বুধবার ১৯ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

আজ বিশাল ঘাটতির বাজেট উপস্থাপন

মিয়া হোসেন : আজ বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ বাজেটের আকারও বড় আর ঘাটতিও সবচেয়ে বেশী। প্রস্তাবিত চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি রয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ সংস্থান করতে ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ বাজেট বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে চতুর্থ বাজেট এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এগারোতম বাজেট। অবশ্য এরশাদের আমলেও তিনি দুটি বাজেট দিয়েছিলেন।

এই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোসহ বেশকিছু জনবান্ধব উদ্যোগের ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। অবশ্য বাজেটে সবচেয়ে বেশি আলোচনার স্থান পেয়েছে নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন বাস্তবায়নের ইস্যুটি। এখনও এই ইস্যুতে ব্যবসায়ীরা ও অর্থমন্ত্রণালয় বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে আমানতে আবগারি শুল্ক প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার খবরটিও এখন আলোচনায়। ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ার পর নতুন করে আবগারি শুল্ক আরোপের খবরে উদ্বেগে পড়েছেন ব্যাংক আমানতকারীরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্র বলছে, নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় দুই লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আসবে দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে সংগ্রহ করা হবে ৮৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। আয়কর খাত থেকে আসবে ৮৬ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা এবং শুল্ক খাত থেকে আসবে ৭৩ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, ভ্যাট খাতে চলতি বছরের চেয়ে আগামী অর্থবছরে ৩৫ শতাংশ বেশি টাকা আদায় করার চেষ্টা থাকবে সরকারের। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাতে সংশোধিত লক্ষ্য ঠিক করা আছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে তিন লাখ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে সোয়া দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে মোট আয়করের ১০ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। বাজেটে সারচার্জের আওতা সীমা আড়াই কোটি টাকা করা হতে পারে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের উৎসে কর ০.৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

এছাড়া বাজেটের এক লাখ ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা ঘাটতি মেটাতে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হবে ব্যাংক খাত, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক খাত থেকে নেওয়া ঋণের ওপর।

প্রস্তাবিত এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং জিনিসপত্রের দাম সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে। বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হবে ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভর্তুকি বাবদ থাকছে ৯ হাজার কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকবে। সঞ্চয় উৎসাহিত এবং পেনশনারদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো হচ্ছে না। তবে বাজেটের পরে কমানোর ঘোষণা আসবে।

আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে ৯৬ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এটি মূল এডিপি হিসেবে পরিচিত। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে এডিপির আকার এক লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা হবে।

আগামী অর্থবছরের মূল এডিপির বরাদ্দ চলতি এডিপির চেয়ে সাড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা বেশি হচ্ছে। আর সার্বিক এডিপির আকার বাড়বে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

আসছে নতুন অর্থবছরে মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হওয়া শুরু করবে। এ জন্য জাতীয় অগ্রাধিকার বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। অগ্রাধিকার ফাস্ট ট্র্যাকের প্রকল্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের বাজেটে। এজন্য চলমান আট মেগা প্রকল্পে ৩৩ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা এবং পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পে ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। এ ছাড়া মেট্রোরেল নির্মাণে বরাদ্দ থাকতে পারে ৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে।

এর বাইরে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন খাতে ৪১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিদ্যুত খাতে ১৮ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা (১২.৩০%), শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ১৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা (১০.৮৭%), ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে ১৪ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা (৯.৭৫%), বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা (৯.৪২%), পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা (৮.৫৮%), স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ১০ হাজার ২০১ কোটি টাকা (৬. ৬৫%) এবং কৃষি খাতে ৬ হাজার ৬ কোটি টাকা (৩.৯২%) রয়েছে। নতুন অর্থবছরে এডিপিতে সব মিলিয়ে প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে এক হাজার ৩১১টি।

বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আগামী বাজেটে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি আলাদাভাবে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দও বাড়ছে। মাসিক ভাতার পরিমাণ ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উৎসব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসছে বাজেটে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমানোর কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশই থাকছে। তবে বর্তমানে সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে কিংবা ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দেওয়া বেশকিছু পণ্য ও সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতি দিতে যাচ্ছে সরকার। বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত খাতের সঙ্গে শেষ সময়ে এসে কৃষি, খাদ্য, শিক্ষাসহ আরও দুই শতাধিক পণ্য ও সেবা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে ১৭০টি পণ্য বাদে বাকি এক হাজার ৩৪৯টি আমদানিকৃত পণ্যের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসছে সরকার।

এছাড়া ব্যাংকে আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক দ্বিগুণ হচ্ছে। ২০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জমার ওপর দেড়শ’ টাকার স্থলে দুইশ’ টাকা দিতে হবে। অবশ্য একটি সূত্র বলছে, এক লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি শুল্কমুক্ত রাখাও হতে পারে। তবে এক লাখ টাকার ওপরে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর বিদ্যমান পাঁচশ’ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা গুণতে হবে। ১০ লাখ টাকার ওপরে ও এক কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপরে দেড় হাজার টাকার স্থলে তিন হাজার টাকা, এক কোটির ওপরে ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির ওপর সাড়ে সাত হাজার টাকার স্থলে ১৫ হাজার টাকা, ৫ কোটির ওপরে যে কোনও পরিমাণ অর্থের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকার স্থলে ৩০ হাজার টাকা।

চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ