে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে পাহাড় ধস চট্টগ্রামের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে প্রবল বর্ষণের ফলে যেকোন সময় এখানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যাতে ব্যাপক প্রাণহাণি ঘটবে। তাই অবিলম্বে গরীব উল্লাহ শাহ মাজারের পেছনে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করার দাবি জানান এ তিন আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা। তা না হলে এখানে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য প্রশাসন দায়ী হবে বলে আবেদনে জানানো হয়।

এদিকে হালিশহরে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। গত সোমবার রাত সোয়া ৩ টায় আকস্মিক এই টর্নেডোর আঘাতে শতাধিক ঘরবাড়ি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে যাওয়ার ফলে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বিদ্যুৎহীন থাকার খবর পেয়ে আজ বুধবার বেলা ৩টায় তিনি টর্নেডো দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি এলাকার সার্বিক খোঁজ খবর নেন এবং টর্নেডো দুর্গতদের মাঝে নগদ টাকা ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেন। এ সময় এলাকাবাসী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ অতিদ্রুত স্বাভাবিক করার আহবান জানান। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলকে অবহিত করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনকালে এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক লায়ন মোহাম্মদ হোসেন প্রমুখ।

 সেলিম চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়া থেকে জানান: প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসে আরো ২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। চন্দ্রঘোনা কদমতলী ইউনিয়নের বনগ্রাম কলা বাইজ্যাঘোনায় ঘরের দেয়াল ভেঙ্গে মাটি চাপায় মনোয়ারা বেগম (৪০), গত মঙ্গলবার রাতে ইসলামপুরে পক্ষী (১৫) নামের এক যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পাহাড় ধসে এবং পাহাড়ি ঢলে ভেসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে। হোছনাবাদ ইউনিয়নে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ইয়াছমিন আক্তার (১৫) পানির ¯্রােতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল বুধবার ত্রাণ, দুর্যোগ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া রাঙ্গুনিয়া দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এসময় মন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগীতার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে। রাঙ্গুনিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যা কবলিত হয়েছে ৬ ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম। থৈ থৈ পানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে শতশত ঘরবাড়ি। উপজেলার চৌমুহনী-রানীরহাট সড়ক, রাঙ্গুনিয়া কলেজ সড়ক, উপজেলার বিভিন্ন রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। প্রায় ২ লক্ষ মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত শতশত বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের বিক্ষিপ্ত এলাকায় বন্যার পানি উঠেছে। উপজেলার উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হড়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নসমূহের চেয়ারম্যানের রিপোর্টের বরাত দিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তরে তৈরী পরিসংখ্যান মতে, বন্যায় এবং পাহাড় ধসে রাজানগর, হোসনাবাদ, ইসলামপুর এবং মরিয়মনগর ইউনিয়নে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নে পাহাড় ধসে নিহত হয়েছে ৮ জন। আহত হয়েছে ২০ জন। ইউনিয়নের ৫‘শ পরিবার বাড়িঘর ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসবের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরূপণ করা হয়েছে ৩ কোটি টাকা। হোছনাবাদ ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে একজন নিখোঁজসহ মারা গেছে ৫ জন। আহত হয়েছে ১০ জন। এই ইউনিয়নের ২‘শ পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি টাকা হবে। ইসলামপুর ইউনিয়নে পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িছে ১৪ জনে। আহত হয়েছে ১৭ জন। ঘরবাড়ি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫‘শ পরিবার। ক্ষতির পরিমাণ হবে ৩ কোটি টাকা। মরিয়মনগর ইউনিয়নে বন্যা এবং গাছপালা পড়ে আহত হয়েছে ১৫ জন। ঘরবাড়ি ধসে এবং বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ২‘শ পরিবার। ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা। নিহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য খাদ্যশস্য, অর্থ ও নির্মান সামগ্রীর ত্রান সাহায্য বরাদ্দের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন। 

 ফটিকছড়ি সংবাদদাতা জানায়, ফটিকছড়িতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একজন নিখোঁজ ও একজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে। আহত প্রায় অর্ধ শতাধিক। এছাড়া রাস্তাঘাট ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হালদা,গজারিয়া,সর্তা ও ধুরুং খালের পানি এখনো বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জানা যায়,গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ভারী বর্ষণে উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়নে বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে বিভিন্ন নি¤œঞ্চল। এসব এলাকায় পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে এবং যে কোন সময়ে পানি বাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করছেন স্বাস্থ্য বিভাগ। ফটিকছড়ির উপজেলা সদরের সাথে উত্তর ফটিকছড়ির যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। হেয়াকো গহিরা সড়কের,নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি সড়ক,নারায়নহা-কারেরহাট সড়ক,নাজিরহাট-নানুপুর সড়কসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কসহ গ্রামীন বিভিন্ন বিভিন্ন সড়কের চরম ক্ষতি সাধিত হয়,পনিতে ডুবে রয়েছে বিভিন্ন এলাকার সড়ক ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শান্তিরহাট, নারায়নহাট,দাঁতমারা এলাকায় আটকা পড়ে আছে শত শত পন্যবাহী যানবাহন। নাজিরহাট পৌরসভার শাহ চৌমুহনী,কুম্ভারপাড়া এলাকায় হালদার ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করছে,ধুরুং এর ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে ফটিকছড়ি পৌরসভা ও সুন্দরপুরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। লেলাং, নানুপুর, রোসাংগিরি, পাইন্দং, হারুয়ালছড়ি, কাঞ্চননগর, ভূজপুর, নারায়নহাট, ধর্মপুর, জাপতনগর, সুন্দরপুর, সুয়াবিলসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজার হাজার বাসিন্দা এখনো পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে এসব এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ । এদিকে রামগড় চা বাগান শ্রমিক ধনা কর্মাকার ফেনী নদীতে পানির ¯্রােতে ভেসে গিয়ে নিঁখোহ রয়েছে। নানুপুর খিরাম বড়ইতলীতে কালিন্দ রানী চাকমা(৪০) নামে এক মহিলা নিহত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ স্থানে প্রায় অর্ধ শতাধিকজন আহত হয়েছে। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায় জানান, বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি ভাল নয়। গ্রামীণ জনপদ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান,এ উপজেলার আবদুল্লাহ পুর, জাফত নগর, সমিতিরহাট, লেলাং সহ উত্তরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন গুলোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। অবশ্য তিনি বুধবার দিনভর বন্যাদূর্গত এলাকা গুলো পরিদর্শন করেন এবং খিরামে নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা এবং ৩০ কেজি চাল বিতরন করেন। 

বন্যা ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে বিত্তবানদের দাঁড়ানোর আহবান রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যানের-সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাউজান, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, মিরসরাইসহ রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধ্বস, বন্যা ও ভাঙনে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া আহতসহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেকেই। পবিত্র ঈদ উল ফিতরের প্রাক্কালে এই ভয়াবহ দুর্যোগে বর্তমানে হাজার হাজার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই দুর্যোগে আসন্ন ঈদে চট্টগ্রামের বিত্তবানদের ঈদ বাজেটের একটি অংশ দুর্গত এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি ও রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল আকুল আবেদন জানিয়েছেন।একান্ত মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এহছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল ইতোমধ্যে রাউজান উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।বিবৃতিতে এহছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবারের ঈদে বিলাসিতা পরিহার করে এই মানবিক উদ্যোগে সামিল হয়ে দুর্গত এলাকায় আহত-নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। এবারের ঈদ বাজেটের একটি অংশ বন্যাদুর্গত এলাকায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে বিতরণ করলে প্রকৃত ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে পরবে বলে তিনি মনে করেন। এতে এই উদ্যোগের মধ্যদিয়ে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ