শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

কবি নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ ও ‘আমরা মানুষ’

এইচ এম জোবায়ের : কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবি। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য ও বিরল প্রতিভার এক বিস্ময়কর বিচ্ছুরন। তিনি সাম্যের কবি, মানুষের কবি, মানবতার কবি। তিনি মুসলিম কবি, মুসলমানদের কবি। সংকটে, নিমজ্জনে তিনি কলম ধরেছেন। কলম ধরেছেন ইংরেজ ও দেশীয় জমিদারদের জুলুম, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে। যখন কলম ধরার কেউ ছিল না তখন তিনি মুসলমানদের পক্ষে কলম ধরে মুখ রক্ষা করেছেন। তিনি লিখার জন্য লিখেননি। তিনি লিখেছেন বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে। দেশ, কাল, পাত্র, বর্ণ, গোত্র নয় তিনি ‘মানুষ’ নামের অধিকারী মানুষের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। মানুষকে তিনি সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। মানুষের উপর মানুষের বৈষম্য, অত্যাচার তাকে খুব কষ্ট দিত। সামাজিক অত্যাচার, অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার ছিলেন। যে রচনাসমূহ তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছতে সহায়তা করেছে তার মধ্যে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ অন্যতম। এই কাব্যগ্রন্থের ‘মানুষ’ কবিতাটি কবির সাম্য ও মানবতাবাদী হওয়ার পরিচয় বহন করে। সেই ‘মানুষ’ নিয়েই আজকের আলোচনা।

গাহি সাম্যের গান

কবি কাজী নজরুল ইসলাম অর্থ-বৈভব, ধনী দেশ-গরীব দেশ, বড় চাকরি-ছোট চাকরি ইত্যাদির কারণে সমাজে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন। একজন মানুষ অপর আরেকজন মানুষের উপর প্রভুর মত আচরণ করবে, তাকে গোলাম বানিয়ে রাখবে ইসলাম এটিকে কোন ভাবেই অনুমতি দেয় না। মানুষের অনেক মর্যাদা। মানুষে মানুষে যে অসম ভেদাভেদ, বৈষম্য, অনাচার-অবিচার তা দূর করতেই ইসলামের আগমন। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সামনে মাথা নত করতে পারেনা। মানুষের মাথা নত হবে শুধু তার ¯্রষ্টা আল্লাহ তায়া’লার সামনে। জাতীয় কবি ইসলাম ধর্মের এই শিক্ষাকেই কাব্যে রূপ দিয়েছেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত কাব্যিক ছন্দে। তিনি বলেছেনÑ 

“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।” 

এবাদতগৃহগুলো সকল মানুষের জন্য

কাজী নজরুল ইসলাম দেখতে পান ধর্মীয় ঘরগুলো সংকীর্ণ অর্থে কিছু কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যেন তারা নিজেরা কয়েকজন সে সবের মালিক বনে গেছেন। খাদেম, মোক্তার, মোতাওয়াল্লি, পূজারী, ঠাকুর ইত্যাদি নামের কতিপয় লোকদের হাতে এবাদতগৃহগুলো ব্যক্তি সম্পদে পরিণত হয়েছে। তারা নির্দিষ্ট কয়েকজন সে সবের সব আয়-ব্যয়ের মালিক হয়ে আছেন। উপাসনালয়ের সমস্ত উপঢৌকন, নজর-নেওয়াজের একমাত্র হকদার যেন তারাই। এবাদতগৃহগুলো যেন আজ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও সমস্যা মোচনকারী মহান ¯্রষ্টার নয়, সেগুলো তাদেরই হয়ে গেছে যারা এর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। যেন তাদের কাছেই সমস্ত চাওয়া চাইতে হবে। তাদের কাছেই পেশ করতে হবে সব উপঢৌকন। এবং সেগুলোর দাম, মান ও পরিমানের উপর নির্ভর করবে সওয়াল কারীর সাথে তাদের আচার-আচরণ। বিদ্রোহী কবি নজরূলের এটা একদম সহ্য হয়নি। তিনি স্ব-বেগে বলে দিলেন- 

“ভুখারি ফুকারি’ কয়,

‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’”

মসজিদে-মন্দিরে মানুষ যে ‘তাবারক’ দেয় তা মূলত মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের জন্যই দেন। সেই সাথে সেখানকার খাদেমদের জন্য তারা আনেন। কিন্তু অবস্থা এমন হয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে যত কম দিয়ে বিদায় করে নিজেদের জন্য যত বেশী রেখে দেয়া যায়। নজরুলে জাতের সাথে এটি মিলেনি। তিনি বলে দিলেন- 

“তেরির্য়া হইয়া হাকিল মোল্লা---“ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,

ভুখা আছ মর গো-ভাগারে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”

ভুখারি কহিল, “না বাবা!” মোল্লা হাঁকিল,---“তা’ হলে শালা,

সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!”

ক্ষুধার্তকে অন্নদান 

ক্ষুধার্ত একজন ভিক্ষুক জীর্ণ বস্ত্রে, শীর্ণ গাত্রে এলো উপাসনালয়ের খাদেমের কাছে। খাদেম তাকে খাবার দেয়ার পরিবর্তে নামাজ পড়ে কি না সে প্রশ্ন করল। এটা ইসলামের নীতির বিপরীত। ক্ষুধার্তকে খাবার দান করা রাসূলের (সা.) অন্যতম সুন্নত। ক্ষুধা পেটে অনেক সময় ইবাদতেও মন বসে না। তাই কোন ‘সায়েল’ বা ‘মাহরুম’ খাবার চাইলে আগে বিনা প্রশ্নে তাকে খাবার দিতে হবে, এটি ঐ ব্যক্তির অধিকার। এরপর সয়ম-সুযোগ বুঝে তার সাথে ধর্মের অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হতেই পারে। নজরুল এই কবিতাটি লিখেছেন আজ থেকে অন্তত ৬৫ বছন আগে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় নজরুরের সেই প্রতিবাদ করার প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। উপাসনালয় ছাড়াও বিভিন্ন ফাংসনের উদ্বৃত্ত খাবার ক্ষুধার্তদের মাঝে বিলিয়ে না দিয়ে রেখে দেয়া হয় হয়তো পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়দের জন্য। অবশ্য তাদের হক থাকতে পারে কিন্তু উপস্থিতদের হক তাদেরও উপরে। 

পাশাপাশি এই ধারণা মনে বদ্ধমূল রাখা প্রয়োজন যে কোন কিছুরই একচ্ছত্র মালিক আমি নই। সবকিছুর নিরংকুশ মালিক হচ্ছেন আল্লাহপাক। তিনিই সকলের আহার যোগিয়ে থাকেন। হাশরের দিন তিনি মানুষকে বলবেন- তাঁর হয়ে তারা ক্ষুধার্তকে অন্নদান করেছিলো কি না? সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা ক্ষুধার্তকে অন্ন না দিয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেন তাদের গালে প্রচন্ড চপেটাঘাত করেছেন নজরুল। স্বভাবসুলভ বীরের ভঙ্গিতে তিনি বললেন-

“কোথা চেঙ্গিস, গজনী মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?

 ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া দ্বার!

 খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?

সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!”

নামধারী ধার্মিকের জন্য ঘৃণা

যেসব মানুষ ধর্মকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করেন তারা আসলে প্রকৃত ধার্মিক নন। প্রকৃত ধার্মিক কখনই ‘সায়েল’কে ধাম করে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন তার সম্পদে বঞ্চিতের অধিকার আছে। আর পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো কোন পূজা-অর্চনার বিষয় নয়। গ্রন্থের শিক্ষার আলোকে জীবন গড়াই আসল উদ্দেশ্য। গ্রন্থগুলো মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য এসেছে। গ্রন্থের জন্য মানুষ নয় বরং মানুষের জন্য গ্রন্থ এসেছে। যারা মুখে মুখে ধর্মের গুণকীর্তন করেন, ধর্মের কথা বলে নিজেদের জাগতিক সুবিধাদি আদায় করতে চান তারা ধার্মিক বেশে অধার্মিক। কবি নজরুল ইসলাম এদেরকে সহ্যই করতে পারতেন না। তিনি আসমানী কিতাব নাযিলের মূল রহস্য বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এ গ্রন্থ কালো-সাদা গিলাফ দিয়ে আবৃত করে রেখে শুধু চুমু খাওয়ার জন্য আসেনি। এগুলো এসেছে মানুষের মন থেকে সমস্ত সংকীর্ণতা দূরে ফেলে দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গড়তে। তিনি অধার্মিকদের সাবধান করে দিয়ে বলেন-  

“মানুষেরে ঘৃণা করি’

ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’

ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।

পূজিছে গ্রন্থ ভ-ের দল! মূর্খরা সব শোনো,

মানুষ এনেছে গ্রন্থ;---গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!”

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নাই

কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের উপর মানুষের খোদাগিরিকে লাথি মেরে তাড়াতে চেয়েছেন। সকল মানুষ সমান। বেঁচে থাকার জন্য সকলের অধিকার সমান। জগতে যত মনীষী এসছেন তারা পৃথিবীর সম্পদ। নবী-রাসূলগণ (আ) সকলের জন্যই সমান। প্রথম মানুষ আদম (আ) থেকেই আজকের সব মানুষের উৎপত্তি। গোড়ায় ফিরে গেলে আমরা সবাই এক আদমেরই সন্তান। আজকে পথ হারানোর কারণে যে ধর্মীয় বিভাজন তৈরী হয়েছে তার কারণে মানুষকে ঘৃণা করা সমীচীন নয়। কারন ধর্মের নাম নিয়ে যদি কেউ অধর্ম ও অনৈসলামীক কাজ করে যায় তবে সে শুধু মুসলমান নামধারী বলেই তাকে শ্রদ্ধা-সালাম দেয়া জরুরী নয়। আবার অন্য ধর্মে জন্ম নিয়েও যদি কেউ সঠিক ধর্ম বুঝতে পেরে তার অনুসারী হয়ে যায় তবে তাকেও আর হেয় চোখে দেখার কোন কারণ থাকতে পারে না। বাহ্যিক রূপটি আসল নয়। আসল হচ্ছে তার ভেতরের বিশ^াস ও সে বিশ^াসের যথাযথ লালন। বেশ-ভূষায় মন্দ দেখা গেলেও ভেতরে, গোপনে-গোপনে কার সাথে কতটা তার ¯্রষ্টার যোগাযোগ আছে তা বুঝা যায় না। তাই বাহ্যিক চেহারা-পোশাক দেখেই কারো সাথে ভাল আর কারো সাথে খারাপ আচরণ শোভনীয় নয়। নজরুল ইসলাম বলেন-

“কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?

হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!”

‘কর্মক্ষেত্র’ মূল্যায়ণের একমাত্র বিষয় নয়

মানুষে মানুষে শিক্ষা-দীক্ষা ও যোগ্যতার কারণে কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হতে পারে। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রফেসনটি বড় নয়। আসল ব্যাপার হল সে যে কাজে নিয়োজিত ছিল সেখানে থেকে সে তার ¯্রষ্টাকে চিনতে পেরেছে কি না? কাজটি নগন্য হলেও সে যদি তার হক আদায় করে দায়িত্ব পালন করে তবে তাতেই তার স্বার্থকতা নিহীত। এজন্য শুধু কর্মের পজিসন ও ধরণ দেখে কাউকে মূল্যায়ন করলে ভুল হতে পারে। ছোট কোন কর্মজীবির ঘরেও আসতে পারে জগৎ কাঁপানো কোন ব্যক্তিত্ব। আবার আজ ছোট কর্মস্থল থেকে আগামীকাল হয়ে যেতে পারে বড় কোন কর্তা ব্যক্তি। রাখাল-বাদাম বিক্রেতা থেকে তো এ সময়ে এসেও রাজা-বাদশা হচ্ছেন। সে ইতিহাস কারো অজানা নয়। তাই নজরুল ইসলাম নিজস্ব ভাষায় বলেছেন- 

“চাষা ব’লে কর ঘৃণা!

 দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!

যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,

তারাই আনিল অমর বাণী---যা আছে র’বে চিরকাল।”

 লোভ ও স্বার্থচিন্তার ঊর্র্ধ্বে মানবসেবা

সংকীর্ণ চিন্তার মানুষ চিন্তা করে- কাউকে স্বার্থ ত্যাগ করে কিছু দিলে নিজের কমে যাবে। চিন্তাটি সঠিক নয়। দান করলে বা অনাহারীকে আহার করালে নিজের সম্পদ বাড়ে। সম্পদের প্রকৃত মালিক খুশি হয়ে অবশিষ্টাংশে বরকত ঢেলে দেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে মানুষের মান-মর্যাদা সম্পদের উপর নির্ভর করে না। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ভেতরকার মনুষ্যত্বের ও অনুগত হওয়ার উপর নির্ভর করে।  যাকে আমি কিছু না দিয়ে তাড়িয়ে দিলাম হয়তো সে তার মালিকের কাছে অতি প্রিয়, একান্ত কাছের। কবি নজরুল ইসলাম সম্পদ জমিয়ে রাখা লোভীদের ধিক্কার করেছেন। তাদেরকে মানুষরুপী পশুর সাথে তুলনা করেছেন। মানুষ কবিতার শেষদিকে তিনি বলেন- 

“বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,

নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।

মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত-সুধা,

তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?

 তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দদরীই জানে

 তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে!

 তোমারে কামনা-রানী

যুগে যুগে, পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ