বুধবার ১৫ জুলাই ২০২০
Online Edition

সাড়া নেই 

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ : আলীর মন ভালো নেই। কেন ভালো নেই তারও অবশ্য বিস্তর দশা আছে। 

সকালে বউকে বলেছেÑ ‘আমার খুদা পেয়েছে, আমায় এক দু’খানা রুটি বানিয়ে দাও; খেয়েই মাছ ধরতে যাব। 

আলীর বউ মরিয়ম বলে বসেÑ‘এখন রুটি বানাইতে পারুম না; রাতের কড়কড়া ভাত আছে তাই মরিচ ডইলা খাও। 

বউয়ের এমন কথায় নিজেকে আর সংযত রাখতে পারে না আলী। রক্ত উঠে যায় মাথায়। 

রাগত কণ্ঠে বলে- রুটি বানাইয়া দিবি না; ক দিন ধইরা তর খালি নাচন কাচন দেখতাছি; একখান কথা কইলে তুই আমার সে কথা কোনো কানে তোলস না ; কি হইছে তর অ্যাঁ; 

‘কি ওইব; আমার ভালো লাগে না তাই।

‘অত সব বুঝি না; এখন রুটি বানাই দিবি। রুটি খাইয়া মাছ ধরতে যামু। 

‘পারুম না; পারলে বানাইয়া খাও গা।

মরিয়মের কথায় বিকার হয়ে যায় আলী শরীর। কিছু বলতে পারেনা। ভেতর থেকে কেবল জন্ম নেয় তীব্র ক্রোধ।  দিন দিন মরিয়মের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে আলী। অবাধ্য হচ্ছে মরিয়ম। আগের সেই লক্ষ্মী বউ এখন হয়ে গেছে বন্য পাখি। আজকাল বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করছে মরিয়মের। আগের মত পাশে বসে দু’চারটা কথা বলে না। সংসারের প্রতি আগের সেই টান আর দেখেনা বউয়ের মাঝে। যত’ই দিন যাচ্ছে তত’ই নিজেকে মৃত কাক ভাবতে শুরু করেছে আলী। 

এক ঝাক অস্থিরতা নিয়ে ছেলেকে ডাকতে থাকে- ‘মতি, কই রে বাপ, চল মাছ ধরতে যামু; 

বাবার ডাকে ছুটে আসে দুরন্ত মতি। 

‘বাবা, নও যাই গা। 

‘নৌকার বৈঠাটা সাথে নিয়া আয় মতি, আজ কিব্যা জানি বাতাশ বেশি বেশি লাগতাছে। 

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আলী একবার বারেক ফিরে চায় স্ত্রীর দিকে। মরিয়ম কেমন বদলে যাচ্ছে। টের পায় আলী। 

 

বিষণœ মনে যমুনার দিকে ছোটে বাবা-ছেলে। 

দমকা হাওয়া বুকটা নাড়িয়ে দেয় আলীর। নদীর ঢেউয়ের ভেতর কিছু একটা খুজে পেয়ে সহজ হাসির মানুষ তৈরি করে নিজেকে। ছেলেকে নৌকার পানি সেচতে বলে ভেজা বালির কিনারে বসে পড়ে। উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বোবা বিলাপে নিজের শান্তি খুঁজতে থাকে। ভাবে; তার মত দুঃখী মানুষ আর দ্বিতীয়টি নেই জগতে। 

নিবির চোখে ছেলেকে দেখে। প্রচ্ছন্ন এক উদারতায় উঠে দাড়ায় আলী। 

‘মতি; নায়ের পানি শেষ ওইলো কি ?

‘আরেকটু আছে বাবা, তুমি দুয়াইর কয়ডা নায়ে উঠাও।

সব গুছিয়ে নৌকা জলে ভাসায় আলী। বৈঠা হাতে তুলে ঘোলা পানিতে দাগ কাটে। মৃদু ঢেউগুলো বারবার আছড়ে পড়ে নৌকার শরীরে। উদাস মনে ¯্রােতের দিকে নৌকা ছোটে। ছেলেকে দেখে দেখে আলী রহস্যের হাসি হাসে।

‘বাবা; আজ মনে হয় মেলেক মাছ পামু। 

‘আগে যাইয়া নই; তারপর না হয় দেখন যাইব, কি অয়।  

¯্রােতের টানে আলীর নৌকা টাট্টু ঘোড়া মত চলে। ঢেউগুলো দুলিয়ে দিয়ে যায় বাপ ছেলের দ্বিধান্বিত মন। 

ভাসতে ভাসতে মঙলার ডোবার কাছে আসে আলী। এখানেই কাল বেশ কিছু দুয়াইর ফেলে গেছে সে। 

 

চাহিদা চেয়ে বেশি কিছু পেলে মানুষের দুঃখ থাকেনা। আলীর ক্ষেত্রেও হলো তাই। তার ভাগ্যটা সৃষ্টিকর্তা খুলে দিয়েছে আজ। বেশ কিছু মাছ পেয়েছে সে। চিংড়ি, কাজুলী, টেংরাসহ হরেক রকমের মাছ।

অনেকদিন হলো তার চাহিদার মাত্রাটা শূণ্য কোঠায় পড়ে ছিল। আজ সেটা পূরণ হয়ে গেছে। হাজার কৌশল অবলম্বন করলেও শেষমেষ অল্প আলোর রাশিতেই তাকে স্বস্তিতে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আজ পুরোপুরি’ই ব্যতিক্রম। 

ছেলেকে জানায়Ñ

‘মতি; বাপ আজ আর বাড়ি যামু না। রাতে নৌকোতেই ঘুমাইব বাপবেটা। কি বলিস?

‘আচ্ছা; ঠিক আছে বাবা। কিন্তু রাইতে কি খামু। আমার তো খুব খুদা লাগছে বাবা। 

‘কষ্ট কইরা একটু থাক। ফজরের আজান হইলে দোয়াইর তুইলা চইলা যামুগা। দেরি করমু না বেশি।

বাবার কথায় স্বায় দিয়ে যায় ছেলে। 

‘বাবা; তোমায় একটা কথা বলি। 

‘কি কথা ? বল। 

‘আগে কও; তুমি কিছু কইবা না আমায় ?

‘আচ্ছা ঠিক আছে তরে কিছু কমুনা। কথা দিলাম। 

‘জানো বাবা; আজ কয়দিন ধইরা নুরুল কাকা আমাগো বাড়ি ঘনঘন আইসে। মায়ের লগে হাসি হাসি মুখে কিসের যেন কথা কয়। 

ছেলের কথায় আলীর মনে সন্দেহের দানা বাধে। সন্দেহের মূল উপকরণ না পেয়ে ক্ষণিকের জন্য নিজেকে দামিয়ে নেয়।

 

রাতের নদীতে কোনো রকম মায়া থাকে না। আলী জানে। ঝিরিঝিরি বাতাস বহে। মৃদু মৃদু ঢেউগুলো নদীর কিনারের সাথে দুষ্টমিষ্টি খেলায় মজে আছে। আকাশে চাঁদ। অর্ধপূর্ণিমায় ছাওয়া। অল্প আলোর সংসার নিয়েই নদীর জলকে বিকিয়ে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ দূরে দু’-একটা শশুকের লম্ফজম্ফ দেখতে পায় আলী। ‘কি বিচিত্র জগৎ! আল্লাহ্ পৃথিবীকে রকমের সৃষ্টিতে দিয়ে ভরে তুলেছে; তার অন্ত নেইÑ আলী ভাবে। 

ছেলেকে বলেÑ‘মতি; আমি মরে গেলে ঐ আকাশের তারা যাব। 

বাবার মুখে এমন কথা ছেলে মতির মনে খানিক ক্ষতের জন্ম দেয়। একজন সহজ সরল বাবা এমন  কথা কি করে বলে; ভেবে পায় না মতি।

‘বাবা; তুমি এমন কথা কও ক্যান ?

‘বলি; বলি; এমনি বলি রে বাজান। মানুষ কি আর চিরকাল বাঁচে ?

‘না বাবা; বাঁচে না। তয় তুমি বাঁচবা বেশি দিন। আমি দোয়া করি। 

 ছেলের কথা শুনে বিরল দৃষ্টিতে তাকায় আলী। বুঝতে পারে; জগতে তাকে ভালোবাসে কেবল তার ছেলে আর বাকি সবই হাওয়া। 

 

আকাশে বিজলী চমকাচ্ছে। গুড়–ম গুড়–ম মেঘ ডাকে । নেড়ে চেড়ে বসে আলী। 

আকাশের অভিমান বেড়েই চলছে। দু’-এক ফোটা বৃষ্টি আঁচড় দিয়ে যায় আলীর শরীরে। নদীর বুকে রাত যাপনের ইচ্ছেটাও উভে যেতে থাকে। কোনো উপায় না দেখে ছেলেকে বৈঠা হাতে নিতে বলে। ¯্রােতের বিপরীতে নৌকো চালাতে হবে। ব্যাপারটা কষ্টসাধ্যকর। দূরে যেতে হবে বেশ। অস্থিরতার পাহাড় জমে আলীর মনে। পথ অনেক। যেতে যেতে কালবোশেখীর ঝড়ে থাবায় পড়ার সম্ভাবনাও রয়ে গেছে। তাই ছেলেকে জানায়Ñ

‘মতি; আমি গুল টানি; তুই বৈঠা ধরে থাক।

বাবার কষ্টটাকে নিজের করে নিতে মতি বলেÑ

‘না, বাবা; আমি গুল টানি। তুমি নৌকায় বৈঠা ধর।

‘তুই পারবি না’ বলে ছেলেকে বারণ করে। 

নদীর কিনার ঘেষে গুটি গুটি পায়ে গুলতি টেনে যায় আলী। মেঘের ডুমরু বেজেই চলেছে। একটু সময় গেলেই ছুটে আসবে ঝড়। 

মধ্যারাত। ঝড়ের থাবায় আটকে গিয়েছিল বাবা-ছেলে। শরীরটা ভিজে একাকার। ক্লান্তিও জুড়ে বসেছে। সাথে ভয়ের ঘনঘটা। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করেই ফিরেছে তারা। গ্রামের কাছাকাছি আসায় বুকের জমাট বাধা অস্থিরতাকে রাতের গায়ে মেখে দেয়। বড্ড অসহ্য লাগছে আলীর। চারপাশ রাতগ্রস্থ। ব্যাঙ ডাকে। পাড়ার মোল্লার বাড়ির পোষা কুকুরও ডাকে। 

বাড়ির খুব কাছে এসেই চমকে যায় আলী। দূরে দাঁড়িয়ে দেখে; তার ঘরে আলো জ্বলছে মিটি মিটি। এত রাতে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে মরিয়ম। ভেবে পায় না। ধীরে ধীরে পা ফেলে সে। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে কাউকে। থমকে দাড়ায় আলী। শিমুলগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে যায় বাবা-ছেলে। আধারে মুখটা অস্পষ্ট। বুঝতে পারে না ঠিক আলী; ওটা কে ! আলীর ছেলে হঠাৎ বলে ওঠেÑ‘বাবা; ওটা তো নুরুল কাকা। এতো রাইতে আমাগো বাড়িতে ক্যান ? 

ছেলের কথায় আলী কিছুটা দ্বিধান্বিত সে। দৃষ্টি দীর্ঘ করে দেখতে পায় এটা আসলেই নুরুল মিয়া। ভেতরটা অসার হয়ে আসে। স্থীর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সে। ছেলেকে নিয়ে দ্রুতই বাড়ি এসে যায় আলী। এ কী ! এত তাড়াতাড়ি মরিয়ম ঘরের দরজা বন্ধ করেছে। ভেবে পায়না। ছেলেকে বলেÑ ‘মতি; তর মাকে ডেকে তোল। মতি ‘মা; মা; বলে ডাকতে থাকে। কোনো সাড়া নেই। কোনো শব্দ নেই। ডাকতে ডাকতে বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠে মতি। 

‘বাবা; কই মা তো শুনে না। কি করমু ?

‘কিছুই করতে ওইব না। দাড়িয়ে থাক। 

আলী উদ্ভট হরিণের মত ডাকতে থাকেÑ‘মরিয়ম; মরিয়ম; ঘুমাইছো ? আমরা আইছি। কপাট খোলো তো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ