বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এডিশনাল এসপি’র তদন্তে প্রধান শিক্ষককে পেটানোর সত্যতা মিলেছে

খুলনা অফিস: সুরঞ্জিত বৈদ্য ছিলেন চরমপস্থী সংগঠন নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক শাখার প্রধান। বাহিনী প্রধান মৃণালের প্রধান সহযোগী হিসেবে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী দিনেশ ও সাংবাদিক নহর আলীসহ একাধিক হত্যা মিশনের নেতৃত্ব দেন তিনি। সাংবাদিক নহর আলীসহ প্রায় দু’ডজন মামলা মাথায় নিয়ে রাজধানী থেকে গ্রেফতার হন এক যুগ আগে। বর্তমানে ডিএসবি’র ৩৭ নম্বর তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের বড় নেতার আশির্বাদে এবং সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় গত ইউপি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করে ডুমুরিয়ার শোভনা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত বৈদ্য। ডুমুরিয়া ভিত্তিক কচা বাহিনীর প্রধান একাধিক ব্যক্তিকে কচা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা ও আহত করার নায়ক সুরঞ্জিত বৈদ্য গত ৩ জুন শনিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে প্রধান শিক্ষক আনিছুরকে পিটিয়ে আবারও লাইম লাইটে। রমযান মাসে একজন রোজাদার, মানুষ গড়ার কারিগর প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে আহত করায় ডুমুরিয়া জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। চলছে বিভিন্ন সংস্থার নানামুখি তদন্ত। উঠে আসছে তার পুরনো দিনের নানা কাহিনী।
ডুমুরিয়া থানা পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, চরমপন্থী মৃণালের রাজত্বকালে তার প্রধান শত্রু ছিল দিনেশ। দিনেশকে হত্যার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মৃণাল। বিগত ১৯৯৮ সালে সন্ত্রাসী সুরঞ্জিত বৈদ্য পার্টি প্রধান মৃণালের প্রধান শত্রু দিনেশকে হত্যার পরিকল্পনা হাতে নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী উদয়, দেবু, পরেশ ও সুরঞ্জিত বৈদ্যসহ পার্টির ১০/১২ জন ক্যাডার ওই হত্যা মিশনে অংশ নেয়। দিনেশকে হত্যার পর সুরঞ্জিত বৈদ্য শোভনার এক প্রভাষকের মৎস্য ঘেরের বাসায় রক্তমাখা জামা কাপড়সহ হাজির হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বর্তমানে ওই প্রভাষক তার সাথে থাকেন বলেও জানা যায়।
সূত্র জানায়, মৎস্য ঘের নিয়ে পার্টির সদস্য পরেশের সাথে ঝগড়া এবং পার্টির বিভিন্ন খবর প্রশাসনসহ পত্রিকায় প্রকাশ করার অভিযোগে ২০০২ সালে সাংবাদিক নহর আলীকে কচা দিয়ে পিটিয়ে হত্যারও নেতৃত্ব দেন সুরঞ্জিত বৈদ্য।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা ও আহত করার অভিযোগ রয়েছে সুরঞ্জিত বৈদ্যের বিরুদ্ধে। কচা দিয়ে পিটিয়ে আহত করার উল্লেখযোগ্য তালিকায় রয়েছে শোভনার প্রশান্ত কুলতলার অসিত দফাদার, হরি মল্লিকসহ অসংখ্য নিরীহ ব্যক্তি। তার অত্যাচার থেকে সাবেক চেয়ারম্যান সরদার আব্দুল গনিও রেহাই পায়নি। মধ্য শোভনায় ১৯৯৮ সালের এক রাতে মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে সুরঞ্জিত   বৈদ্য ও তার মামাতো ভাই সরদার গনিকে কচা দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। ২০০২ সালে দীনেশ, সাংবাদিক নহর আলীসহ ২৩টি মামলার আসামি হিসেবে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন সুরঞ্জিত বৈদ্য। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে ছাড়া পেয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। ওইখানে থেকেই ভাঙ্গা পার্টিকে জোড়া দেয়ার কাজ শুরু করেন। পার্টির প্রধান মৃণালসহ প্রধান ক্যাডার ক্রসফায়ার ও প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হওয়ার পর অত্যন্ত সংগোপনে পার্টিকে টিকিয়ে রাখেন তিনি। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিপক্ষে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। ডুমুরিয়ার এক রাজনৈতিক নেতার আর্শিবাদে এবং সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পরের দিন নিজের হাতে আপন চাচা অসিত বৈদ্যকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠান সুরঞ্জিত বৈদ্য। এছাড়া তার সন্ত্রাসী বাহিনী পল্লীশ্রী কলেজের প্রভাষক অম্বারিশ মন্ডল, শোভনার মধ্যপাড়ার মিঠুন মল্লিককে পিটিয়ে আহত করে।
অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের এলাকায় ফিরিয়ে এনেছেন। জেল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী ও ভারতে দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকাদের এলাকায় ফিরিয়ে এনে নিজস্ব বাহিনী তৈরি করেছেন। ওইসব সন্ত্রাসী সব সময় তার সাথে থাকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জিয়েলতলার দিনেশ হালদার ও অরুণ সরদার, গোনালীর সাইফুল, শোভনার কার্তিক মন্ডল, শংকর মল্লিক, প্রভাত মল্লিক, গোপাল মন্ডল, সনৎ রায়, কদমতলার কুখ্যাত সন্ত্রাসী সুজিত ওরফে সুলতানের ভাই অজিত মন্ডল, মাদারতলার দিপংকর বাছাড়, ২০০৩ সালে ৩টি অত্যাধুনিক বন্দুকসহ গ্রেফতার প্রবাস ঢালী, শোভনার সুশান্ত মল্লিক ওরফে শোসা ও কদমতলার গোষ্ট মন্ডল। খুলনাসহ কোন জায়গায় গেলে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে এসব সন্ত্রাসীরা তার সাথে থাকে। গত ৩ মে শনিবার সকালে প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমানসহ শোভনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা মৎস্য প্রতিমন্ত্রীর বাসায় আসেন। কাজ সেরে বাইরে বের হওয়ার সাথেই প্রধান শিক্ষক আনিছুরকে উদ্দেশ্য করে রাজাকার ও বাস্টার্ড বলে গালি দেয় সুরঞ্জিত বৈদ্য। প্রতিবাদ করায় প্রকাশ্যে ওই শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করে আবারও তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রমাণ দেন সুরঞ্জিত বৈদ্য। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের তদন্ত ঃ প্রধান শিক্ষককে মারপিটের ঘটনা সরেজমিন তদন্তে সোমবার ডুমুরিয়া থানায় আসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সি এ হালিম। তিনি ওই দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত খর্ণিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আছাদুজ্জামান. ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিক, শোভনা পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সুলেখা মল্লিক, শিক্ষিকা তামান্না হাফিজ, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অচিন্তা হালদার, সহ-সভাপতি শেখর মল্লিক, সদস্য শরিফুল, অভিযোগকারী প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান ও অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত বৈদ্যর লিখিত সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তদন্ত শেষে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত চলমান আছে জানিয়ে তিনি এর চেয়ে ব্যাখ্যা করে কোন মন্তব্য করতে চাননি। এদিকে ডিএসবি থেকে জানা গেছে সুরঞ্জিত বৈদ্য বর্তমানে ৩৭ নম্বর তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং তার নামে বর্তমানে ৫টি মামলা চলমান আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ