মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

চট্টগ্রামে হকারদের উচ্ছেদ না করে স্থায়ীভাবে বসাচ্ছে চসিক!

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম অফিস : নগরীর ফুটপাতে বসা হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের স্থায়ীভাবে বসার ব্যবস্থা করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। আগামী ১ জুলাই থেকে হকারদের শৃঙ্খলায় আনার নামে তাদের স্থায়ীত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চসিক। ৩১ মে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে অনুষ্ঠিত হকার সংগঠকদের সভায় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
তিনি বলেন, ১ জুলাই থেকে চসিকের নির্ধারিত স্থানে পরিচয়পত্রধারী হকাররাই শুধু বিকেল পাঁচটা থেকে পণ্যসামগ্রী নিয়ে বসার সুযোগ পাবেন। রাত ১১টা-১২ পর্যন্ত একটানা ব্যবসা করতে পারবে হকাররা। এর অন্যথা হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেয়া হবে।
মেয়র বলেন, চসিকের প্রকৌশল বিভাগ ফুটপাতগুলোকে টাইলস দ্বারা দৃষ্টিনন্দন করবে এবং আলাদা আলাদা করে দোকানের পজিশন মার্কিংসহ নাম্বারিং করে দেবে। নির্দিষ্ট আইডি কার্ডধারী হকাররা তার আইডি নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা পরিচালনা করবে। ফুটপাতে জনসাধারণের চলাচলের সুযোগ থাকবে। হকার ব্যবসায় জড়িতরা এদেশের নাগরিক। তাদের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ ও জীবন-জীবিকার স্বার্থে হকার উচ্ছেদ না করে তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
নগরীর প্রায় সব সড়কের ফুটপাথ হকারদের দখলে। তারা ফুটপাথ দখলের পর অনেক সড়কের প্রায় ৩০ শতাংশ দখল করে বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হকাররা একেরপর এক ফুটপাথ দখল করলেও মাঝে-মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের উচ্ছেদ করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শেষে তারা যথারীতি আবার বসে যায়। ফলে নগরীতে যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিভিন্ন মার্কেটের সামনে ফুটপাথ হকাররা দখল করে নেয়ায় বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি পুজি বিনিয়োগ করে হকারদের কারনে ব্যবসা করতে পারছেনা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যদি মার্কেটগুলোর সামনে ফুটপাথ মার্কিং করে হকার বসতে দেয় তাহলে হকাররা স্থায়ীভাবে ফুটপাথ দখল করে নিবে বলে ব্যবসায়ীরা আশংকিত হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি কোন মার্কেটের আশেপাশে কিংবা মার্কেটের সামনে হকারদের জন্য ফুটপাথ মাকিং করে বসতে দেয়া যাবে না।এ বিষয়টি মেয়রকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে বলে বলছে ব্যবসায়ীরা। হকারদের জন্য জহুর হকার মার্কেট করা হলেও হকাররা দোকান গুলো বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে দোকান বিক্রি করে হকাররা আবার রাস্তায় পশরা সাজিয়ে ব্যবসা শুরু করে। এ হচেছ পুর্নবাসনের নমুনা বললেন ব্যবসায়ীরা।
এসব ফুটপাথ দখল করে মাসিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাসমান হকারদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব দোকান থেকে সমিতির নামে দৈনিক ১০ টাকা হারে চাঁদাও আদায় করা হয়। হকারদের হিসেব মতে, নগরীর ফুটপাথগুলোতে গড়ে উঠা প্রায় ১০ হাজার দোকান থেকে একাধিক হকার্স সমিতি চাঁদা আদায় করছে। আদায়কৃত চাঁদা থেকে ভাগ পান সংশ্লিষ্ট সবাই।
চট্টগ্রাম ফুটপাত হকার সমিতির হিসাব মতে, নগরীতে স্থায়ী ও ভাসমান মিলে প্রায় ১৫ হাজার হকার রয়েছে। যারা চট্টগ্রাম ফুটপাত হকার্স সমিতি, মেট্রোপলিটন হকার্স সমিতি, হকার্স লীগসহ বিভিন্ন সমিতির সদস্য। যাদের থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা আদায় নিয়ে প্রায় সময় সংঘর্ষসহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, চকবাজার, কাজির দেউরি, দেওয়ানহাট মোড়, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা, নাসিরাবাদ, কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ, লালদিঘির দুই পাড়, তিনপুলের মাথা, বন্দর ফকিরহাট, পতেঙ্গা ইপিজেড এলাকা, অক্সিজেন মোড়সহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ফুটপাথে ৩০ বছর ধরে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ স্থাপনা।
এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ফুটপাথ ব্যবসা হচ্ছে নিউমার্কেট এলাকায়। স্টেশন রোড থেকে শুরু করে রেয়াজ উদ্দিন বাজার প্রবেশ মুখ, পিডিবি অফিস, নূপুর মার্কেট, নিউমার্কেট মোড়, জলসা মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, আমতল পর্যন্ত। ওই দিকে শাহ আমানত মার্কেট থেকে বঙ্গবন্ধু ল টে¤পল পর্যন্ত। ওই এলাকায় ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের উপরে দোকান রয়েছে।
একই অবস্থা নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায়। বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের সামনে ফুটপাথ ও গাড়ি পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট স্থান দখল করে বসানো হয়েছে দোকান। মোড়ে নালার ওপর অবৈধভাবে রয়েছে ফলের দোকান। তাছাড়া ওই এলাকায় সন্ধ্যার পর রাস্তর ওপর বসে কাঁচাবাজার ও শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান। অধিকাংশই স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দখলে।
একই অবস্থা কর্ণফুলী তৃতীয় সেতু এলাকায়। ফুটপাথের বিশাল জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ফলের দোকান। ফলে যানজট লেগে থাকে সব সময় ওই এলাকায়। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা সাপ্তাহিক হারে চাঁদা নেয় তাদের কাছ থেকে।
বহদ্দারহাটের মতো নগরীর মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, নাসিরাবাদ, অক্সিজেন মোড় বাসস্টেশন, চান্দগাঁও বাসটার্মিনাল, আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়, বাণিজ্যিক এলাকার ব্যাংকপাড়া, কাজির দেউরি, আন্দরকিল্লা, দেওয়ানহাট মোড়সহ নগরীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সন্ত্রাসীরা ফুটপাথ এমনকি রাজপথ দখল করে আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের দোকানের সামনে একেবারে আড়াল করে চলছে ফুটপাথ ব্যবসা। ফুটপাথ ও রাজপথ দখল করে দোকান বসানোর কারণে বঙ্গবন্ধু ল টে¤পল, মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল ও অধিকাংশ মার্কেট দেখা যায় না। অনেকবার বলার পরও কোনো কাজ হয় না। এ ব্যাপারে চসিক ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ একবার উচ্ছেদ করলেও কয়েকঘন্টার মধ্যে আবারও দখল হয়ে যায় ফুটপাত।
ফুটপাত দখলের কারণে পেশাজীবি মানুষের পাশাপাশি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও পড়ে নানা দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায়। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র তৌহিদুল হাছান বলেন, হকারদের কারণে ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটতে হয়। ফলে যানবাহনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটে এই শঙ্কায় থাকতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ