ঢাকা, সোমবার 13 July 2020, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ২১ জিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কর্মচারীদের মাঠে নামাচ্ছে জাবি প্রশাসন?

অনলাইন ডেস্ক: সড়ক দুর্ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র নিহতের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলার পর ‘হয়রানির নতুন উপায়ে’ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

আন্দোলনের সময়ে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত ও লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ তুলে সোমবার শিক্ষার্থীদের শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি ও ইউনিয়ন।

এই মানববন্ধনকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘হয়রানির নতুন উপায়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

ওই মানববন্ধনের খবর জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর দিকে ইঙ্গিত করে তারা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির পেছনে প্রশাসনের ‘মদদ স্পষ্ট হয়েছে’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মঞ্চের মুখপাত্র ও দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা অন্যায্য মামলা প্রত্যাহার না করে এখন হয়রানির নতুন পন্থা হিসেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।”

একটি বিরোধপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশ নয় এমন সংগঠনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানোকে জনসংযোগ কার্যালয়ের ‘এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো এ বিজ্ঞপ্তি প্রমাণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ইন্ধনেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ মানববন্ধন করেছিল।এটা খুবই ন্যক্কারজনক একটা কাজ হল। এর মাধ্যমে সঙ্কট আরও ঘনীভূত হল।”

ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ইমরান নাদিম বলেন, “সমস্যার সমাধান না করে এভাবে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে মানববন্ধন করানো ও পরে জনসংযোগ কার্যালয় থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লজ্জা পাওয়া উচিৎ।”

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শাস্তি চেয়ে সোমবার সকাল ১১টায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই মানববন্ধন হয় ক্যাম্পাসে। মঙ্গলবার জনসংযোগ কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “গত ২৭মে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ব্যাপক ভাংচুর, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে জাবি কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারি সমিতি ও কর্মচারী ইউনিয়ন সম্মিলিতভাবে প্রশাসন ভবনের সামনের রাস্তায় ৫ জুন এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে ব্যাপকসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশ নয় এমন কোনো সংগঠনের সংবাদ জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো যায় কি না- জানতে চাইলে জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম মিঞা ‘প্রশাসনের নলেজেই’ কাজ করেছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, “আমরা সাধারণত প্রশাসনের পক্ষে যায় এমন জিনিসগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। এ জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এই সংবাদটি তৈরি করে উপাচার্যকে দেখানো হয়েছে। উপাচার্য অনুমতি দিয়েছেন, তাই জনসংযোগ কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আকারে পাঠানো হয়েছে।”

এর আগে ২০১৪ সালের জুন মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে এক কর্মচারীর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খবর গণমাধ্যমে পাঠানোর ঘটনায় হাই কোর্টের রুল জারির পরিপ্রেক্ষিতে দুই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন।

তারা হলেন জনসংযোগ কার্যালয়ের পরিচালক মীর আবুল কাশেম ও উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম মিঞা। কিছুকাল পরে তারা পুনরায় চাকরিতে ফেরেন।

এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো জনসংযোগ কার্যালয়ের অত নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সঠিক বলতে পারব না। রেজিস্ট্রারই ভালো বলতে পারবেন।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক (রেজিস্ট্রার) আবু বকর সিদ্দিককে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

মানববন্ধনের বিষয়ে কথা ভরতে কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি মাসুদুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি টেলিফোনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তবে কর্মচারী সমিতির সভাপতি অমর চাঁদ মন্ডল দাবি করেন, তাদের কর্মসূচি পালনের সঙ্গে প্রশাসনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্দোলনকারীরা আমাদের মোট ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আহত ও লাঞ্ছিত করেছে। এ ঘটনার বিচার চেয়ে আমরা কর্মসূচিতে গিয়েছি। কারও কথা শুনে এ কাজ করিনি।”

কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. আব্দুর রহিমও একই কথা বলেন।

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত রোববার পালিত কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত রোববার পালিত কর্মসূচি

গত ২৬ মে ভোরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সিঅ্যান্ডবি এলাকায় বাসচাপায় নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র নাজমুল হাসান রানা এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্র আরাফাত হোসেন।

প্রতিবাদে ২৬ মে এবং ২৭ মে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। ২৭ মে বিকালে পুলিশের লাঠিপেটায় আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছাড়তে বাধ্য হয়, আহত হয় ১০ শিক্ষার্থী।

এরপর সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সেখানে ভাঙচুর চালায়।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে ৪৩ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪০-৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে।

ওই রাতেই আশুলিয়া থানা পুলিশ উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে থাকা ১০ ছাত্রীসহ আন্দোলনকারী ৪২ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন বিকালে ওই শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পান।

এ ঘটনার সাত দিন পরে গত ৩ জুন শনিবার এক সিন্ডিকেট সভায় আগামী ৮ জুন থেকে হল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গত রোববার জুন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে মানববন্ধন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ