বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০
Online Edition

অধিকাংশ তামাকপণ্যের প্রকৃত মূল্য কমবে বাড়বে মৃত্যু 

স্টাফ রিপোর্টার : প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটকে ‘তামাক মহামারীর বাজেট’ আখ্যায়িত করেছে বেসরকারি তামাকবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) ও তামাকবিরোধী গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন ‘আত্মা’। তারা বলছে, এ বাজেটে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের কোন প্রতিফলন নেই। অধিকাংশ তামাকপণ্যের প্রকৃত মূল্য কমবে, বাড়বে মৃত্যু।

গতকাল বৃহস্পতিবার তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এক যুক্ত বিবৃতিতে প্রজ্ঞা ও আত্মার পক্ষ থেকে বলা হয়, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেট এবং ধোয়াবিহীন (গুল, জর্দ্দা) তামাকপণ্যে কর না বাড়ানোর প্রস্তাব চরম জনস্বাস্থ্যবিরোধী। গত একবছরে জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। এরসাথে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে তামাকপণ্যের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার অর্থ ভোক্তার কাছে এগুলো আরো সহজলভ্য হয়ে যাবে, লাভবান হবে বহুজাতিক তামাক কোম্পানি। 

অন্যদিকে, সিগারেটের সর্বনি¤œস্তর ভেঙ্গে দেশী এবং আন্তর্জাতিক দুটি স্তরে বিভক্ত করে তামাক কর-কাঠামোর জটিলতা আরও বৃদ্ধি করা হলো। তামাকবিরোধীদের সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব গ্রহণ না করে করারোপের পুরানো ও জটিল এডভ্যালোরেম পদ্ধতিই বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী একটি সহজ এবং কার্যকর তামাক কর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০১৬ সালে যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন তারও বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই এবারের বাজেট প্রস্তাবনায়।

প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় উৎপাদনকারী কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত নি¤œ মূল্যস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ২৩ টাকার স্থলে ২৭ টাকা এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত সিগারেটের মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশীয় কোম্পানির ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রায় ৫২ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এডভ্যালোরেম পদ্ধতি বহাল থাকায় এই দুটি পণ্যের মূল্য যতটুকু বাড়বে তার সিংহভাগই যাবে তামাক কোম্পানিগুলোর পকেটে।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের করহার না বাড়িয়ে অর্থমন্ত্রী আবারো আন্তর্জাতিক তামাকপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদান করতে যাচ্ছেন। বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) একমাত্র আন্তর্জাতিক তামাকপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যারা বাংলাদেশে সকল স্তরের সিগারেট উৎপাদন করে। বর্তমানে বাজারে বিএটিবির প্রচলিত সিগারেটের ব্রান্ড রয়েছে ১৪টি, যারমধ্যে নি¤œস্তরের সিগারেট মাত্র ৪টি। সুতরাং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরে সিগারেটের করহার না বাড়ানোর মাধ্যমে প্রকারান্তরে বহুজাতিক তামাক কোম্পনিকে সুবিধা প্রদানের প্রয়াস চোখে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তামাকবিরোধীদের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করে একক স্তরভিত্তিক কর কাঠামো প্রতিষ্ঠার কোনো নির্দেশনা বাজেট ঘোষণায় প্রতিফলিত হয়নি। বহুজাতিক তামাক কোম্পানির পরামর্শেই স্তর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন স্তরের সুবিধা নিয়ে সিগারেট কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ অব্যাহত থাকলো। 

বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি তামাক ব্যবহারকারী ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা ও গুল) সেবন করেন। অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে এগুলোর উপর কর বাড়ানো হয়নি। আমাদের দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষতঃ নারীদের মাঝে এই পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জর্দা-গুল ব্যবহারের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করার কোনো উদ্যোগ বাজেটে নেই, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

বাজেটে বিড়ির শুল্কহার অপরিবর্তিত রেখে ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১৫ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসাথে বিড়ির প্রচলিত ট্যারিফ ভ্যালু বিলুপ্ত করায় বিড়ির কর আদায়ের জটিলতা কিছুটা হলেও সহজ হবে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় আগামী ৩ বছরের মধ্যে বিড়ি উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও বিড়ির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন নেই। কেননা, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বিড়ির মূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানো হলেও এবার মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র ৪১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। 

তবে ই-সিগারেট ও এর রিফিল প্যাকের উপর ১০০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং একই সাথে পণ্য দুটির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ নির্ধারণকে প্রশংসনীয় উদ্যোগ মনে করছে প্রজ্ঞা-আত্মা। এছাড়া ক্রমবর্ধমান তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে তামাক ও তামাকজাত পণ্য রফতানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা এবং গুলসহ সকল প্রকার তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী করদাতার ব্যবসায় হতে অর্জিত আয়ের উপর আড়াই শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপকে ইতিবাচক দেখছে তামাক বিরোধী সংগঠন দুটো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ