শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি : কাটা যাবে সর্বজনের পকেট

জিবলু রহমান : [দুই]
গ্যাস সংকট ও গ্যাসের প্রাচুর্য নিয়ে বাংলাদেশে নানা কথা রয়েছে। কোনো কোনো জরিপে এমনও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপরে ভাসছে। তা হলে গ্যাস সংকট কেন-এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। গ্যাস উত্তোলনে প্রয়োজনীয় ব্যয় ও দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। জ্বালানি সেক্টরগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করা হচ্ছে না। অদক্ষদের দিয়েই চলছে পেট্রোবাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে মূলত গ্যাসের কোনো সংকট নেই। যা আছে সেটা কৃত্রিম। এটা দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার অংশ হিসেবেই এ ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে হর-হামেশা। এ কাজে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে ষড়যন্ত্রকারীরা। সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক রাঘববোয়াল জড়িত আছে এদের সঙ্গে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক মোট গ্যাসের চাহিদা ২ হাজার ৭০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে এখন গড়ে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ঘনফুট। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তাদের গ্যাস উত্তোলন-সামর্থ্য আরও বেশি। বিভিন্ন স্তরে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহকৃত এ গ্যাস দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭৫ শতাংশ পূরণ করছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪২, শিল্পকারখানায় ২০, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৬, বাসাবাড়িতে ১২, সার উৎপাদনে ৭, সিএনজিতে ৫ এবং বাণিজ্যিকভাবে ২% গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, এই বিভাজনে ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না। শিল্প উদ্যোক্তাদের বক্তব্য ঠিকমতো উৎপাদন না হলেও ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে তাদের। আর তাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। খেলাপি ঋণের বিষয়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্দর থেকে পণ্য খালাস করা থেকে শুরু করে তা গুদামজাত করাসহ অন্যান্য ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় উদ্যোক্তাদের। এর মধ্যে গ্যাসের সংকট তাদের ঋণ হিসাবকে খেলাপি করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ১৮ আগস্ট ২০১৪)
মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির হিসাবে ব্যাপক গরমিল দেখা গেছে। শুধু তাই নয় খননকৃত কূপের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করছে পেট্রোবাংলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রোবাংলার হিসাবে অনেক মনগড়া তথ্য রয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে পুরনো কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হলেও খননকৃত কূপের সংখ্যায়ও সেগুলো দেখানো হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার বিভিন্ন নথিপত্র থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত মহাজোট সরকারের সময়কালে পেট্রোবাংলার সাফল্য নামে বুকলেটের গ্যাস উৎপাদন অংশে উল্লেখ করা হয়, পুরনো বন্ধ কূপ ওয়াকওভার (সংস্কার), নতুন উন্নয়ন কূপ ও অনুসন্ধান কূপ করে প্রকৃত উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে ৭৬৩ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বলা হয়, সাঙ্গু ও বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্রসহ কয়েকটি ক্ষেত্রের কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রতিদিন ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। একই বুকলেটের এক নজরে গ্যাস সেক্টর অংশে উল্লেখ করা হয়, প্রকৃত গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিও পরিমাণ ৫৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এখানেই ৩ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি দেখানো হয়। নতুন স্ট্রাকচার চিহ্নিত করার কথা বলা হয় ৫টি। এ ছাড়া নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ২টি, অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা ৭টি, উন্নয়ন কূপের সংখ্যা ১৯টি এবং ওয়াকওভার কূপের সংখ্যা ১৭টি। সব মিলিয়ে বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের ৪৩টি কূপের কাজ করার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু একই বছরের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পেট্রোসেন্টার ও তিতাস ভবনের সামনে লাগানো বিলবোর্ডে বলা হয়, খননকৃত কূপের সংখ্যা জোট সরকারের আমলে ১২টি এবং মহাজোট সরকারের আমলে ৪৪টি। সেখানে আরও বলা হয়, জোট সরকারের আমলে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিও পরিমাণ ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং মহাজোট সরকারের আমলে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ৮৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে গ্যাসের উৎপাদনে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি দেখানো হয়। আর খননকৃত কূপের সংখ্যায় একটি বেশি উল্লেখ করা হয়।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ পেট্রোবাংলা পরিদর্শনে এলে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, মহাজোট সরকারের আমলে ৩৮টি কূপ ও মুচাইয়ে স্থাপিত কম্প্রেসারের মাধ্যমে ৮৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ করা হয়েছে। এতে এনওসি (ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি) ও আইওসি (আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি) মিলে মোট ৩৮টি কূপের কথা বলা হলেও মাত্র ২৯টি কূপ গ্যাস উৎপাদনের বিবরণ দেয়া হয়। প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় পেট্রোবাংলা যে হিসাব দিয়েছে তাতেও গরমিল ছিল। ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে পেট্রোবাংলা ওয়াকওভার কূপ বা সংস্কারকৃত কূপের সংখ্যা ১৭টি উল্লেখ করলেও জানুয়ারি মাসে পেট্রোবাংলা সংস্কারকৃত কূপের সংখ্যা ১২টি উল্লেখ করা হয়।
[চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ