শনিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২৩
Online Edition

চলছে লাল-সাদা ও গেরুয়া তাণ্ডব

গরুর গোশত বিতর্কে এবার মেঘালয় বিজেপিতে ভাঙন শুরু হলো। মোদি সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘বিফ অ্যান্ড বিচি পার্টির’ আয়োজন করেছিলেন প্রদেশ বিজেপি নেতাদের একাংশ। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এতে নারাজ। ফলে দল থেকে ইস্তফা দিলেন এক নেতা। আর এক নেতাকে দল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২ জুন আনন্দবাজারে প্রকাশিত খবরে আরো বলা হয়, কেন্দ্র গরু কেনাবেচা সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করার পর থেকেই মেঘালয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। গোমাংস সেখানে জনপ্রিয় খাদ্য। মাংস ব্যবসায়ী ও গোহাটের ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই নির্দেশ মানা সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য যে, আগামী ৮-৯ মাসের মধ্যে রাজ্যে ভোট। এই পরিস্থিতিতে গোমাংস বিতর্কে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সতর্ক করেছিল মেঘালয় বিজেপি নেতৃত্ব। পরিস্থিতি সামলাতে বিজেপি নেতা বার্নার্ড সি মারাক দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে গোমাংস নিষিদ্ধ তো হবেই না, উল্টো আরো সস্তা করা হবে। আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে উত্তর-গারো হিল বিজেপির জেলা সভাপতি বাচু মারাক ঘোষণা করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘বিফ অ্যান্ড বিচি পার্টি’ করবেন বিজেপি নেতারা। ফলাও করে সে কথা ঘোষণাও করেন তিনি ফেসবুকে। খবর পেয়েই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কড়া নিষেধাজ্ঞা পাঠান।
এদিকে শিলংয়ে রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা নলিন কোহলি বলেন, ‘বিজেপি শৃঙ্খলাবদ্ধ দল। দলীয় অনুশাসনের ঊর্ধ্বে ওঠে দলের ভাবমূর্তি খারাপ করা চলবে না।’ তিনি বাচু মারাককে দল ছাড়তে বলেন। আর বার্নার্ডের জবাবদিহি তলব করা হয়। কিন্তু বার্নার্ড জবাবদিহি করতে রাজি নন, শুক্রবার ইস্তফা দেন তিনি। বার্নার্ড বলেন, ‘বিজেপি উপজাতি ও খৃস্টানদের উপর হিন্দুত্ব চাপাতে চাইছে। আমরা নিজেদের মতো করে উৎসব করলে মানুষের মন থেকে শংকা দূর হতো।’ তার মতে, গোমাংস নিয়ে তাদের মনোভাবই বিজেপিকে এই রাজ্যে মানুষের মন থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, আর সুবিধা পাবে কংগ্রেস। গোমাংস নিয়ে প্রদেশ বিজেপি নেতারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে দল আরো ভাঙবে বলে বিজেপি একটি সূত্র জানিয়েছে।
গরুর গোশত নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে নানা কাণ্ড ঘটে চলেছে। পৃথিবীর কোথাও এমন নজির নেই। গোমাংস ভক্ষণ নিয়ে যে জুলুম-নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে ভারতে তাতে পৃথিবী বিস্মিত। মানবিক এমনকি ধর্মীয় বিবেচনায়ও বিজেপি সরকারের গো-নীতিকে সমর্থন করা যায় না। ভ্রান্ত ও উগ্রচেতনার এই আস্ফালনের বিরুদ্ধে ভারতীয় বিবেকবান জনগণের পাশাপাশি এখন সচেতন বিজেপি নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। তারা বলছেন, এভাবে হিন্দুত্ব চাপিয়ে দেয়া যাবে না। পরিস্থিতিটা বোধ হয় এখন কিছুটা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও। গত শুক্রবার (২ জুন) এক ব্যাখ্যায় কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, ভারতের গরু জবাইয়ের আইনে রাজ্যের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করা হবে না। গরু জবাই ইস্যুতে কিছুটা পিছু হটে এখন বিজেপি নেতৃত্ব বলছেন, গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে। কেন্দ্রে মোদির সেনাপতি অরুন জেটলি গত শুক্রবার এই যে বললেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্য সরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়’, তা অবশ্য পর্যবেক্ষণের মতো একটি বিষয়। ভারতে গো-মাংস বিতর্ক কোন দিকে যায় গো-ভক্ষণকারী প্রতিবেশি দেশের নাগরিক হিসেবে তা আমাদের জন্যও একটি আগ্রহের বিষয় বটে। তবে পৃথিবীর ইতিহাস বলে, ন্যায়সঙ্গত স্বাভাবিক বিষয়কেই মানুষ গ্রহণ করে থাকে। তাই যে কোন বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত যৌক্তিক পরিণতিই আমাদের কাম্য। তবে ট্র্যাজেডি হলো, বর্তমান সভ্যতায় ক্ষমতাবানরা ন্যায় ও যুক্তির পথে হাঁটতে চান না। ফলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। বাড়ে দেশের সংকটও। আর দুর্ভোগ সৃষ্টিকারীদের পরিণতি যে ভালো হয় না, সে কথা তো ইতিহাস আমাদের বলে দিয়েছে।
ভারতে ‘বিফ পার্টির’ মতো ‘ইফতার পার্টি’ও এক নতুন মাত্রা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ৩ জুন সিএনএন পরিবেশিত খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে ইফতার করেছেন প্রায় শতাধিক মুসলমান ও তাদের মিত্ররা। ইসলাম ও বিদেশীদের ব্যাপারে ট্রাম্পের অহেতুক ভীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দু’টি অধিকার আন্দোলন গোষ্ঠীর উদ্যোগে পহেলা জুন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কে এ আয়োজন করা হয়। এই প্রতিবাদে সংহতি জানাতে অন্যান্য অনেক ধর্মের লোক রমযানের এই ইফতারে অংশ নেন।
উল্লেখ্য যে, এমপাওয়ার চেঞ্জ ও নিউইয়র্ক স্টেট ইমিগ্র্যান্ট অ্যাকশন ফান্ডের আহ্বানে আয়োজিত উক্ত প্রতিবাদ আয়োজনে কোনো শ্লোগান দেয়া হয়নি, কোনো ব্যানারও বহন করা হয়নি। উপস্থিত সবাই ইফতারে অংশগ্রহণ করেছেন আর মুসলিমরা মাগরিবের নামায আদায় করেছেন। এ সময় ম্যানহাটনের ফিফথ এভিনিউতে ট্রাম্প টাওয়ারের প্রবেশ পথে বিপুলসংখ্যক পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। তাদের থেকে কয়েক কদম দূরে নিরাপত্তা বেষ্টনীর অপর পাশে মুসলিম ও তাদের সমর্থকরা বসে ইফতার করছিল, আর পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল। অভূতপূর্ব এক দৃশ্য! মুসলিমরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্মীয় আচরণ করছিল। এভাবে তারা প্রমাণ করলো যে, আমেরিকা বহু ধর্ম ও বর্ণের একটি দেশ এবং এটাই আসল আমেরিকা। এমন আমেরিকায় কেউ কারো জন্য হুমকি নয়। পুলিশও নিরবে দাঁড়িয়ে যেন সেই সত্যটাই প্রত্যক্ষ করলো।
ইফতারের আগে নিউইয়র্ক স্টেট ইমিগ্র্যান্ট অ্যাকশন ফান্ডের উপপরিচালক আনুযোশি বলেন, ‘প্রতিদিন আমেরিকান মুসলিমরা গোঁড়ামি ও ঘৃণার শিকার হচ্ছেন। কাজের ক্ষেত্রে, স্কুলে, চাকরি চাইতে গিয়ে, ধর্ম পালন করতে গিয়ে, এমনকি জীবন যাপন করতেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওম্যান মার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনী আমেরিকান লিন্ডা সারসৌর বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম কোন বিদেশী ধর্ম নয়। মুসলিম ও কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর ভর করেইতো যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছে।’ এমন বাস্তবতায় মুসলিম ও কৃষ্ণাঙ্গরাতো যুক্তরাষ্ট্রে সমঅধিকারের ভিত্তিতে সম্মানের জীবন আশা করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি উপলব্ধি করলে মঙ্গল। এমন উপলব্ধির মধ্যে নিহিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরও মঙ্গল। এমন সহজ ও সঙ্গত বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পারছে না কেন? শাসকদের তো বিবেচনাবোধ একটু বেশি থাকার কথা। তাহলে বিবেচনাবোধে কি কোনো পর্দা পড়ে গেছে। কিন্তু সেটা কিসের পর্দা?
বর্তমান সভ্যতা প্রতিদিনই নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব প্রশ্নের কোন সদোত্তর নেই সভ্যতার শাসকদের কাছে। বর্তমান সভ্যতায় যারা শক্তিশালী, তারা যেন যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার রাখে। এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে হয়তো অলিখিত কোন সমঝোতা আছে। যারা দুর্বল তাদের উপর অব্যাহতভাবে জুলুম-নির্যাতন ও অবিচার করে যাচ্ছে লাল-সাদা-গেরুয়া নির্বিশেষে সব বর্ণের আধিপত্যবাদীরাই। ভারতে গরুর গোস্ত খাওয়া নিয়ে মুসলমানদের ওপর নির্মম নির্যাতন, এমনকি হত্যাকা-ের মতো ঘটনাও ঘটছে। আর ইসলাম ফোবিয়া ও বিদ্বেষের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। সেখানে সম্মানের সাথে বসবাসের অধিকার ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে মুসলমানদের জন্য। এখন আবার মুসলিম নাগরিকদের বিরুদ্ধে অবদমনের নতুন মাত্রা লক্ষ্য করা যাচ্ছে চীনে। মুসলমানদের ধর্মবোধের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে সেখানে।
চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় নাম পরিবর্তনে বাধ্য করছে স্থানীয় প্রশাসন। ধর্মীয় নামের অজুহাতে মূলত আরবী নামের ওপরই নামছে খড়গ। এছাড়া এখন স্থানীয় মুসলমানদের জোর করে নাস্তিক্যবাদী কমিউনিস্ট পার্টির মিছিলে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। রেডিও ফ্রি এশিয়ার খবরে বলা হয়েছে, চলতি রমযান মাসে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের মুসলিম নাম পাল্টানোর আদেশ দিয়েছে চীনের কিছু এলাকার প্রশাসন। এর আগে গত এপ্রিলে চীনে ইমাম, সাদ্দাম, ইসলাম, মক্কা, মদীনা, আরাফাত, জিহাদ, কুরআন, হজ্বসহ ১৫টি নাম রাখার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল কমিউনিস্ট পার্টির প্রশাসন। উল্লেখ্য যে, চীনের জিনজিয়াং প্রদেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখানকার মুসলিমরা বেশির ভাগই তুর্কী বংশোদ্ভূত উইঘুর জাতিগোষ্ঠীর। এই অঞ্চলটিতে প্রায়ই জাতিগত সহিসংতার শিকার হন মুসলমানরা।
আমরা জানি, প্রতিটি শিশুরই একটি সুন্দর নাম পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি তার মানবাধিকার। আর শিশুর নামতো রাখবে তার জন্মদাতা পিতামাতাই। কোন সরকার কিংবা প্রশাসন এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অথচ চীনে তা হচ্ছে। এমন তৎপরতার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় ও মানবাধিকার ক্ষুণœ করা হচ্ছে। আমেরিকা, ভারত, চীন, মিয়ানমারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন মুসলমানরা নানাভাবে নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার। অথচ মজলুম মুসলমানদের জালেম হিসেবে চিহ্নিত করার প্রোপাগান্ডা চলছে চাতুর্যের সাথে। এ নিয়ে যথেষ্ট বিলাপ হয়েছে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান সভ্যতায় শক্তিই যেন শেষ কথা। সংখ্যা, শক্তি, সম্পদের দিক থেকে মুসলমানদের তুচ্ছজ্ঞান করার তো কোন কারণ নেই। মুসলমানরা চাইলেতো একটি বড় শক্তি হিসেবেই বর্তমান সভ্যতায় আবির্ভূত হতে পারে। কিন্তু নতুন শক্তির উদ্বোধনে মজলুম মুসলমানদের আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ