সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

সনাতন প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালনায় আমদানিকারকরা চরম ভোগান্তিতে

খুলনা অফিস: সনাতন প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালনা করায় আমদানিকারকরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সব সময়ই বন্দরটিতে লেগে আছে জট। অথচ, দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরটি থেকে সরকার ফি বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা আয় করে। শুধু চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে এর চেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়।
বেনাপোল স্থলবন্দরের গুরুত্ব বাড়ার পাশাপাশি অবকাঠামোর উন্নতি হচ্ছে না। এখনো রয়ে গেছে পুরনো আমলের কার্যব্যবস্থা। রয়েছে নানান অনিয়মের অভিযোগ। যদিও বন্দর আধুনিকায়নের দাবি করা হচ্ছে জোরেসোরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রফতানি হয়। এছাড়া বন্দর-সংলগ্ন ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বছরে প্রায় ১৩ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে থাকেন ভারত-বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে।
সূত্র জানায়, দেশের ২২টি স্থলবন্দরের মধ্যে বর্তমানে ১১টি চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচে’বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বেনাপোল স্থলবন্দর। এ বন্দরটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত। ভারতের পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম নগর ও বন্দর কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো। মাত্র তিন ঘণ্টায় কলকাতা থেকে পণ্য নিয়ে আসা যায় এই বন্দরে।
বেনাপোল বন্দরে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য রাখার জন্য ৪০টি শেড রয়েছে। যার অধিকাংশেরই মেয়াদকাল অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ওপেন ইয়ার্ড পাঁচটি, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড একটি, ট্রাকটার্মিনাল মোট তিনটি। এসব গুদামে পণ্য ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু সব সময়ই বন্দরে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন পণ্য মজুত থাকে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ মালামাল ঝুঁকি নিয়ে রাখা হচ্ছে ঠাঁসাঠাঁসি করে। এ মনকি ট্রাক টার্মিনালে রাখা হচ্ছে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ। জায়গা সংকটে সব সময় কয়েকশ’ ভারতীয় ট্রাক মালামাল নিয়ে বন্দরে বা বন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকছে রাস্তার ওপর। সেগুলোর পণ্য রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানিতে গতি বাড়াতে বেনাপোল বন্দরের বিপরীতে ভারতের পেট্রাপোলে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ইন্টিগ্রেটেড চেকপেস্ট। সেখানে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ট্রাক রাখার ব্যবস্থা, পুরো বন্দর এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতাধীন, রয়েছে উন্নতমানের সড়ক ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসি ওয়্যার হাউজ, চোরাচালান প্রতিরোধে স্কানিং ব্যবস্থাসহ আরো অনেক আধুনিক ব্যবস্থা। যার নিরাপত্তায় রয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যরা।
এপারে বেনাপোল বন্দরে ওই একই সুবিধা থাকার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা গড়ে তোলা হয়নি। ৪৫ বছরেও বন্দর কম্পিউটারাইজড করা হয়নি। এখনো মান্ধাতার আমলের মতো হাতে লিখে কাজ সারেন বন্দরের কর্মকর্তারা। মালামাল পুড়ে গেলেও হিসেব পাওয়া যায় না ক্ষয়ক্ষতির।
বেনাপোল স্থলবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, জায়গা সংকটের কারণে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ, গাড়ি, ও ক্যামিকেলসহ শত শত কোটি টাকার পণ্য। নষ্ট হচ্ছে পণ্যের গুণগত মান। বন্দরের শেডে জায়গা না থাকায় শেডের বাইরে রেললাইনের পাশের গর্তে পড়ে আছে ভারত থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের গাড়ি। বন্দর অভ্যন্তরে নতুন শেড নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তার উন্নয়নের কাজ চলছে খুবই ধীর গতিতে। সামান্য পানি হলে বন্দরে জমে হাঁটু পানি। বৃষ্টির পানি-কাদায় নষ্ট হয় পণ্য। কাদায় হাঁটা-চলা করাও যায় না। বন্দরে আমদানিকৃত মালামাল লোড-আনলোডের জন্য ভাড়া করা অধিকাংশ ক্রেন ও ফর্কলিফট নষ্ট থাকায় বিঘœ ঘটছে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া। বন্দরে সিসি ক্যামেরা না থাকায় দেদার চুরি হচ্ছে পণ্য। চুরিতে বাধা দিতে গিয়ে সম্প্রতি এক আনসার সদস্য চোর চক্রের হাতে জীবন দিয়েছেন। এরপরও বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বেনাপোল বন্দরে জনবল সংকটের কারণে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি শেডে দেখা যায়, স্টোরকিপাররা এক-দুইজন করে বাইরের লোক রেখে দিয়েছেন কাজ এগুনোর জন্য। পণ্য চুরির এটিও একটি কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন আমদানিকারকরা। বন্দরের সামনে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকানে। সেখানে বন্দরের আমদানিকৃত পণ্য কিনতে পাওয়া যায়। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক ব্যবসায়ী এ বন্দর ছেড়ে চলে গেছেন।
এদিকে, সম্প্রতি বেনাপোল স্থলবন্দরে ৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে পুরাতন আধলা ইট, খোয়া এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী।
এডিবি’র অর্থায়নে (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এ বন্দরের উন্নয়ন কাজ করছে ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মনিকো লিমিটেড। দুই বছরের মধ্যে তাদের এই কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এসব উন্নয়ন কাজের মধ্যে রয়েছে, নতুন দু’টি গুদাম, চারটি ওপেন শেড, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন, বন্দরের অভ্যন্তরের সড়ক ও ইয়ার্ড নির্মাণ।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের কাজ হওয়ার কথা। এমন দশা অবাক করেছে তাদের। ৪৫ বছরের পুরনো বিল্ডিং ভেঙে সেখান থেকে ইট নিয়ে নতুন করে শেড তৈরি করলে তা যে কোনো সময় ধসে যেতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
এদিকে, ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী শত শত ট্রাক বন্দরে জায়গা না পেয়ে রাস্তার ওপর পার্কিং করতে বাধ্য হওয়ায় বেনাপোল প্রধান সড়কে সব সময় লেগে থাকে যানজট। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীদের পোহাতে হয় ভয়াবহ ভোগান্তি।
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘প্রতিবছর এই বন্দর থেকে সরকার প্রায় চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। কিন্তু এখানে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোর চিত্র বেহাল। এতে পণ্য খালাসে বিলম্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষতিতে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে কিছু উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও সেখানে পুরনো আধলা ইট খোয়ার ব্যবহার দুঃখজনক।’
তিনি বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দর এদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। স্থলবন্দরটি অচলাবস্থার মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বন্দরে প্রতিদিন ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন পণ্য ওঠানো-নামানো হয়। প্রতিদিন পণ্য বোঝাই অন্তত ৩৫০টি ট্রাক লোড-আনলোডের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে বন্দরটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এই বন্দরকে আরো গতিশীল করে তোলার জন্য প্রথমেই দূর করতে হবে জায়গার সংকট। জায়গা সংকটের কারণে অনেক পণ্য রাখা যাচ্ছে না। শত শত কোটি টাকার পণ্য খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে ভারত থেকে পণ্য প্রবেশে বিলম্ব হচ্ছে। এ কারণে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোকে বেনাপোলে বন্দরে প্রবেশের জন্য আট থেকে দশ দিন অপেক্ষায় থাকতে হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দরকে বাণিজ্যের উপযোগী করে তুলতে এর ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করতে হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। আনতে হবে অত্যাধুনিক ইক্যুইপমেন্ট।’
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদামসহ ১৫টি শেড নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
বেনাপোল স্থলবন্দর উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) রেজাউল করিম বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরে ১০০ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে বন্দরে নতুন দু’টি শেড, ফ্লোর পাকাকরণ, ড্রেন নির্মাণসহ আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা থাকবে। সাময়িক কিছু সমস্যা আছে। কাজ শেষ হলে বন্দরে কোনো সমস্যা থাকবে না। বন্দরে পণ্যজটও কমে যাবে বলে আশা করছি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ