বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিচারকদের থাকার জায়গা নেই আমরা করুণ অবস্থায় আছি -প্রধান বিচারপতি

 

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট দেশের জনগণের স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সব সময় পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা করুণ অবস্থায় আছি। সরকার প্রাইমারি স্কুলে, ইউনিয়ন পরিষদে কম্পিউটার দেন। কিন্তু আমার বিচারকদের একটা কম্পিউটার দিতে পারেন না! আমার বিচারকদের থাকার জায়গা নেই। এই সুপ্রিম কোর্টের একটি এডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং (প্রশাসনিক ভবন) নেই। সুপ্রিম কোর্টের অনেক অফিসারের বসার রুম নেই। অথচ দেশের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের অবদান কোনো অংশে কম নয়।

গতকাল মঙ্গলবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলের দশমদিনে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার এই মন্তব্য করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। এই দিন দশম দিনের মত শুনানি হয়েছে। কাল বৃহস্পতিবার একাদশতম দিনের শুনানি হবে।

সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টান্তমূলক কাজের কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি হাজারটা উদাহরণ দিতে পারি যে, দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট। ওই যে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা, সারা পৃথিবীতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। সারা দেশের মানুষ একটা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করল। এই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ওই মামলার জট খুলে গেল।

আমি যদি হাজারীবাগের ট্যানারির কথা বলি, তাহলে বলব, এই সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপেই ট্যানারি স্থানান্তরিত হলো। এই শহর দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেল। আমি যদি বলি, গুলশান, বারিধারা লেক আর শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে রক্ষা পেল। এই সুপ্রিম কোর্ট দেশের জনগণের স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সব সময় পদক্ষেপ নিয়েছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি ছাড়া সব বিচারকই স্বাধীন। এখানে যারা আছেন, বিচারকরা সবাই স্বাধীন, আমি ছাড়া। প্রধান বিচারপতি কতটা পরাধীন? জবাবে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আপনি পরাধীন নন, প্রতিদিন কাগজ খুললে আপনার অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়। পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি তো প্রেস কনফারেন্স করে কথা বলি না। আমি আমার প্রসিডিংসের (প্রক্রিয়া) মধ্যে থেকে কথা বলি।

বক্তব্য শেষে আদালত আগামী কাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন। এর আগে এমিকাস কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি তার অসমাপ্ত বক্তব্য শেষ করেন। পরে সাবেক এটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। 

সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা।

আদালতের অনুমতি নিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু বক্তব্য দিলে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে তখন প্রধান বিচারপতি আঙুল চোষা আরম্ভ করবেন। আবদুল মতিন থসরু বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকার বিষয়টিকে সমর্থন করেন।

তখন প্রধান বিচারপতি আবদুল মতিন খসরুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মনে করেন সংসদে এটর্নি জেনারেল একটি পক্ষ (দল), আপনি (মতিন খসরু) একটা পক্ষ আর আমির-উল ইসলাম একটা পক্ষ। তখন বিচারপতিকে ডাকলেন (অপসারণের জন্য)। কিন্তু কীভাবে (সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে) ব্যবস্থা গ্রহণ(অপসারণ) করবেন? প্রধান বিচারপতি আঙুল চোষা আরম্ভ করবেন।

আবদুল মতিন খসরু বলেন, আমরা সর্বসম্মত হয়ে (সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে) ব্যবস্থা নেব। প্রধান বিচারপতি বলেন, বিগত ৪৫ বছরে কেউ কারো (একদল অন্যদলের) আমন্ত্রণে যাননি। তাহলে এখানে (সংসদে) সর্বসম্মত হবেন কীভাবে?

এ সময় এটর্নি জেনারেল বলেন, যারা বঙ্গবন্ধুর নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না, বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেন না, তাদের সঙ্গে কীভাবে মিলবে?

তখন প্রধান বিচারপতি এটর্নি জেনারেলকে থামিয়ে দেন এবং বসতে অনুরোধ করেন। এরপর আবদুল মতিন খসরু পুনরায় তার শুনানি শুরু করেন।

শুনানি শেষে এটর্নি জেনারেরল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের তার কার্যালয়ে বলেন, দেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সংশোধনী (ষোড়শ সংশোধনী) হয়েছে। আদালতে ১২ জন এমিকাস কিউরির মধ্যে ৯ জন ষোড়শ সংশোধনীর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ১ জন সংশোধনীর পক্ষে মত দেন। পাশাপাশি আইনজীবী মতিন খসরু আদালতের অনুমতি নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, মতিন খসরু তার শুনানিতে ষোড়শ সংশোধনীর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যে রায় দিয়েছে সেখানকার কয়েকটি শব্দের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। হাইকোর্টের রায়ে সংসদ সদস্যদের বিষয়ে বিরূপ উক্তি করা হয়েছে। মতিন খসরু সেই শব্দ বাদ দেয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছেন। সংবিধানকে জগাখিঁচুরি করে সংশোধন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু এমনটা হয়নি বলে সাংবাদিকদের জানান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ