বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

নতুন সভ্যতাই এখন সময়ের দাবি

মুসলমানদের পবিত্র মাস রমযান শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এক নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মুসলিম মহিলাদের হয়রানি করার সময় বাধা দেয়ায় দুই ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে এক দুর্বৃত্ত। গত শুক্রবার দেশটির অরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড শহরে এ ঘটনা ঘটে। পোর্টল্যান্ড পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে চারটায় যাত্রীবাহী ট্রেনের হলিউড ট্রানজিট পয়েন্টে দুই মুসলিম নারীর উদ্দেশ্যে জাতি ও বর্ণবিদ্বেষমূলক কিছু কদর্য বাক্য উচ্চারণ করে এক ব্যক্তি। এর প্রতিবাদ করেন পাশের তিন যাত্রী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই ব্যক্তি তিনজনকেই ছুরিকাঘাত করে। এতে দু’জন নিহত হন এবং একজন আহত অবস্থায় বেঁচে আছেন। ছুরিকাঘাত করে হামলাকারী দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে যায়। তবে কিছুক্ষণ পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। খবরটি পরিবেশন করেছে গার্ডিয়ান ও বিবিসি।
হামলাকারী জেরেসি জোসেফ (৩৫) মুসলিম নারীদের উদ্দেশ্যে কী বলেছিল এমন প্রশ্নে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সে ‘মুসলমানদের মেরে ফেলা উচিত, তারা অনেকদিন ধরেই খৃষ্টানদের হত্যা করছে’- এ কথাগুলো বলতে থাকে। এ সময় পাশে থাকা তিন ব্যক্তি এর প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেন। শুক্রবারের ওই হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স এক বিবৃতিতে বলেছে, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার হার শতকরা ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। আলোচ্য ঘটনায় উপলব্ধি করা যায় যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম ও জাতিবিদ্বেষ এখন কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। যাত্রীবাহী ট্রেনে উগ্রপন্থীরা এখন প্রকাশ্যে মুসলিম নারীদের হেনস্থা করতে কুণ্ঠিত নয়। আর কেউ এমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যার শিকার হতে হয়। আমরা জানি, আমেরিকা বহু ধর্ম ও বহু বর্ণের মানুষের দেশ। দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার নেতারা বৈচিত্র্যের ঐক্য নীতিকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছে। এমন নীতির কারণেই আমেরিকা একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা যেন তার পথ হারিয়ে ফেলেছে। তার প্রশাসন যেন ঐক্য ও সংহতির বদলে বিভিন্নভাবে বিদ্বেষের বার্তা ছড়িয়ে দিতে উৎসাহবোধ করছে। এর প্রভাব উগ্রপন্থীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রসঙ্গত এখানে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা যায়। ইসলামের পবিত্র মাস রমযান উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইফতার পার্টি ও ঈদ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের প্রস্তাব এবার নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। খবরটি পরিবেশন করেছে রয়টার্স। উল্লেখ্য যে, এর মাধ্যমে প্রায় ২০ বছর ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্যের অবসান হতে চলেছে। ১৯৯৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হয় একটি ইফতার পার্টি অথবা রোজার শেষে ঈদের দিনের ছুটিতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছিলো। কিন্তু ধর্মীয় সম্প্রতিমূলক এমন সুন্দর অনুষ্ঠানের প্রস্তাব এবার নাকচ করে দিল ট্রাম্প-প্রশাসন। বহু ধর্ম ও বর্ণের দেশটিতে এমন আচরণ কতটা যৌক্তিক হলো? এমন চেতনা রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর বলে বিবেচিত হবে কী? বিষয়টি ট্রাম্প সরকার ভেবে দেখলে ভালো হয়।
পৃথিবীটা যে এখন ঠিকভাবে চলছে না, সে কথা আমরা জানি। আর ঠিকভাবে না চলার দায়টা কিন্তু সভ্যতার শাসকদের ঘাড়েই বর্তায়। পোর্টল্যান্ডের ঘটনার কী জবাব দেবেন সভ্যতার শাসকরা? ট্রাম্প প্রশাসনের কাছেও এর জবাব নেই। কারণ তাদের ভ্রান্ত রাজনীতি পৃথিবীর সঙ্কট আরো বাড়িয়ে তুলছে। তবে সাহসী সাধারণ মানুষের কাছে সঙ্কটের জবাব আছে এবং সেই জবাব দিতে গিয়ে তাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত নন। এমন উদাহরণ আমরা লক্ষ্য করেছি খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের তালিয়েসিন মারদিন নামকাই মেশেরিক বেস্ট এবং মিকাহ ডেভিড কোল ফ্লেচার এখন আমাদের কাছে মহানায়ক হিসেবে সম্মানিত। গত ২৬ মে শুক্রবার রমযান শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে ওরিগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ডে একটি ট্রেনে মুসলিমমহিলারা ধর্ম ও জাতিবিদ্বেষের শিকার হন। তাঁদের হেনস্থা করছিলেন উগ্রপন্থী জেরেমি জোসেফ ক্রিশ্চিয়ান। এই অপকর্মের বিরুদ্ধে এগিয়ে এসেছিলেন ওই তিন মহানায়ক। তাঁদের ২ জন নিহত হয়েছেন আর একজন হয়েছেন আহত। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ভ্রষ্ট এই সভ্যতার মাঝেও আমাদের আশাবাদী হতে প্রেরণা জোগায়।
শুধু পোর্টল্যান্ডের ঘটনা নয়, এই পৃথিবীতে আরো কিছু উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে, যা আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচাতে পারে! এসব উদাহরণ জালেমদের বিরুদ্ধেও ছুঁড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গবাদিপশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রতিবাদে কেরালায় ‘বিফফেস্টিভ্যাল’ পালন করলো বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠন। শনিবার বাম শাসিত কেরালায় কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ‘গরুর গোশত ভক্ষণ উৎসব’-এর আয়োজন করে সিপিএম-এর ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠন। ‘রান্নাঘরে ফ্যাসিবাদ চলবে না’ স্লোগান তুলে রাজ্যের কমপক্ষে ২০০ স্থানে ওই উৎসবের আয়োজন করা হয়। তিরুবনন্তাপুরমে রাজ্য সচিবালয়ের বাইরে বিক্ষোভকারীরা সড়কের পাশে গরুর গোশত রান্না করে তা লোকজনের মধ্যে বিতরণ করেন। কোল্লাম জেলায় কংগ্রেস দল ‘বিফ ফ্যাস্টিভ্যাল’ আয়োজন করে। কোচিতে কেরালার পর্যটন মন্ত্রী কাভাকাম্পালি সুরেন্দ্রন গরুর গোশত ভক্ষণ উৎসবে যোগ দেন। ইডুকি জেলায় মহিষের মাথা নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। এইসব উদ্যোগে ও আয়োজনে উপলব্ধি করা যায়, পৃথিবীতে এখনো মানবিক চেতনা অবশিষ্ট আছে এবং ন্যায়ের পতাকা এই ধরিত্রীতে আবার উড্ডীন হতে পারে।
অবাক হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে তেলআবিবেও। স্বাধীন ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র গঠন ও ফিলিস্তিনী ভূখ- থেকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্ব অবসানের দাবিতে তেলআবিবে হাজার হাজার ইসরাইলী নাগরিক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সমাবেশের অন্যতম আয়োজক ইসরাইলী এনজিও ‘পিস নাউ’ জানিয়েছে- দখলদারিত্ব সহিংসতাও বর্ণবাদকে মদদ দেয়ার যে নীতি গ্রহণ করেছে ইসরাইল সরকার তার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে উক্ত সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। পিস নাউয়ের প্রধান আভিবুসকিলা বলেন, ইসরাইলের জনগণ, ফিলিস্তিন ও সারা বিশ্বকে এখন জানানোর সময় এসেছে যে, ইসরাইলের জনগণের একটা বিরাট অংশ ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইসরাইলী দখলদারিত্বের অবসান চায়। আমরা পৃথিবীর সব জনপদেই দখলদারিত্ব ও জুলুমের অবসান চাই। ন্যায়ের চেতনায় নতুন সভ্যতাই এখন সময়ের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ