শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ব্যক্তিত্ব ও জীবনবোধ

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ :  সাধারণত কবিরা দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী হয়ে থাকেন। তারা লেখনী এবং বক্তৃতায় যেমন চরিত্রে তার উল্টোটা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু মতিউর রহমান মল্লিক এক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন, তাই লিখতেন। বাস্তব জীবনেও তিনি তারই প্রতিফলন ঘটাতেন। আপাদমস্তক তিনি ছিলেন বিশ্বাসী ঘরানার সত্যসন্ধানী ও মানবতাবাদী কবি। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ-এর মন্তব্যটি এ বিষয়ে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘মতিউর রহমান মল্লিক একজন নিবেদিত প্রাণ মানবতাবাদী কবি ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালে বিরাট একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শুধু কবি-সাহিত্যিক শিল্পী-সংগঠক হিসেবে বড় মাপের ছিলেন না; ব্যক্তি হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত উঁচু স্তরের, মতিউর রহমান মল্লিক সত্যিকার অর্থেই ছিলেন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।’ 

‘অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি’। কথাটি বইয়ের পাতায় ঘুরপাক খেলেও কবি মতিউর রহমান মল্লিকের জীবনে তা ছিল বাস্তবসম্মত। ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার পিছনে মল্লিকের সততা ছিল দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল। জীবনে কোন ধরনের লোভ লালসার ফ্রেমে তিনি আটকা পড়েননি। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সততার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন লোভ-লালসার উর্ধ্বে সত্যিকার এক নির্ভেজাল মানুষ। দুনিয়ার প্রতি তাঁর আকাঙ্খা ততটুকু ছিল যতটুকু নিয়ে আল্লাহর দীনের পথে চলা যায়। আল্লাহর দীনের জন্য তিনি ছিলেন উৎসর্গিত প্রাণ। 

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের একটি বড় পোষাক ছিল বিনয়। অত্যন্ত বিনয়ী এ কবি সব সময় নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন। যে কোন অনুষ্ঠানে কিংবা যে কোন গুণিজন অথবা সভা সমাবেশে তিনি নিজেকে খুব কম জানাশোনা লোক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। বৃক্ষ যত বেশি বড় হয়, যত বেশি ফলবান হয় তার মাথা ততবেশি মাটির দিকে নূয়ে পড়ে, বিনয়ী হয়; কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন বিনয়ী ফলবান বৃক্ষ। সংস্কৃতিকেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে মঞ্চে বসানো অনেকটা কষ্টকর ছিল। তিনি একজন সাধারণ সংস্কৃতি কর্মীর মতো অন্যান্যদের খেদমত করতে পছন্দ করতেন। তিনি যখন কাউকে অন্যের সামনে পরিচিত করে দিতেন তখন তার বিভিন্ন গুণকে উদ্ভাসিত করে অনেক বড় গুণি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। হৃদয়ের গভীরতা, জ্ঞানের প্রশস্থতা এবং বিনয়ের পরাকাষ্ঠা ছাড়া এমনটি সম্ভবই নয়। এক্ষেত্রে সমকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি আল মাহমুদ বলেন, ‘জ্ঞান হলো আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের বিষয়। তিনি যাকে তা দান করেন তার চেহারাটাই একটু অন্যরকম থাকে। সম্ভবত সেই চেহারা কবি মতিউর রহমান মল্লিকের মতোই নিষ্পৃহ, অহঙ্কারহীন ও বিনয়ী হবে হয়তো।’ সত্যিই তিনি ছিলেন বিনয়ী মানুষের একনিষ্ট প্রতিকৃতি।

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ছিল একটি দরদী মন। প্রতিটি হৃদয়কোষে দরদ আর ভালোবাসা বিচরণ করতো সব সময়। খাঁটি এ হৃদয়ে মানুষের কল্যাণ-ভাবনা ঘুরপাক খেতো নিয়মিত। অন্যরা মেধা ও যোগ্যতায় এগিয়ে আসুক-এটা তিনি সব সময় কামনা করতেন। কারো কোন মেধার সাক্ষর পেলে তিনি তা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অনেক বড় করে উপস্থাপন করতেন। বিশেষত মফস্বল অঞ্চলের কোন কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি কর্মী তাঁর কাছে গেলে তিনি তার লেখা দেখে, গান শুনে অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন। তাকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে উৎসাহিত করতেন তিনি। কারো কোন বই প্রকাশ পেলে তিনি নতুন বই হাতে নিয়েই হৃদয়ের সমস্ত উচ্ছ্বাস উজাড় করে দিয়ে তাঁকে মিষ্টি খাওয়াতেন, বইয়ের টাকা বাবদ পকেটে হাত দিয়ে যতটুকু সম্ভব বেশি দিয়ে দিতেন। পকেটে টাকা না থাকলেও অন্যের কাছ থেকে ধার নিয়ে হলেও লোককে উৎসাহিত করতেন। সুযোগ হলে দ্রুত ব্যানার বানিয়ে সেই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করে পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে দিতেন। অন্যকে বড় করে উপস্থাপনের মধ্যেই তিনি অফুরন্ত সুখ ও আনন্দ অনুভব করতেন।

 কবি আসাদ বিন হাফিজের ভাষায়- 

বুকভরা মায়া তার চোখে আলো ঝিকমিক

সকলের প্রিয় ভাই, প্রিয় কবি মল্লিক।

‘ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ’ কথাটি কবি মতিউর রহমান মল্লিকের চরিত্রের সাথে পুরোপুরিভাবে মানিয়ে যায়। নিজের সংসারে অভাব থাকলেও অন্যের অভাব পূরণে তিনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। যে কোন কবি-সাহিত্যিক কিংবা সংস্কৃতিকর্মী কিংবা সংস্কৃতি কর্মীর উদ্ধৃতি দিয়ে যে কোন লোক তাঁর অফিসে গেলে তিনি তাকে আতিথেয়তা দিতেন পুরোপুরি। তার কোন অভাব থাকলে তিনি প্রয়োজনে পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাকে সাহায্য করতেন। সংস্কৃতিকর্মী ছাড়াও কারো চিকিৎসা সেবা, কারো চাকরির ইন্টারভিউ, কারো ভর্তি পরীক্ষা এরকম হাজারো কাজে অনেকে অফিসে এসে থেকেছেন। মল্লিক তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এছাড়াও গরীব ছাত্রদের ফরম ফিলাপ, বই কেনা প্রভৃতি কাজেও প্রচুর সহযোগিতা করতেন তিনি। নিজের খাবারের টাকা না থাকলেও অন্যের খাবারের ব্যবস্থা করতে তিনি  প্রয়োজনে ঋণ করতেন। তিনি না খেয়ে কষ্ট করে দিন পার করে দিতে পারতেন। নিজের অভাবের কথা কখনো কাউকে বলতেন না। আর নিজের অভাব অনটনে কখনো তিনি খেই হারাতেন না। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে নির্দিধায় সামনে চলতেন তিনি। কবি নয়ন আহমেদ এর কবিতায়-

মল্লিকের দিকে তাকালে একটা সম্পূর্ণ ভোর দেখতাম। 

সূর্যসমেত লাল উদ্দীপনা 

আঁধার কেটে গিয়ে একটা স্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, 

কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসার মূর্ছনা।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। তাঁর মনে কোন কুটিলতা কখনো বাসা বাঁধতে পারেনি। তবে তিনি ভেতরে ভেতরে ছিলেন ভীষণ অভিমানী। সে অভিমান তাঁকে কখনো কখনো একরোখা বানিয়ে ফেলতো। এ ধরনের আচরণ অনেক সময় স্বৈরাচারের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হলেও সত্যিকার অর্থে কোন খারাপ উদ্দেশ্যে তিনি কখনো এমনটি করতেন না। শিশু মনের অধিকারী মানুষেরা সহজেই জেদী হয়ে ওঠেন এবং সহজে খুব কষ্ট অনুভব করেন, কবি মল্লিকের ভেতর এ স্বভাবটিও ছিল। তবে তাঁর মনের জমিনটা ছিল খুবই সবুজ। মুক্ত বিহঙ্গের মতো প্রাণবন্ত থাকতে পছন্দ করতেন তিনি। সবুজাভ মধুর পরিবেশ পেয়ে তিনি পাখির মতো ডানা মেলতেন। প্রাণ খুলে হাসতেন, রসিকতা করতেন। গ্রামীণ পরিবেশ, নদীর কিনার কিংবা ঐতিহাসিক কোন স্থানে গেলে তিনি নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারতেন না। পাখির মতো পাখনা মেলে উড়ে বেড়াতে চাইতেন। আবৃত্তি করতেন মজার মজার কবিতা, কণ্ঠে ধরতেন সুমধুর গান।

হালকা পাতলা গড়নের সহজ সরল অনাড়ম্বর এক শাদামাটা মানুষ ছিলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। অবিচল বিশ্বাস, পরিচ্ছন্ন মনন ও গভীর মনীষার অধিকারী সক্রিয় চেতনার এ মানুষটির কণ্ঠে ছিল মধু। কি বক্তৃতা, কি আবৃত্তি, কি তিলাওয়াত; অসাধারণ এক আকর্ষণ ছিল তাঁর কণ্ঠে। যে কোন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, সাহিত্যাড্ডা, আলোচনা অনুষ্ঠান এমনকি টেবিলের আলোচনায় তাঁর কণ্ঠে যেন মুক্তো ঝরতো। অবিরাম বর্ষণের মতো শাওনের বারিধারা ছুটে চলতো তাঁর কণ্ঠ থেকে। বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে প্রয়োজন মতো কুরআন, হাদীস ও কবিতার উদ্ধৃতি টানতেন। ইতিহাসের গলিপথ ঘুরে ফিরে তিনি তুলে আনতেন বক্তৃতার যাদু। ইতিহাসের উদ্ধৃতি টেনে টেনে তিনি শ্রোতা ম-লীকে মুগ্ধ করে দিতেন। সাধারণত এক ঘন্টার কমে তাঁর বক্তৃতা শুনে তৃপ্তি মিটতো না। কখন যে সময় কেটে যেতো শ্রোতারা অনুমানই করতে পারতো না। তাঁর বক্তৃতার গুণমুদ্ধ শ্রোতা কবিবন্ধু হাসান আলীম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মতিউর রহমান মল্লিকের বক্তৃতা কখনো কখনো গভীর গবেষণা দীপ্ত প্রবন্ধের মতো হয়ে যেত। সাহিত্যের বক্তৃতা ছাড়াও ধর্ম-দর্শন নিয়েও অসাধারণ বক্তৃতা এমনকি ওয়াজ নছিহত পর্যন্ত করতে পারতেন। এক্ষেত্রে তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে অনুসরণ করতেন।’ দারসে কুরআন পরিচালনাতেও তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। যেমন ছিল সুমধুর কন্ঠের তিলাওয়াত তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত রসালো তাফসীর শ্রোতা ম-লীকে মুগ্ধতায় বেঁধে রাখতো।

সুন্দরের সকল আয়োজনই শিল্প; আর সুন্দরের নির্মাতাগণই শিল্পী। এ কাজে যিনি যত মহৎ শিল্পকর্ম উপস্থাপন করতে পারেন তিনি তত বড় শিল্পী। বিশ্বাসী মানুষেরা তাই মহান স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে এবং অবিশ্বাসীরা প্রকৃতিকে সবচেয়ে বড় শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। মানুষ কোন কিছু সৃষ্টি করতে না পারলেও স্রষ্টার মূলসূত্রকে অবলম্বন করে নতুন নতুন বিষয়কে নিজস্ব ঢঙে আবিষ্কার করেন। এজন্য মানুষের নির্মাণকেও এক ধরনের সৃষ্টি বলে আখ্যা দেয়া হয়। সাধারণভাবে সকল সৃষ্টিকর্মই শিল্পের আওতায় আনা হয়ে থাকে। তবে তাতে মননশীলতা ও নান্দনিকতার ছাপ যত বেশি থাকে তাকে তত সফল শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটা হতে পারে কোন বস্তুগত শিল্পকর্ম কিংবা মানবীয় ও জৈবিক শিল্পকর্ম। একজন শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম এবং মানবিক স্বত্ত্বার মধ্যে যদি সমন্বয় ঘটে তবে তিনি হয়ে ওঠেন অমর শিল্পী। আর সে কারণেই মতিউর রহমান মল্লিককে একজন অমর শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। লেখনী, কণ্ঠ এবং সমাজ বাস্তবতায় তিনি ছিলেন একাকার। তাঁর কলমে যেমন আবিস্কৃত হয়েছে-  ‘যে কোন কাজ করো না ভাই যে কোন কাজ করো/ তা যেন হয় সবার চেয়ে সবচেয়ে সুন্দরো’ তেমনি বাস্তব জীবনেও তিনি সুন্দরকে বেছে নিতে আমৃত্যু সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর প্রতিটি কাজই ছিল শিল্পসম্মত। খাওয়া, গোসল, গোসল শেষে কাপড়টা শুকানোর জন্যে মেলে দেয়া, অফিসের টেবিলে খাতা-পত্র রাখা, চুল-দাড়ি আঁচড়ানো, এমনকি তাঁর হাসিও ছিল শিল্পসম্মত।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আড়ালপ্রবণ মানুষ ছিলেন। নিজেকে লুকিয়ে রাখার মধ্যেই যেন সুখ খুঁজে পেতেন তিনি। তবুও সারা দেশের মানুষ তাঁকে সামনে টেনে এনেছেন. হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে তাঁকে সম্মাণিত করার চেষ্টা করেছেন। দেশের বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে পুরস্কৃত করেছে নানা আঙ্গিকে। বর্ণাঢ্য সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জীবনে তিনি সর্বমোট ১৩টি পুরষ্কার পেয়েছেন। বাগেরহাটের সবুজ মিতালী সংঘ সাহিত্য পুরষ্কার, ঢাকা জাতীয় সাহিত্য পরিষদ স্বর্ণপদক, ঢাকা কলমসেনা সাহিত্যপদক, লক্ষীপুর সাহিত্য সংসদ সাহিত্য পুরষ্কার, রাঙ্গামাটি সাহিত্য পরিষদ সাহিত্যপদক, বাগেরহাটের খান জাহান আলী শিল্পীগোষ্ঠী সাহিত্য পুরস্কার, সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ সাহিত্যপদক, প্যারিস সাহিত্য পুরস্কার, বায়তুস শরফ সাহিত্য পুরস্কার, কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরষ্কার, ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রাম ইসলামী সংস্কৃতি পুরষ্কার, বাংলা সাহিত্য পরিষদ ফ্রান্স সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি। এসব পুরস্কার তাঁকে আরো বেশি বিনয়ী করেছে, করেছে আরো বেশি উদ্যমী ও সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমিক মানুষ।

সাহিত্য সংস্কৃতির টানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। বিশেষত, ইউরোপের ইয়ং মুসলিম অর্গানাইজেশন এর আহ্বানে ১৯৮৫ সালে বৃটেন, স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়ার বার্ষিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ১৯৯২ সালে ভারত, ২০০০ ও ২০০১ সালে ইকবাল পরিষদ আয়োজিত সেমিনারে ভারত, ২০০২ সালে ফ্রান্সের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের আমন্ত্রণে ফ্রান্স এবং সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অতিথি হিসেবে ২০০২ সালে সিঙ্গাপুর এবং ২০০৩ সালে সৌদি আরব সফর করেন।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন একজন ইনসানে কামিল বা পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি তাঁর কবিতা গান, বক্তৃতা ও জীবন দর্শনে সকল মানুষকে ইনসানে কামিল হিসেবে দেখতে চাইতেন। তিনি কোন মানুষকে আলাদা চোখে দেখতেন না। উদার মন নিয়ে তিনি ইতিহাসের ব্যাখ্যা করতেন। ইসলামের বিভিন্ন মতবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অবদানও তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করতেন। বিশেষ করে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান আছে তিনি তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অগ্রগামী ছিলেন। প্রেক্ষণ সম্পাদক খন্দকার আবদুল মোমেন বলেন, ‘অনেক গুণে গুণান্বিত কবি মতিউর রহমান মল্লিক ইনসানে কামিল হওয়ার সাধনায় দিনযাপনে ছিলেন সদা তৎপর। তাঁর তৎপরতার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসলামী জীবনাদর্শনের রূপায়ন। কি কবিতায়, কি গানে, ইসলামী ধ্যান ধারণার এক অপরূপ শিল্পীত বিকাশ লক্ষ্য করা যায় তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে।’ 

অতিসংক্ষিপ্ত পরিসরে সার্বিক মূল্যায়নে সন্দেহাতীতভাবেই উচ্চারণ করা যায়, কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কলমে এক অসাধারণ বৈচিত্রতেজ লক্ষনীয়। তাঁর কবিতায় গীতলতার স্বাভাবিক আবহ চোখে পড়লেও গান ও কবিতার ভাঁজে ভাঁজে পার্থক্যের দেয়াল খুব শক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আবর্তিত তৃণলতা, অনবরত বৃক্ষের গান, তোমার ভাষায় তীক্ষè ছোরা, চিত্রল প্রজাপতি, নিষণœ পাখির নীড়ে কিংবা ছড়াকাব্য রঙিন মেঘের পালকির সাথে গানের সংকলন ঝংকার ও যতগান গেয়েছি’র মধ্যে পার্থক্যের প্রাচীর খুব মজবুত। কাব্যের শব্দগাঁথুনিতে গীতলতার দোলা থাকলেও তা গানের শব্দভঙ্গি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন স্বাদের। এখানেই কবি মল্লিক এবং গীতিকার মল্লিকের এক অসাধারণ বৈচিত্রঘ্রাণ ভেসে আসে। মল্লিকের গানের ভাষা থেকে তার কাব্যভাষা সম্পূর্ণ আলাদা, স্মার্ট, সুন্দর ললিত এবং অনেক ক্ষেত্রে তৎসম তদ্ভব শব্দগুচ্ছে আবৃত। লালিত্যে, চিত্র-কল্পে, অলঙ্কারে মল্লিকের কবিতা মল্লিকাময়।

কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী কবি মতিউর রহমান মল্লিক। প্রতীতি ১ এবং প্রতীতি ২ তাঁর স্বকণ্ঠে গাওয়া অডিও এ্যালবাম। বিশ্বাসী চেতনাকে শাণিত করার প্রয়াসে নির্মিত এ এ্যালবাম দীর্ঘ দুই দশক একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেছে বলা যায়। গানের ভাষা, সুর-কন্ঠ এবং প্রতীকের মোহনীয় ব্যবহার তৃষিত হৃদয়কে তৃপ্ত করে তোলে। এছাড়াও যে সব এ্যালবামে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন সেখানেও তাঁর কন্ঠের স্বাতন্ত্রতা অতি সহজেই অনুধাবন করা যায়। সত্যিকার অর্থে সফল গীতিকার-সুরকার ও শিল্পী হিসেবে সঙ্গীত জগতেও তিনি একজন অমর ব্যক্তিত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ